যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের একটি গবেষণাগারে অদৃশ্য দেয়াল দিয়ে তৈরি বিশেষ ফাঁদে একটি অ্যান্টিম্যাটার কণাকে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছেন পদার্থবিজ্ঞানীরা। কণাটির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা এমন কিছু তথ্য পাওয়ার আশা করছেন, যা পদার্থজগতের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে সফল গাণিতিক মডেলটিকেও ভুল প্রমাণ করতে পারে।
পজিট্রন হলো ইলেকট্রনের অ্যান্টিম্যাটার কণা। অর্থাৎ, এই দুটি কণার ভর সমান হলেও বৈদ্যুতিক আধান বিপরীত। তবে ইলেকট্রনের তুলনায় পজিট্রন অত্যন্ত বিরল। সাধারণত এরা এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ সময়ের বেশি টিকে থাকতে পারে না। কারণ, মহাবিশ্বে বিপুল সংখ্যায় থাকা কোনো ইলেকট্রনের সঙ্গে একটি পজিট্রনের সাক্ষাৎ হলেই কণা দুটি পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অ্যানিহিলেশন। ফলে পজিট্রন নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির জেরাল্ড গ্যাব্রিয়েলসে এবং তাঁর সহকর্মীরা এবার এমন একটি পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছেন, যার সাহায্যে একটি পজিট্রনকে ফাঁদে আটকে কয়েক মাস পর্যন্ত রাখা সম্ভব। আটকে থাকা অবস্থায় কণাটি সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা এর বিভিন্ন ধর্ম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে চান। এর মাধ্যমে কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অন্যতম বড় সমস্যারও অনুসন্ধান করবেন তাঁরা।
গবেষকেরা পজিট্রন সংগ্রহ করেছেন সোডিয়ামের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থেকে। এই আইসোটোপের ক্ষয় হওয়ার সময় একটি করে পজিট্রন নির্গত হয়। তবে এভাবে উৎপন্ন পজিট্রনগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতির হয় এবং সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই গবেষকেরা সোডিয়ামটিকে একটি বিশেষ শীতলীকরণ যন্ত্রে রাখেন। এর ফলে পজিট্রনগুলোর তাপমাত্রা ও শক্তি কমে আসে এবং কণাগুলোর গতি ধীর হয়।
এরপর টাংস্টেনের একটি স্ফটিকের মধ্য দিয়ে পজিট্রনগুলো পাঠিয়ে তাদের আরও ধীর করা হয়। স্ফটিকের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু পজিট্রন অ্যানিহিলেশনের ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তবে কিছু পজিট্রন অক্ষত অবস্থায় স্ফটিকের অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে আসে।
এরপর সেগুলোকে এমন একটি শীতল প্রকোষ্ঠে পাঠানো হয়, যেখানে অন্য কোনো কণা ছিল না। সেখানে স্থাপিত ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ থেকে উৎপন্ন তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র আগত পজিট্রনগুলোর গতিবিধি সীমাবদ্ধ করে। এই ক্ষেত্রগুলোই অদৃশ্য দেয়ালের মতো কাজ করে একটি পজিট্রনকে ফাঁদে আটকে রাখে।
এরপর গবেষকেরা পজিট্রনটিকে তার সর্বনিম্ন সম্ভাব্য শক্তিস্তরে নিয়ে যান। গ্যাব্রিয়েলসের মতে, এই কৌশলের সাহায্যেই অন্যথায় অধরা এই প্রতিকণাটিকে কয়েক মাস ধরে আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় মাইক্রোওয়েভ প্রয়োগ করে পজিট্রনটিকে তার পরবর্তী সর্বনিম্ন শক্তিস্তরেও নিয়ে যেতে পেরেছেন তাঁরা।
গ্যাব্রিয়েলস বলেন, “নিজের গবেষণাগারে দাঁড়িয়ে একটি পজিট্রনকে তার সর্বনিম্ন শক্তিস্তরগুলোর মধ্যে স্থানান্তরিত হতে দেখা সত্যিই দারুণ এক অভিজ্ঞতা। আমরা এই স্থানান্তরকে বলি ‘কোয়ান্টাম জাম্প’। এর চেয়ে মৌলিক বা চমৎকার আর কী হতে পারে?”
জাপানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিকেন (RIKEN)-এর গবেষক স্টেফান উলমার বলেন, “একটি অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিকণাকে ফাঁদে আটকে রাখা অত্যন্ত কঠিন।” বিশেষ করে, আশপাশে থাকা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কণা, আলোর ঝলক কিংবা সামান্য কম্পনও পরীক্ষায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তা ছাড়া, ফাঁদটির তাপমাত্রা পরমশূন্য তাপমাত্রার চেয়ে মাত্র কয়েক দশমাংশ ডিগ্রি বেশি রাখতে হয়েছে। এত সূক্ষ্ম পরিবেশ বজায় রাখাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে এসব পরীক্ষামূলক বাধা পেরিয়ে পজিট্রনকে আটকে রাখা ও নিয়ন্ত্রণ করার সাফল্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফল পাওয়ার আশা করছেন গবেষকেরা। উলমারের মতে, “পদার্থবিজ্ঞানের কোনো মৌলিক ধ্রুবককে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার পরীক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই গবেষণার।”
বিশেষ করে, গ্যাব্রিয়েলস ও তাঁর সহকর্মীরা পজিট্রনের চৌম্বক ভ্রামক (magnetic moment) পরিমাপ করতে চান। এই রাশি দিয়ে বোঝা যায়, কোনো কণা চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়।
এর আগে গবেষকেরা ইলেকট্রনের চৌম্বক ভ্রামকের সবচেয়ে নিখুঁত পরিমাপটি করেছিলেন। এবার পজিট্রনের চৌম্বক ভ্রামকও একই রকম নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারলে, ইলেকট্রন ও পজিট্রনের ধর্ম তুলনা করার সুযোগ পাবেন তাঁরা। এর মাধ্যমে অভূতপূর্ব নির্ভুলতায় পদার্থ ও প্রতিপদার্থের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মিল ও অমিল খুঁজে দেখা সম্ভব হবে।
স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী, ইলেকট্রন ও পজিট্রনের চৌম্বক ভ্রামক অভিন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু এই পূর্বাভাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তত্ত্বটির একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
সমস্যাটি হলো, পদার্থ ও প্রতিপদার্থের বৈশিষ্ট্য যদি এতটাই একই রকম হয়, তাহলে মহাবিশ্বের সূচনালগ্নে এদের সমান পরিমাণে সৃষ্টি হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে পদার্থ ও প্রতিপদার্থ পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে মহাবিশ্বে কোনো পদার্থই অবশিষ্ট থাকত না। অথচ আমরা এমন একটি মহাবিশ্বে বাস করছি, যেখানে নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যাস, ধূলিকণা এবং জীবজগৎ সবই পদার্থ দিয়ে গঠিত।
গ্যাব্রিয়েলস বলেন, “মহাবিশ্বের অস্তিত্ব কেন রয়েছে, এমনকি মহাবিশ্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়। অন্ততপক্ষে, তত্ত্বটি উল্লেখযোগ্যভাবে অসম্পূর্ণ।”
ইলেকট্রন ও পজিট্রনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া গেলে, তা এমন কোনো অজানা প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে, যার কারণে মহাবিশ্বে প্রতিপদার্থের তুলনায় পদার্থের আধিক্য তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, এই পার্থক্য মহাবিশ্বে পদার্থ টিকে থাকার রহস্য সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, এ বছরের মধ্যেই এ বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত উপাত্ত সংগ্রহ করতে চান গবেষকেরা।
———
One-Positron Quantum Cyclotron. Physical Review Letters (2026).
DOI: 10.1103/gbkc-6nlj
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


