বাংলাদেশের মাছ চাষের পুকুরের তলদেশের পলি ও চাষ করা মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি মাছ চাষের পুকুরে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সব কটি পুকুরের পলিতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা রয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ পুকুরে পলির মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ে ছিল। ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণার ফলাফল বলছে, মাছ চাষের পুকুরে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা জমা হচ্ছে এবং এসব কণা মাছের দেহে প্রবেশ করছে। মাছের প্রজাতি ও খাদ্য গ্রহণের ধরন অনুযায়ী কণা গ্রহণের মাত্রায়ও পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে পুকুরের তলদেশে বসবাসকারী মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের এমন বিস্তৃত উপস্থিতি মাছ চাষের পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিক দূষণের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এসব কণা প্রবেশের সম্ভাবনা থাকলেও, এ গবেষণা থেকে মানবস্বাস্থ্যে এর নির্দিষ্ট প্রভাব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
গবেষণাটির গত ৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে Environmental Pollution জার্নালে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দেন। গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন।
ত্রিশালের ২৫টি পুকুরে গবেষণা
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদনের জন্য নিবিড় ও আধা নিবিড়, দুই ধরনের চাষপদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়। গবেষকেরা শীতকালে উপজেলার ২৫টি নির্বাচিত মাছ চাষের খামার থেকে পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন।
গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা। পাশাপাশি মাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্পর্ক, কণাগুলোর রাসায়নিক গঠন এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ঝুঁকিও মূল্যায়ন করেন গবেষকেরা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল, মোড়ক, দড়ি, মাছ ধরার জালসহ বিভিন্ন প্লাস্টিকসামগ্রী পরিবেশে ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণা তৈরি হতে পারে। আবার শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
প্লাস্টিকের এসব কণা সহজে প্রাকৃতিকভাবে ভেঙে সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে থেকে এগুলো জমা হতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের পৃষ্ঠে বিভিন্ন দূষক পদার্থ যুক্ত হওয়ারও সুযোগ রয়েছে। জলজ প্রাণী এসব কণা গ্রহণ করলে তাদের শরীরে সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
সমুদ্র ও নদীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বহু গবেষণা হলেও বাংলাদেশের মাছ চাষের পুকুরে পলি ও একাধিক প্রজাতির মাছকে একসঙ্গে বিবেচনা করে দূষণের মাত্রা ও পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়নের তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। নতুন গবেষণাটি সেই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
পুকুরের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১টি কণা
গবেষণায় পুকুরের তলদেশের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এ পরিমাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানদণ্ড ও গবেষণার নমুনাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে পুকুরের পলিতে দূষণের মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়।
পলির দূষণভার সূচক বা পলিউশন লোড ইনডেক্সের (PLI) মান ছিল ১ থেকে ৪ দশমিক ৫। গবেষকদের মূল্যায়নে অধিকাংশ নমুনা সংগ্রহস্থল মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের আওতায় পড়ে।
পুকুরের তলদেশের পলি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রবহমান নদীতে পানির স্রোতের কারণে কণাগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, মাছ চাষের পুকুরে পানির বিনিময় সীমিত হলে প্লাস্টিকের কণা তলদেশে জমা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
প্লাস্টিকের তুলনামূলক ভারী কণা এবং অন্যান্য কণা পানির সঙ্গে চলাচলের পর তলদেশে থিতিয়ে পড়তে পারে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা কণার সংস্পর্শে আসে তলদেশে বসবাসকারী মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী।
পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শুধু তলদেশের দূষণের চিত্র তুলে ধরে না। মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে এসব কণা জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের সম্ভাবনাও তৈরি করে।
তবে পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি হলেই সব মাছের শরীরে সমান পরিমাণ কণা জমা হবে, এমন নয়। মাছের প্রজাতি, খাদ্য গ্রহণের পদ্ধতি, বসবাসের স্তর এবং পরিবেশের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কণা গ্রহণের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।
ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা
গবেষকেরা ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি চাষের মাছ পরীক্ষা করেন। এসব মাছের নমুনায় মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাছে গড়ে কণার সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক ৬০টি।
মাছের প্রজাতিভেদে কণা গ্রহণের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। গবেষণায় সরপুঁটি মাছের (Puntius sarana) প্রতি নমুনায় গড়ে ১ দশমিক ২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। রুই (Labeo rohita) ও মৃগেল (Cirrhinus cirrhosus) মাছের ক্ষেত্রে গড় কণার সংখ্যা ছিল ০ দশমিক ৬৮টি।
অন্যদিকে, কাতলা (Catla catla), কমন কার্প (Cyprinus carpio) ও পাঙাশ (Pangasius pangasius) মাছের নমুনায় তুলনামূলক কম মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, মাছের খাদ্য গ্রহণের ধরন এবং পুকুরের কোন স্তরে তারা বেশি সময় কাটায়, তা মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মাছের বসবাসের স্তর অনুযায়ী কণার বণ্টন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় শনাক্ত মোট মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার ৫২ শতাংশ পাওয়া গেছে তলদেশে বসবাসকারী বা তলদেশ থেকে খাবার সংগ্রহকারী মাছের মধ্যে। তলদেশ ও পানির মধ্যবর্তী স্তরে চলাচলকারী মাছের ক্ষেত্রে এ হার ৩৫ শতাংশ। আর পানির উপরিভাগের কাছাকাছি বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে হার ছিল ১৩ শতাংশ।
অর্থাৎ, শনাক্ত কণার অর্ধেকের বেশি ছিল তলদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবনযাপনকারী মাছের মধ্যে। পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এ ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এসব শতাংশ মাছের নমুনায় পাওয়া মোট কণার বণ্টন নির্দেশ করে। এগুলো দিয়ে প্রতিটি স্তরের সব মাছের দূষণের হার নির্ধারণ করা যায় না।
মাছের দেহের অবস্থার সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্পর্ক
গবেষকেরা মাছের শারীরিক অবস্থা ও মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের মধ্যকার সম্পর্কও পরীক্ষা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ফুলটনের কন্ডিশন ফ্যাক্টর বা K সূচক ব্যবহার করেন। মাছের দৈর্ঘ্য ও ওজনের সম্পর্ক থেকে নির্ণীত এ সূচক মাছের আপেক্ষিক শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণায় মাছের K সূচকের মান ছিল ০ দশমিক ৩৫ থেকে ২ দশমিক ২৭। প্রজাতিভেদে এ মানের পার্থক্য দেখা গেছে। কাতলা ও পাঙাশের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম K মান পাওয়া যায়। একই সঙ্গে এসব প্রজাতির মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের তুলনামূলক উচ্চ মাত্রাও লক্ষ করা হয়েছে।
এ ফলাফল থেকে মাছের শারীরিক অবস্থা ও মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে শুধু এ সম্পর্কের ভিত্তিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণেই মাছের শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
মাছের বৃদ্ধি ও শারীরিক অবস্থার ওপর খাদ্যের গুণমান, পানির মান, রোগ, অক্সিজেনের প্রাপ্যতা এবং চাষের ঘনত্বসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট প্রভাব বুঝতে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
পলিথিন ও পলিপ্রপিলিনের উপস্থিতি বেশি
গবেষণায় শনাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান পলিমার ছিল পলিইথিলিন (PE) ও পলিপ্রপিলিন (PP)। দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরিতে এ দুটি পলিমার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
পলিইথিলিন ব্যবহৃত হয় প্লাস্টিকের ব্যাগ, মোড়ক ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিংয়ে। অন্যদিকে, পলিপ্রপিলিন ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন পাত্র, প্যাকেজিং, দড়ি এবং অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য তৈরিতে।
গবেষকদের মতে, এ ধরনের পলিমারের উপস্থিতি মাছ চাষের কার্যক্রম ও গৃহস্থালি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য উৎসের ইঙ্গিত দেয়।
মাছের খাদ্যের বস্তা ও মোড়ক, মাছ ধরার সরঞ্জাম, প্লাস্টিকের দড়ি, পানি সরবরাহের পাইপ এবং আশপাশের গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুরে প্রবেশ করতে পারে। মাছের খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়েও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বৃষ্টির পানি, বন্যার পানি এবং আশপাশের এলাকা থেকে প্রবাহিত পানির মাধ্যমেও পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণায় পাওয়া পলিমারের ধরন এসব সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে নির্দিষ্ট কোনো উৎস থেকে দূষণ ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। মাছের খাদ্য, প্যাকেজিং, পুকুরে প্রবেশ করা পানি এবং আশপাশের বর্জ্যের পৃথক নমুনা বিশ্লেষণ করলে দূষণের উৎস আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে এর প্রবেশ। পুকুরের তলদেশে জমা হওয়া কণা মাছের খাদ্যের সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। এ ছাড়া পানির সঙ্গে থাকা কণা সরাসরি গ্রহণের মাধ্যমেও মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণায় কয়েকটি মাছের প্রজাতির ক্ষেত্রে তুলনামূলক উচ্চ বায়োকনসেনট্রেশন ফ্যাক্টর বা জৈব ঘনীভবন সূচক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মৃগেল, কমন কার্প ও পাঙাশের ক্ষেত্রে এ সূচকের মান তুলনামূলক বেশি ছিল।
বায়োকনসেনট্রেশন ফ্যাক্টর বা BCF ব্যবহার করে কোনো জীবের শরীরে পরিবেশ থেকে দূষক জমার প্রবণতা মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় পাওয়া এ ফলাফল নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজাতির ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্দেশ করে।
তবে মাছের শরীরে কণার উপস্থিতি বা BCF-এর তুলনামূলক উচ্চ মান একাই প্রমাণ করে না যে খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। এ ধরনের বিস্তার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন জীব, তাদের খাদ্য এবং পরিবেশের মধ্যে কণার চলাচল নিয়ে আরও বিশদ গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকেরা মনে করেন, মাছ চাষের পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তৃত উপস্থিতি জলজ পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। দীর্ঘমেয়াদে এসব কণা মাছের বৃদ্ধি, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য জৈবিক প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মাছ চাষে দূষণের সম্ভাব্য উৎস কোথায়?
মাছ চাষের পুকুর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের বিভিন্ন পথ রয়েছে। মাছের খাবার, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের সরঞ্জাম এবং আশপাশের বর্জ্য এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে নিবিড় মাছ চাষের ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে খাবার ব্যবহার করা হয়। মাছের খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্লাস্টিকের প্যাকেজিং ব্যবহৃত হয়। এসব উপকরণ ক্ষয়প্রাপ্ত হলে বা বর্জ্য হিসেবে পুকুরের আশপাশে জমা হলে সেখান থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে।
এ বিষয়ে গবেষণার প্রধান লেখক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোকে বলেন, মাছকে প্রচুর ফিড খাওয়ানো হয়। সব ফিড খারাপ নয়, তবে কিছু ফিডে এসব কণা থাকতে পারে। বন্যার পানির মাধ্যমেও অন্য স্থান থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্রে এসব কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তবে মাছের খাদ্য থেকেই গবেষণায় শনাক্ত সব মাইক্রোপ্লাস্টিক এসেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য গবেষণায় নেই। দূষণের প্রকৃত উৎস নির্ধারণে মাছের খাদ্য ও পুকুরের পরিবেশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
পুকুরের আশপাশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, অপরিশোধিত পানি প্রবেশ এবং প্লাস্টিকের সামগ্রীর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও দূষণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব উৎস নিয়ন্ত্রণে পুকুরের পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রিশালের মাছ উৎপাদনে দূষণের প্রভাব
ত্রিশাল উপজেলায় বাণিজ্যিক মাছ চাষের ব্যাপক বিস্তার রয়েছে। উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ২২ হাজার পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। প্রতিবছর এ উপজেলায় প্রায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়।
এত বড় উৎপাদনব্যবস্থায় পুকুরের পরিবেশের মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ফলে মাছ চাষের পুকুরে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
ত্রিশালের জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন প্রথম আলোকে জানান, পুকুরের পাশে পোলট্রি খামার থাকার কারণে মাছ চাষের পরিবেশে দূষণ ঘটতে পারে। এ বিষয়ে তাঁরা অভিযান শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে একটি পুকুরের পাশ থেকে মুরগির খামার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন গবেষণাটি ত্রিশালের নির্বাচিত ২৫টি পুকুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সব মাছ চাষের পুকুরে একই মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুকুর, মাছের খাদ্য, পানি এবং পলির নমুনা নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এতে অঞ্চলভেদে দূষণের মাত্রা, সম্ভাব্য উৎস এবং মাছের প্রজাতি অনুযায়ী ঝুঁকির পার্থক্য সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।
মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকি?
মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। মাছ মানুষের খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষকেরা উদ্বিগ্ন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সহযোগী বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্যবিদ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার ব্যাপক। মানুষের শরীরেও এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তাই মাছ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে পৌঁছাবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে মাছের মাধ্যমে কত পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং এর ফলে কী ধরনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব দেখা দিতে পারে, তা নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, কোষের ক্ষতি, প্রদাহ এবং বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাতের মতো বিষয় আলোচিত হয়েছে। তবে এসব প্রভাবের মাত্রা কণার আকার, গঠন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, গ্রহণের পরিমাণ এবং সংস্পর্শের সময়কালের ওপর নির্ভর করতে পারে।
মাছ রান্নার সময় উচ্চ তাপমাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাধারণ প্লাস্টিকের পলিমার রান্নার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সহজে সম্পূর্ণ ভেঙে যায় না। তবে রান্নার পদ্ধতি, মাছের কোন অংশ খাওয়া হচ্ছে এবং কণাগুলো কোথায় অবস্থান করছে, এসব বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গবেষণাটিতে মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। তাই এ ফলাফল থেকে মাছের মাংসের প্রতিটি অংশে একই মাত্রায় কণা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। একইভাবে, গবেষণাটি মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের পরিমাণ বা এর কারণে নির্দিষ্ট কোনো রোগ হওয়ার প্রমাণও দেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, মাছ চাষের পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া উদ্বেগের বিষয়। তবে দূষণের মাত্রা, মাছের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের মধ্যে দূষণের সম্পর্ক বুঝতে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জরুরি।
মাছ চাষের পুকুরে প্লাস্টিকের বর্জ্য জমতে না দেওয়া, খাবারের বস্তা ও প্যাকেজিংয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুকুরে প্রবেশ করা পানির মান পরীক্ষা এবং আশপাশের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দূষণের সম্ভাব্য উৎস কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে মাছের খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে মাছের খাদ্য থেকে দূষণ ছড়ানোর সম্ভাবনা কতটা, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
গবেষকেরা পুকুরের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করে দেখিয়েছেন, মাছ চাষের পরিবেশও প্লাস্টিক দূষণ থেকে মুক্ত নয়। তবে দূষণের উৎস, মাছের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মাছ চাষের পুকুরের পরিবেশ সুস্থ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা নিরূপণ, উৎস শনাক্ত এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল নির্ধারণে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।
———
Microplastics in freshwater aquaculture: Evidence of sediment–fish transfer and associated ecological risks in Bangladesh. Environmental Pollution (2026).
DOI: 10.1016/j.envpol.2026.129274
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


