বিশাল আকৃতির শাপলা বা জায়ান্ট ওয়াটারলিলি এমন কোনো উদ্ভিদ নয়, যাকে সহজে চোখ এড়িয়ে যেতে দেওয়া যায়। অথচ গত কয়েক বছরে বিজ্ঞানীরা এই উদ্ভিদের অন্তত তিনটি নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। ফলে এ পর্যন্ত জানা বিশাল শাপলার প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচে। সর্বশেষ প্রজাতিটি শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি, স্যাটেলাইট চিত্র এবং গভীর রাতে জঙ্গলের মধ্যে চালানো এক অভিযান।
নতুন প্রজাতিগুলোর মধ্যে দুটি শনাক্ত করার কাজে যুক্ত ছিলেন ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ডের বোটানিক্যাল সোসাইটির গবেষক মার্টেন ক্রিস্টেনহুস। তিনি বলেন, “আমার কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমরা এমন এক পৃথিবীতে এত বড় একটি নতুন উদ্ভিদ খুঁজে পাচ্ছি, যেখানে আমাদের ধারণা, সবকিছুই ইতিমধ্যে জানা হয়ে গেছে।”
জায়ান্ট ওয়াটারলিলি মূলত তার বিশাল পাতার জন্য পরিচিত। এসব পাতার ব্যাস তিন মিটার পর্যন্ত হতে পারে। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই উদ্ভিদের মাত্র দুটি প্রজাতির কথা জানতেন, Victoria amazonica এবং Victoria cruziana।
এরপর ২০১৬ সালে লন্ডনের কিউ রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের গবেষক কার্লোস মাগদালেনা লক্ষ করেন, বলিভিয়া থেকে সংগ্রহ করা বীজ দিয়ে জন্মানো বিশাল শাপলাগুলো অন্যগুলোর তুলনায় কিছুটা আলাদা। এদের পাতাও ছিল আরও বড়। ২০২২ সালে মাগদালেনা ও তাঁর সহকর্মীরা একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা দেখান, উদ্ভিদগুলো আসলে একটি নতুন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। এর নাম দেওয়া হয় Victoria boliviana। তবে নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার কাজ সেখানেই থেমে থাকেনি।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাংসাশী উদ্ভিদের ব্যবসা পরিচালনাকারী জেরেমিয়া হ্যারিস কলম্বিয়ার ইনিরিদা নদীর কাছে সাঁতার কাটার সময় কয়েকটি ছবি তোলেন। ছবিতে তাঁর পাশে থাকা বিশাল শাপলাগুলোকে তিনি Victoria amazonica বলেই মনে করেছিলেন। পরে তিনি ছবিগুলো ইন্সটাগ্রামে প্রকাশ করেন।
ছবিগুলো দেখে মাগদালেনা বিস্মিত হন। কারণ, বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ওই অঞ্চলে বিশাল শাপলা জন্মায় না।
ক্রিস্টেনহুস বলেন, “এই নদী ভৌগোলিকভাবে আমাজন নদী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তাদের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এ কারণেই আবিষ্কারটি এত আকর্ষণীয়।”
মাগদালেনা, ক্রিস্টেনহুস ও তাঁদের সহকর্মীরা স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি পরীক্ষা করেন। সেখানে তাঁরা সবুজ রঙের ছোট ছোট দাগ দেখতে পান, যা ওই অঞ্চলে বিশাল শাপলার উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এভাবে তাঁরা নিশ্চিত হন, নদীটির আশপাশে সত্যিই জায়ান্ট ওয়াটারলিলি জন্মাচ্ছে।
এরপর গবেষকেরা ওই অঞ্চলে একটি অভিযান পরিচালনার আয়োজন করেন। অভিযানে তাঁরা দুটি শাপলাগাছ খুঁজে পান। কিন্তু কোনোটিতেই ফুল ছিল না। অথচ কোনো শাপলা নতুন প্রজাতির কি না, তা নির্ধারণের জন্য এর ফুল বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযানের শেষ রাতেও গবেষকদের সাফল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাত তখন ১১টা। পরদিন সকাল ৯টায় তাঁদের বিমান ছেড়ে যাওয়ার কথা। নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার মতো ফুলসহ কোনো শাপলা খুঁজে না পাওয়ায় মনে হচ্ছিল, অভিযানটি ব্যর্থ হতে চলেছে।
ঠিক তখনই স্থানীয় আদিবাসী তুকানো জনগোষ্ঠীর সদস্য ও অভিযানের একজন গাইড গুস্তাভো মেলো জানান, তিনি জানেন কোথায় আরও কিছু জায়ান্ট ওয়াটারলিলি জন্মাচ্ছে।
এরপর গবেষকদল অন্ধকারের মধ্যেই নৌকায় করে যাত্রা শুরু করে। সূর্য ওঠার ঠিক আগে তাঁরা একটি ছোট হ্রদে পাঁচটি শাপলাগাছ খুঁজে পান। এর মধ্যে কয়েকটিতে ফুলও ফুটেছিল। ফলে নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।
সম্প্রতি মাগদালেনা, ক্রিস্টেনহুস ও তাঁদের সহকর্মীরা নতুন প্রজাতিটি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন Victoria colombiana।
প্রজাতিটি Victoria amazonica থেকে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যে আলাদা। এর পাতার নিচের অংশে থাকা কাঁটাগুলোর অভিমুখ ভিন্ন। ফুল ও ফলের আকৃতিতেও রয়েছে পার্থক্য।
ক্রিস্টেনহুসের মতে, এসব কাঁটা মূলত মানাটি এবং উদ্ভিদভোজী মাছের মতো প্রাণীদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়। কোন অঞ্চলে কী ধরনের তৃণভোজী প্রাণী বেশি রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রজাতির শাপলার কাঁটার বৈশিষ্ট্যও আলাদা হতে পারে।
গবেষকদের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, Victoria colombiana কেবল একটি ছোট অঞ্চলেই জন্মায়। ফলে প্রজাতিটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্রিস্টেনহুস বলেন, দূষিত পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার মতো একটি ঘটনাই পুরো প্রজাতিটিকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে গবেষকেরা প্রজাতিটির বীজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য, বীজ সংরক্ষণ ও চাষের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই শাপলার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করা।
এদিকে মাগদালেনা দক্ষিণ আমেরিকার প্যান্টানাল অঞ্চলে জন্মানো বিশাল শাপলাগুলো নিয়েও গবেষণা করছিলেন। কলম্বিয়া থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই অঞ্চলের শাপলাগুলো দেখতে Victoria cruziana-র সঙ্গে প্রায় একই রকম। কিন্তু মাগদালেনা ধারণা করেন, দীর্ঘ সময় ধরে এগুলো অন্য অঞ্চলের শাপলাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বেড়ে উঠেছে।
জিনগত বিশ্লেষণে তাঁর ধারণার সত্যতা পাওয়া যায়। গবেষকেরা দেখতে পান, প্যান্টানাল অঞ্চলের শাপলাগুলোও একটি স্বতন্ত্র প্রজাতি, যদিও বাহ্যিক চেহারায় Victoria cruziana-র সঙ্গে তাদের অনেক মিল রয়েছে।
মাগদালেনা, ক্রিস্টেনহুস ও তাঁদের সহকর্মীরা শিগগিরই এই পঞ্চম প্রজাতি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করবেন। তাঁরা এর নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেন Victoria mattogrossensis।
এভাবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে জায়ান্ট ওয়াটারলিলির পরিচিত প্রজাতির সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে পাঁচে পৌঁছেছে। আবিষ্কারগুলো দেখাচ্ছে, পৃথিবীর সুপরিচিত ও সহজে চোখে পড়ার মতো উদ্ভিদ নিয়েও বিজ্ঞানীদের জানার অনেক কিছু বাকি রয়েছে।
———
Discovery of a new species of Victoria (Nymphaeaceae) in the Orinoco watershed of Colombia. Phytotaxa (2026).
DOI: 10.11646/PHYTOTAXA.778.2.1
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


