ডেঙ্গু ভাইরাসের একটি দুর্বল স্ট্রেইন (strain)-এর দিয়ে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটিয়ে রোগটির বিরুদ্ধে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
সংক্রমিত স্ত্রী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায়। প্রতিবছর এই ভাইরাসে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আর বছরে আক্রান্ত হন প্রায় ৪০ কোটি মানুষ। বাংলাদেশ ও কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়াই করছে। সাধারণত বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু ভাইরাসের ভিন্ন কোনো স্ট্রেইন দ্বারা আক্রান্ত হলে তাঁদের মধ্যে আরও গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুর এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য টিকা তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে গত ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ Science Translational Medicine জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই সমস্যার পেছনের কারণ সম্পর্কে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে ৪৫ জন মানুষের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের পরিবর্তিত ও তুলনামূলক দুর্বল একটি ধরন বা স্ট্রেইন দিয়ে সংক্রমণ ঘটানো হয়। এর মাধ্যমে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে কেন রোগের তীব্রতা বেড়ে যায়, সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন গবেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের এপিডেমিওলজিস্ট এবং গবেষণাটির সহলেখক লিয়া কাটজেলনিকের মতে, ডেঙ্গু সংক্রমণের এই স্ট্রেইনটির পেছনের জীববিজ্ঞান বুঝতে পারলে আরও কার্যকর টিকা তৈরি করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, “ডেঙ্গুকে এখনো অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এটি প্রায় সবার জন্যই একটি সমস্যা হয়ে উঠেছে।”
ডেঙ্গুর বিদ্যমান টিকাগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো, টিকা নেওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০১৬ সালে ফিলিপাইনে বড় পরিসরে শিশুদের ডেঙ্গুর টিকা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর কয়েকজন শিশু গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। ঘটনাটি দেশটিতে উদ্বেগ তৈরি করে এবং টিকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা কেন বেড়ে যায়, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এর একটি ব্যাখ্যা হলো, প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর শরীর যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেই পুরোনো অ্যান্টিবডিগুলোই কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু আগের ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি নতুন ধরনটির বিরুদ্ধে যথেষ্ট কার্যকর হয় না। ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ আরও তীব্র হতে পারে এবং রোগীর শরীরে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে ডেঙ্গুর অন্যান্য স্ট্রেইনে পরবর্তী সংক্রমণের ক্ষেত্রে একই ধরনের রোগ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে লিয়া কাটজেলনিক ও তাঁর সহকর্মীরা ৪৫ জন সুস্থ মানুষকে নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলে ছিলেন এমন ব্যক্তিরা, যাঁরা আগে কখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হননি। দ্বিতীয় দলে ছিলেন এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিরা। আর তৃতীয় দলে ছিলেন একাধিক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিরা।
এরপর গবেষকেরা প্রত্যেকের শরীরে DENV-3 ভাইরাসের দুর্বল একটি সংস্করণ প্রবেশ করান। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরনের মধ্যে DENV-3 একটি। সংক্রমণের পর অংশগ্রহণকারীদের রক্ত ও লসিকাগ্রন্থি (লিম্ফ নোড) থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তাঁদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। তাঁদের শরীরে অতিরিক্ত প্রদাহ সৃষ্টিকারী সংকেতও বেশি পাওয়া গেছে। আগে কখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল।
তবে এই সংক্রমণ সব সময় শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেনি। যাঁদের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল, তাঁদের মধ্যে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির পরিমাণ অন্য অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় কম পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তাঁদের অ্যান্টিবডিগুলোও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক কম কার্যকর ছিল।
গবেষকদের মতে, যেসব মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু সংক্রমণকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাঁদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে রোগটির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা থাকার প্রবণতাও বেশি।
অন্যদিকে, যাঁদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সংক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাঁদের শরীরে বিশেষ কিছু অ্যান্টিবডির মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এসব অ্যান্টিবডি ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে একজন মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কতটা শক্তিশালী, তা নির্ণয়ের নির্দেশক বা বায়োমার্কার হিসেবে কাজ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস মেডিক্যাল ব্রাঞ্চের ভাইরোলজিস্ট নিকোস ভ্যাসিলাকিসের মতে, এই বায়োমার্কার শনাক্ত করা ডেঙ্গু গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। উল্লেখ্য, তিনি কীটপতঙ্গের মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন রোগ নিয়ে গবেষণা করেন।
গবেষকদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের NS1 প্রোটিনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিসহ অন্যান্য বায়োমার্কার ভবিষ্যতে নতুন ডেঙ্গু টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নির্ণয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো বায়োমার্কার নেই। পাশাপাশি ডেঙ্গু গবেষণার উপযোগী প্রাণীর মডেলও খুব বেশি নেই। ফলে মানুষের ওপর পরীক্ষার আগে নতুন কোনো ডেঙ্গু টিকা কতটা কার্যকর ও নিরাপদ, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
লিয়া কাটজেলনিক বলেন, “একটি টিকা নিরাপদ কি না, তা জানার জন্য সব সময় বড় পরিসরের তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করে দশ বছর ধরে মানুষের ওপর নজরদারি করার প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।”
নতুন গবেষণায় শনাক্ত হওয়া বায়োমার্কারগুলো ভবিষ্যতে এই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পরীক্ষার প্রক্রিয়া সহজ করতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি ডেঙ্গু টিকা তৈরির ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর পথও দেখাতে পারে।
———
Dengue virus controlled human challenge reveals that preexisting immunity shapes viral replication and broadly protective responses. Science Translational Medicine (2027).
DOI: 10.1126/scitranslmed.aei5117
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


