হাড় শুধু শরীরের গঠন ধরে রাখে না, বার্ধক্যের গতিও নিয়ন্ত্রণ করতে ভূমিকা রাখতে পারে। শারীরিক ব্যায়াম কীভাবে বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে ধীর করে, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় এমন কিছু প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণা বলছে, হাড় থেকে নিঃসৃত কিছু প্রোটিন বার্ধক্য ধীর করতে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ সুস্থ রাখতে এবং আয়ু বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ Cell Metabolism জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে দেখা গেছে, ব্যায়াম বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় হাড়ের ওপর যে চাপ পড়ে, তা হাড়ের বিশেষ কিছু কোষকে সক্রিয় করে। এই কোষগুলোকে বলা হয় অস্টিওসাইট। হাড়ের ভেতরে থাকা এই কোষগুলো যান্ত্রিক চাপ অনুভব করতে পারে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বার্ধক্য ধীর করতে সহায়ক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে।
গবেষকরা শুধু হাড়ে হালকা চাপ প্রয়োগ করেই ইঁদুরের আয়ু প্রায় তিন মাস বাড়াতে পেরেছেন। মানুষের ক্ষেত্রে এই সময়ের সমতুল্য প্রায় নয় বছর।
গবেষণাটির অন্যতম প্রধান গবেষক এবং সাউদার্ন মেডিকেল ইউনিভার্সিটির হাড়বিষয়ক জীববিজ্ঞানী শিয়াওচুন বাই বলেন, “হাড় কেবল শরীরের একটি নিষ্ক্রিয় কাঠামো নয়। এটি এমন একটি সক্রিয় অঙ্গ, যা যান্ত্রিক চাপের প্রতি সাড়া দেয় এবং পুরো শরীরে বার্ধক্যের গতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। আমাদের গবেষণায় প্রথমবারের মতো শরীরের সামগ্রিক বার্ধক্যের সঙ্গে হাড়ের যান্ত্রিক চাপ অনুভব করার ক্ষমতার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।”
তবে মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রভাব দেখা যায় কি না, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। মায়ো ক্লিনিকের অন্তঃক্ষরা বিশেষজ্ঞ সুন্দীপ খোসলা (তিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, ইঁদুরের ওপর গবেষণাটি একটি আকর্ষণীয় ধারণার প্রমাণ দিলেও একে মানুষের জন্য নতুন কোনো বার্ধক্যবিরোধী চিকিৎসার কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বার্ধক্য ধীর করতে হাড়ের ভূমিকা
কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি এগুলো স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া, হৃদরোগ এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যার ঝুঁকিও কমাতে পারে। তবে ঠিক কোন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ব্যায়াম এসব উপকার করে, তা বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।
বাইয়ের মতে, এত দিন অধিকাংশ গবেষক ব্যায়ামের উপকারিতা বোঝার জন্য পেশির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ ব্যায়ামের সময় পেশির পাশাপাশি হাড়ের ওপরও একই ধরনের যান্ত্রিক চাপ পড়ে।
গবেষণায় হাড়ের সম্ভাব্য ভূমিকা বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, হাড় শরীরের অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্রম এবং বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বাই ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমে একধরনের ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের অস্টিওসাইটে PIEZO1 নামের একটি প্রোটিন তৈরির জন্য দায়ী জিনটি যেকোনো বয়সে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব। PIEZO1 কোষকে যান্ত্রিক চাপ অনুভব করতে সাহায্য করে।
এরপর গবেষকরা ১০ মাস বয়সী ইঁদুরের অস্টিওসাইটে জিনটি নিষ্ক্রিয় করেন। ইঁদুরের ক্ষেত্রে এই বয়সকে মধ্যবয়স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পাঁচ মাস পর দেখা গেল, একই বয়সী স্বাভাবিক ইঁদুরের তুলনায় জিন নিষ্ক্রিয় করা ইঁদুরগুলোকে বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় তারা খারাপ ফল করে এবং তাদের প্রতিক্রিয়ার গতিও কমে যায়। শুধু আচরণ বা স্মৃতিশক্তিতেই নয়, তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও বার্ধক্যের লক্ষণ বেড়ে যায়। হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, মস্তিষ্ক ও হাড়ে বার্ধক্য এবং প্রদাহের লক্ষণ বেশি দেখা যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ দলের ইঁদুরের তুলনায় গড়ে ১০৫ দশমিক ৫ দিন আগে মারা যায়।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, অস্টিওসাইটের যান্ত্রিক চাপ অনুভব করার ক্ষমতা দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বার্ধক্যের সম্পর্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হাড়ে চাপ প্রয়োগ করে বাড়ল ইঁদুরের আয়ু
হাড়ের ওপর যান্ত্রিক চাপ প্রয়োগের বিপরীত প্রভাবও পরীক্ষা করেন গবেষকরা। এবার তাঁরা ২০ থেকে ২৪ মাস বয়সী ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান। ইঁদুরের জন্য এই বয়সকে প্রবীণ বয়স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গবেষকরা চার মাস ধরে সপ্তাহে দুবার একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে ইঁদুরগুলোর পায়ের হাড়ের দুই প্রান্তে আলতোভাবে চাপ দেন। এই পদ্ধতির নাম ডাইনামিক টিবিয়াল অ্যাক্সিয়াল লোডিং বা ডিটিএএল (DTAL)।
পদ্ধতিটিতে পায়ের টিবিয়া বা বড় নলাকার হাড়ের ওপর নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যায়ামের সময় হাড়ের ওপর যে চাপ পড়ে, তার কিছু প্রভাব অনুকরণ করা।
চিকিৎসার কয়েক মাস পর গবেষকরা দেখতে পান, এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা পাওয়া পুরুষ ও স্ত্রী উভয় ইঁদুরেরই স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। তাদের হাড় আগের তুলনায় শক্তিশালী ছিল, প্রতিক্রিয়ার গতি বেড়েছিল এবং স্মৃতিশক্তিও ভালো ছিল। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও বয়সের ছাপ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
গবেষণার সময়কাল অনুযায়ী, এসব ইঁদুর এমন এক বয়সে পৌঁছেছিল, যখন স্বাভাবিকভাবে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকার কথা।
গবেষকরা আরও দেখেছেন, PIEZO1 প্রোটিনকে সক্রিয় করে এমন একটি ওষুধ ব্যবহার করেও বার্ধক্যের কিছু লক্ষণ দেরিতে প্রকাশ পাওয়ার মতো প্রভাব তৈরি করা যায়। অর্থাৎ, হাড়ের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ না করেও সংশ্লিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিটিএএল পদ্ধতিতে ইঁদুরের আয়ু বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি গবেষকদের অবাক করেছে। কারণ, আগের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ব্যায়াম ইঁদুরের বার্ধক্য ধীর করলেও তাদের আয়ু বাড়ায়নি। তবে সেই গবেষণায় ইঁদুরগুলোকে মূলত দৌড়ানোর চাকা ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক সার্জারি গবেষক মেই ওয়ান বলেন, নতুন ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যায়, সব ধরনের ব্যায়ামের তুলনায় হাড়ের যান্ত্রিক চাপ অনুভব করার প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে এমন ব্যায়াম সুস্থ বার্ধক্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। তাঁর মতে, ভারোত্তোলন এবং রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিংয়ের মতো ব্যায়াম, যেগুলো হাড়ের ওপর তুলনামূলক বেশি যান্ত্রিক চাপ সৃষ্টি করে, সেগুলো বার্ধক্য ধীর করার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
ক্রেডিট: Zhang et al./Cell Metabolism (2026)
তবে মানুষের ক্ষেত্রে এসব ব্যায়াম ঠিক কতটা কার্যকর, তা নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
রক্তের মাধ্যমে ছড়ায় বার্ধক্য ধীর করার সংকেত
হাড়ে যান্ত্রিক চাপ প্রয়োগের ফলে শরীরে কীভাবে বার্ধক্যের লক্ষণ কমে, তা বোঝার জন্য গবেষকরা আরও কিছু পরীক্ষা করেন। তাঁদের পরীক্ষার ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ডিটিএএল পদ্ধতিতে সক্রিয় হওয়া অস্টিওসাইট রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন কিছু উপাদান নিঃসরণ করে। এসব উপাদান শরীরের অন্যান্য অঙ্গের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষকরা আগের গবেষণার ফলাফলও নিশ্চিত করেন। তাঁরা দেখেন, বয়স্ক ইঁদুরের রক্ত মধ্যবয়সী ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করালে তাদের বার্ধক্যের লক্ষণ দ্রুত প্রকাশ পায়। কিন্তু ডিটিএএল পদ্ধতিতে চিকিৎসা পাওয়া বয়স্ক ইঁদুরের রক্ত ব্যবহার করলে এই প্রভাব উল্টে যায়। অর্থাৎ, চিকিৎসা পাওয়া ইঁদুরের রক্ত মধ্যবয়সী ইঁদুরের শরীরে বার্ধক্য ত্বরান্বিত হওয়ার প্রভাব কমাতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ডিটিএএল পদ্ধতি তরুণ ইঁদুরের রক্তের বার্ধক্য ধীর করার প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। এরপর গবেষকরা অস্টিওসাইট থেকে নিঃসৃত বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট অণু শনাক্ত করেন, যেগুলো বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে বিভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে।
কিছু অণু সরাসরি শরীরের অন্যান্য অঙ্গের কোষের কার্যক্রমে পরিবর্তন এনে সেগুলোকে তুলনামূলক তরুণ অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। অন্য কিছু অণু নতুন তৈরি হওয়া রোগপ্রতিরোধী কোষের কার্যক্রম উন্নত করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বার্ধক্য ধীর করতে পারে।
এসব অণুর মধ্যে একটি হলো পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম ডেরাইভড ফ্যাক্টর বা পিইডিএফ (PEDF)। গবেষকরা দেখেছেন, বয়স্ক ইঁদুরের শরীরে এই প্রোটিন প্রবেশ করালে ডিটিএএল পদ্ধতিতে পাওয়া বার্ধক্যবিরোধী উপকারের মতো প্রভাব দেখা যায়।
মানুষের ক্ষেত্রেও কি কাজ করবে এই প্রোটিন?
গবেষক বাই ও তাঁর সহকর্মীরা এখন মানুষের শরীরে পিইডিএফের ভূমিকা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁরা দেখিয়েছেন, পিইডিএফ মানুষের তরুণাস্থি দিয়ে তৈরি অর্গানয়েডে বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন প্রতিরোধ করতে পারে। অর্গানয়েড হলো পরীক্ষাগারে তৈরি ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক কোষগুচ্ছ, যা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ বা টিস্যুর কিছু বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করে।
গবেষকরা আরও দেখেছেন, বয়স্ক মানুষ এবং অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে পিইডিএফের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে।
এই ফলাফলগুলো পিইডিএফকে ভবিষ্যতে বার্ধক্য ধীর করার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে গবেষণার আগ্রহ বাড়াচ্ছে। তবে এর ভিত্তিতে মানুষের চিকিৎসা শুরু করার আগে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।
মেই ওয়ান সতর্ক করে বলেন, মানুষের শরীরে যান্ত্রিক চাপ প্রয়োগ করে নিরাপদে ও কার্যকরভাবে বার্ধক্য ধীর করা যায় কি না, বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা দরকার। একই সঙ্গে পিইডিএফের মতো অণুকে লক্ষ্য করে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হবে।
বর্তমানে গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, এর প্রধান ফলাফল ইঁদুরের ওপর পাওয়া গেছে। মানুষের শরীরে একই প্রক্রিয়া কাজ করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই হাড়ে চাপ প্রয়োগ বা পিইডিএফ ব্যবহার করে মানুষের আয়ু বাড়ানোর দাবি করার সময় এখনো আসেনি।
———
Dynamic force sensing by bone delays aging and extends lifespan. Cell Metabolism (2026).
DOI: 10.1016/j.cmet.2026.09.020
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



