আফ্রিকার প্রথম কন্টিনেন্ট-ওয়াইড মহাকাশ সংস্থা, আফ্রিকান স্পেস এজেন্সি (AfSA), ২০২৫ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। এজেন্সিটি প্রতিষ্টিত হয় ২৪ জানুয়ারি, ২০২৩ সালে আফ্রিকান ইউনিয়ন দ্বারা। বর্তমানে এর প্রথম প্রকল্প চালু হওয়ার প্রাক্কালে অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
এই সংস্থাটি গঠিত হয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়নের (AU) ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্রের একটি উদ্যোগ হিসেবে। এর প্রধান কার্যালয় রয়েছে মিশরের কায়রো শহরে। আফসা (AfSA) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান মহাকাশ কার্যক্রমগুলোর সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে। উল্লেখযোগ্যভাবে, বর্তমানে আফ্রিকার ২০টিরও বেশি দেশে মহাকাশ কর্মসূচি চালু আছে।
সংস্থার মূল অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট যোগাযোগের উন্নয়ন, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংযোগ নিশ্চিত করে। সেই সঙ্গে, মহাকাশ থেকে সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্যের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি সহায়তা এবং খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও AfSA-এর লক্ষ্য।
তবে এজেন্সিটি এখনও পুরোপুরি জনবল-সম্পন্ন নয়, এবং এর নির্দিষ্ট কর্মসূচি, বাজেট এবং অর্থায়নের উৎস এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। AfSA-এর মূল অর্থায়ন আসবে আফ্রিকান ইউনিয়নের বাৎসরিক বাজেট থেকে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৬০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে সংস্থাটি অতিরিক্তভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও অর্থ সংগ্রহ করবে বলে জানিয়েছেন আফসার মহাকাশ প্রকৌশলী মেশ্যাক কিনুয়া ন্দিরিতু (Meshack Kinyua Ndiritu)। তিনি আরও বলেন, আফ্রিকার বিভিন্ন উন্নয়নধারায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
নাইজেরিয়ার লাগোস ভিত্তিক মার্কেট রিসার্চ প্রতিষ্ঠান Space in Africa-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আফ্রিকার দেশগুলোর সম্মিলিত মহাকাশ বাজেট ছিল ৪৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি বিশ্বব্যাপি মহাকাশ ব্যয়ের ১ শতাংশেরও কম হলেও ২০১৮ সাল থেকে এ খাতে বাজেটের পরিমাণ ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে।
ক্রেডিট: Spacehubs Africa
২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল AfSA-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA), রাশিয়ার রসকসমস (Roscosmos) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মহাকাশ সংস্থা (UAE Space Agency) সংস্থাটির সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও তাদের প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল অনুষ্ঠানে।
AfSA-এর প্রথম যৌথ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকা–ইউরোপ মহাকাশ অংশীদারিত্ব, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত চার বছর মেয়াদি ৪৫ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৫১ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের একটি প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য আফ্রিকা ও ইউরোপ অঞ্চলের মধ্যে মহাকাশ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি ও আফ্রিকার মহাকাশ প্রযুক্তির পরিবেশ শক্তিশালী করা।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (MIT) মহাকাশ প্রকৌশলী ড্যানিয়েল উড (Danielle Wood) বলেন, AfSA-এর উচিত হবে বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ার পাশাপাশি আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেডিট: Wang Jiangbo/Xinhua/Getty Images
চীন বহুদিন ধরেই আফ্রিকার জাতীয় মহাকাশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে এবং আফ্রিকার মহাকাশ খাতে তাদের সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চীনা রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আফ্রিকায় বিদেশি স্যাটেলাইট চুক্তির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জিতেছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৮৭১.৫ মিলিয়ন ডলার। এটি ফ্রান্সের পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর চেয়ে তিনগুণ বেশি।
ODI Global নামক লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংকের চীন বিশেষজ্ঞ রেবেকা নাদিন (Rebecca Nadin) বলেন, চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন মহাকাশ প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার জন্য যোগাযোগ ও রিমোট-সেন্সিং স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণ করেছে এবং বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়ন করেছে। তার মতে, ভবিষ্যতে এই সম্পৃক্ততা আরও বাড়বে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন তহবিল থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে এর প্রভাব পড়বে আফ্রিকার মহাকাশ কর্মসূচির উপর। আফসার প্রকৌশলী ন্দিরিতু বলেন, “আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সময়ের সাথে পরিবর্তিত হবে, এবং আমাদের নিজস্ব কর্মসূচিগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য নতুন ও সৃজনশীল পথ খুঁজে বের করতে হবে।”
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও NASA আফ্রিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অনেক যৌথ প্রকল্পে কাজ করছে, তবে রেবেকা নাদিনের মতে, এই প্রচেষ্টা চীনের তুলনায় কম সংগঠিত ও কৌশলগতভাবে দুর্বল। তিনি বলেন, চীন আফ্রিকাকে একটি বাণিজ্যিক অংশীদার ও তাদের মহাকাশসেবা বিক্রির বাজার হিসেবে দেখে।
আফ্রিকার মহাকাশ কর্মসূচির ইতিহাস বেশ পুরনো, কিছু দেশের উদ্যোগ কয়েক দশকের পুরনো। এগুলোর বেশিরভাগই স্যাটেলাইট (যোগাযোগ ও রিমোট-সেন্সিং) ভিত্তিক। মিশর ও দক্ষিণ আফ্রিকা ১২টিরও বেশি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে, এবং অনেক দেশে রয়েছে স্যাটেলাইট ডেটা প্রক্রিয়াকরণ ও গ্রাউন্ড স্টেশন। তবে স্বল্পসংখ্যক দেশেরই স্যাটেলাইট উৎপাদনের সক্ষমতা আছে এবং অধিকাংশ এখনও বিদেশি উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। AfSA যদিও স্যাটেলাইটকেই প্রাধান্য দিচ্ছে, তবে মহাকাশ অভিযানে অংশগ্রহণ একেবারে বাতিল করে দিচ্ছে না। ন্দিরিতু বলেন, “আমরা দৌড়ানোর আগে হাঁটতে শিখতে চাই।”
MIT-এর ড্যানিয়েল উড বলেন, AfSA-এর একটি মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা জোরদার করা, যাতে অভিজ্ঞ দেশগুলো কম অভিজ্ঞ দেশগুলোর সঙ্গে নলেজ ভাগাভাগি করতে পারে এবং আঞ্চলিক চাহিদাগুলো পূরণে একযোগে কাজ করা যায়।
তিনি বলেন, “এটি একটি নতুন যুগ। যেখানে আগে মনে হতো সুযোগগুলো কেবল আফ্রিকার বাইরে, এখন আমরা বলতে পারি—আফ্রিকার ভেতরেই রয়েছে অসংখ্য নতুন সুযোগ।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।




