মানুষের মস্তিষ্ক হয়তো আসলে দুইটি প্রাচীন স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি, যেগুলো কয়েক শ কোটি বছর আগে একই কাঠামোর মধ্যে একত্রিত হয়েছিল। গতকাল অর্থাৎ ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে Nature Neuroscience জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফল থেকে এমন ধারণা সামনে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষসহ আরও কয়েকটি প্রাণীর ভ্রূণে মস্তিষ্কের সামনের ও পেছনের অংশ দুটি আলাদা ধরনের কোষ থেকে বিকশিত হয়। অর্থাৎ, এতদিন যেভাবে মনে করা হতো, মস্তিষ্কের এই দুই অংশের বিকাশ একই উৎস থেকে ঘটে, বিষয়টি তেমন নয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কাইল লোহ্ বলেন, “আমাদের গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, বিবর্তন আগে থেকেই থাকা দুটি স্নায়ুতন্ত্রকে পাশাপাশি এনে একত্র করেছে। মস্তিষ্ককে একটি অঙ্গ হিসেবে তৈরি করা সম্ভবত বেশি কার্যকর ছিল। কিন্তু মস্তিষ্ক তৈরির ক্ষেত্রে আমরা এখনো সেই আদিম দুই অংশের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করি।”
লোহ্ ও তাঁর সহকর্মীরা ইঁদুরের ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশের একেবারে শুরুর ধাপগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা দেখতে পান, মস্তিষ্কের বিকাশ শুরু হয় দুই ধরনের প্রাথমিক প্রোজেনিটর কোষ থেকে। প্রোজেনিটর কোষ হলো এমন এক ধরনের কোষ, যেগুলো নিজেদের সীমিত সংখ্যকবার পুনরুৎপাদন করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট ধরনের কোষে পরিণত হয়।
এই দুই ধরনের কোষের একটিতে OTX2 নামের একটি জিন সক্রিয় থাকে। এই কোষগুলো পরে মস্তিষ্কের সামনের অংশের নিউরনে পরিণত হয়। এর মধ্যে ফোরব্রেইন ও মিডব্রেইনের নিউরনও রয়েছে। অন্য ধরনের কোষে GBX2 নামের জিন সক্রিয় থাকে। এগুলো পরে মস্তিষ্কের পেছনের অংশ, অর্থাৎ হাইন্ডব্রেইনের নিউরনে পরিণত হয়।
এরপর গবেষকেরা ল্যাবে মানুষের কোষ নিয়ে পরীক্ষা করেন। সেখানেও তাঁরা দেখতে পান, হাইন্ডব্রেইনের নিউরন এবং ফোরব্রেইন ও মিডব্রেইনের নিউরন আলাদা ধরনের প্রোজেনিটর কোষ থেকে তৈরি হয়।
লোহ বলেন, “প্রথমবারের মতো আমরা দেখিয়েছি, মস্তিষ্কের সামনের অংশ এমন একটি প্রোজেনিটর কোষ থেকে তৈরি হয়, যেটি মস্তিষ্কের পেছনের অংশ তৈরির প্রোজেনিটর কোষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।”
এই আবিষ্কারটি ব্যাখ্যা করতে পারে, ল্যাবে মানুষের হাইন্ডব্রেইনের টিস্যু তৈরি করা এত কঠিন কেন।
লোহ্ এর ভাষ্য অনুযায়ী, গবেষকেরা সাধারণত এমন প্রোজেনিটর কোষ ব্যবহার করে হাইন্ডব্রেইনের নিউরন তৈরির চেষ্টা করতেন, যেগুলো মূলত ফোরব্রেইন ও মিডব্রেইনের নিউরনে পরিণত হওয়ার জন্য নির্ধারিত। কিন্তু এই পদ্ধতি কাজ করত না।
নতুন এই তথ্য হাতে পাওয়ার পর গবেষকেরা সঠিক ধরনের প্রোজেনিটর কোষ দিয়ে কাজ শুরু করেন। এর ফলে তাঁরা প্রথমবারের মতো ল্যাবে কার্যকর মানুষের হাইন্ডব্রেইন মোটর নিউরন তৈরি করতে সক্ষম হন।
হাইন্ডব্রেইন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু মৌলিক কাজ নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করে। এর মধ্যে শ্বাস নেওয়া, ঘুম, খাবার গ্রহণ এবং হৃদস্পন্দনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া রয়েছে। অন্যদিকে, ফোরব্রেইন উচ্চস্তরের চিন্তাভাবনা ও বিভিন্ন জটিল মানসিক কাজের প্রধান কেন্দ্র।
অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস বা ALS, যা মোটর নিউরন রোগের সবচেয়ে পরিচিত ধরন, এবং স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফির মতো রোগ হাইন্ডব্রেইনের নিউরনকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব রোগে কথা বলা ও গিলতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আরও জানতে পেরেছেন, ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির মতো GLP-1 ওষুধ ইঁদুরের ক্ষুধা কমাতে হাইন্ডব্রেইনে কাজ করে।
এখন ল্যাবে মানুষের হাইন্ডব্রেইনের নিউরন তুলনামূলকভাবে সহজে তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় ALS ও স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি নিয়ে গবেষণায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন লোহ্। একই সঙ্গে মানুষের শরীরে GLP-1 ওষুধ কীভাবে কাজ করে, তার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াও গবেষণা করা সহজ হবে।
গবেষকেরা শুধু ইঁদুর ও মানুষের ওপরেই গবেষণা সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁরা মুরগি, জেব্রাফিশ এবং অ্যাকর্ন ওয়ার্মের প্রাথমিক পর্যায়ের ভ্রূণও পরীক্ষা করেন। সেখানেও তাঁরা দেখতে পান, প্রাণীগুলোর স্নায়ুতন্ত্র একইভাবে দুই ধরনের আলাদা প্রোজেনিটর কোষ থেকে তৈরি হয়।
এই ফলাফল থেকে গবেষকদের ধারণা, দুইটি পৃথক উৎস থেকে মস্তিষ্কের বিকাশের এই ব্যবস্থা আমাদের সাধারণ পূর্বপুরুষদের মধ্যে অন্তত ৫৫ কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছিল।
এরও আগে, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি বছর আগে আমাদের বংশধারা জেলিফিশের বংশধারা থেকে আলাদা হয়ে যায়। জেলিফিশের ক্ষেত্রে দুইটি পৃথক স্নায়ুতন্ত্র দেখা যায়। লোহ্ এর মতে, আমাদের দূরবর্তী পূর্বপুরুষদের শরীরে এই দুই স্নায়ুতন্ত্র পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে থাকতে পারে। এর ফলে তাদের সামগ্রিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা বেড়ে থাকতে পারে।
মস্তিষ্কের বিকাশ দুইটি পৃথক পথে চলার বিষয়টি জটিল চিন্তাভাবনার বিবর্তনেও ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে মনে করেন লোহ্। তাঁর মতে, হাইন্ডব্রেইন যখন শ্বাস নেওয়া, হৃদস্পন্দনসহ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক কাজগুলো সামলাচ্ছিল, তখন বিবর্তন ফোরব্রেইন নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পেয়েছিল।
লোহ্ বলেন, “বিবর্তন তখন ফোরব্রেইন নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা চালাতে পেরেছে, ভুলও করতে পেরেছে। এর মধ্য দিয়েই স্মৃতি ও সৃজনশীলতার মতো জটিল বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটতে পারে।”
———
Two parallel neural ectoderm progenitors contribute to the developing brain. Nat Neurosci (2026).
DOI: 10.1038/s41593-026-02433-7
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


