ভাবুন এমন একটা পৃথিবীর কথা, যেখানে রক্তের গ্রুপ নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। যেখানে অ্যাম্বুলেন্স কোনোকিছু নিয়ে না ভেবেই জীবন রক্ষাকারী রক্ত বহন করবে, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় রক্তের অভাব হবে না, আর বেগুনি রঙের এক তরল চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের বিকল্প হবে।
শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো লাগলেও, জাপানের কাশিহারায় প্রফেসর হিরোমি সাকাইয়ের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। তাঁদের লক্ষ্য: এমন কৃত্রিম রক্ত তৈরি করা যা যেকোনো মানুষ নিতে পারবে, যা সহজে নষ্ট হবে না (সার্বজনীন দাতা খ্যাত ও নেগেটিভ (O-) রক্ত ২-৩° সেলসিয়াস ঠান্ডা তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ ৩৫ দিন সংরক্ষণ করা যায়) এবং যা যেকোনো জায়গায় খুব সহজেই ব্যবহার করা যাবে, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত।
এই উদ্যোগ শুধুমাত্র নতুন কিছু উদ্ভাবনের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ এবং জনসংখ্যার পরিবর্তনের সরাসরি প্রতিক্রিয়াও বটে। জাপানে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রক্তদাতার সংখ্যা কমছে, কিন্তু রক্ত সঞ্চালনের চাহিদা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর ১১৮ মিলিয়ন রক্তদানের ৪০% আসে উচ্চ আয়ের দেশগুলো থেকে, যা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ১৬%। এর ফলে অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে রক্ত সংকট দেখা যায়, যা প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর কারণ হয়।
এই উদ্ভাবনের মূলে রয়েছে হিমোগ্লোবিন, যা লোহিত রক্তকণিকায় অক্সিজেন বহনকারী অণু। প্রফেসর সাকাইয়ের দল ডোনারের মেয়াদোত্তীর্ণ রক্ত থেকে হিমোগ্লোবিন বের করে এটিকে লিপিড মেমব্রেন দিয়ে ঢেকে দেয়, তৈরি হয় হিমোগ্লোবিন ভেসিকল। এই ভেসিকলগুলো লোহিত রক্তকণিকার মতোই অক্সিজেন বহন করে কিন্তু এতে রক্তের গ্রুপ চিহ্নিতকারী বৈশিষ্ট্য না থাকায়, এগুলো যেকোনো রোগীকে দেওয়া যায়। এগুলো ভাইরাস-মুক্তও। এই কৃত্রিম রক্তের বেগুনি রঙ একটি উপজাত, কিন্তু এটি অক্সিজেন সরবরাহ, সংক্রমণ সুরক্ষা এবং জৈব-সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে কার্যকর। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি সাধারণ তাপমাত্রায় দুই বছর এবং ফ্রিজে পাঁচ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
জাপানের কৃত্রিম রক্তের পরীক্ষা ২০২২ সালে ছোট পরিসরে শুরু হয়, যেখানে সুস্থ পুরুষ ভলেন্টিয়ারদের দেহে ১০০ মিলিলিটার পর্যন্ত হিমোগ্লোবিন ভেসিকল দেওয়া হয়েছিল। সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া কোনো গুরুতর প্রভাব দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গবেষক দলটি জানায় তারা এ ব্যাপারে দ্রুত সফলতার দিকে এগোচ্ছে।
নারা মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর ঘোষণা করেছে। এই ধাপে ১৬ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক স্বেচ্ছাসেবককে ১০০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার কৃত্রিম রক্ত দেওয়া হবে। লক্ষ্য হলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা। যদি ৪০০ মিলি ডোজ নিরাপদ প্রমাণিত হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পূর্নাঙ্গ চিকিৎসার জন্য চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।
ক্রেডিট: Kyodo
পাশাপাশি, চুও ইউনিভার্সিটির প্রফেসর তেরুয়ুকি কোমাতসু অ্যালবুমিন-আবদ্ধ হিমোগ্লোবিন ভেসিকল নিয়ে গবেষণা করছেন যা রক্তচাপ স্থিতিশীল করতে এবং রক্তক্ষরণ ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর অবস্থার চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে। তার গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল দেখা গেছে এবং হিউম্যান ট্র্যায়াল শীঘ্রই শুরু হবে।
ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টলের কোষ জীববিজ্ঞানী প্রফেসর অ্যাশ টয়ি এই প্রচেষ্টাকে “রক্ত সঞ্চালন চিকিৎসায় সম্ভাব্য সেরা অগ্রগতি” হিসেবে প্রশংসা করেছেন। তিনি সর্বজনীন সামঞ্জস্য এবং কৃত্রিম রক্তের বন্ধ রক্তনালীতে প্রবেশ করার সম্ভাবনার উপর জোর দিয়েছেন। তবে, তিনি উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান পদ্ধতি এখনও মানব-উৎসিত হিমোগ্লোবিনের উপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে সিন্থেটিকভাবে উৎপাদিত রিকম্বিন্যান্ট হিমোগ্লোবিন আরও বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই কৃত্রিম রক্ত অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা লক্ষ লক্ষ রোগী, ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় ডাক্তার এবং দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় মানবিক কর্মীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান হতে পারে। এটি রক্ত টাইপিংয়ের সময় বাঁচাবে, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাবে এবং বিশেষ ঠান্ডা-চেন লজিস্টিকের প্রয়োজন ছাড়াই মজুত করা যাবে।
প্রফেসর সাকাই বলেন, “কৃত্রিম রক্তকণিকার প্রয়োজন অনেক বেশি, কারণ বর্তমানে লোহিত রক্তকণিকার কোনো নিরাপদ বিকল্প নেই।”
২০৩০ সালের মধ্যে জাপানের এই উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে পারে। রক্তের গ্রুপ নিয়ে আর ভাবনা নয়, বরং বেগুনি রঙের এক আশ্চর্য তরল বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে চলেছে।
জাপানের বিজ্ঞানীদের হাত ধরে তৈরি এই কৃত্রিম রক্ত শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাবে না, বরং রক্তের অভাবের মতো চিরন্তন সমস্যার এক নির্ভরযোগ্য সমাধান দেবে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, ২০৩০ সালের মধ্যে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার মানবতার জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, যেখানে রক্ত সঞ্চালনের ভবিষ্যৎ আর কখনই আগের মতো থাকবে না।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



