আমরা সাধারণত অক্সিজেনকে জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখি, নির্বিঘ্নে শ্বাস নেওয়ার উপাদান, জীবনধারণের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু অক্সিজেন আসলে রাসায়নিক ভাবে অত্যন্ত সক্রিয় (reactive) মৌল। আপনি কাঠ পোড়ানোর সময় দেখে থাকবেন যে অক্সিজেন কতটা সক্রিয়ভাবে জ্বালানি পোড়াতে সাহায্য করে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এত জীবের জীবনধারণের জন্য কেন এই রিঅ্যাক্টিভ মৌলটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
জীবজগতে হাজার রকমের বিপাকক্রিয়া (metabolism) বা রাসায়নিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যার মাধ্যমে জীবন টিকে থাকে। কিন্তু প্রায় সব ইউক্যারিওট (যাদের কোষে নিউক্লিয়াস থাকে) এবং বহু প্রোক্যারিওট (যাদের কোষে নিউক্লিয়াস থাকে না) অক্সিজেন ব্যবহার করে বেঁচে থাকে।
এখানে মূলত হেটারোট্রোফদের (heterotroph) কথা বলা হচ্ছে। হেটারোট্রোফ হলো এমন সব জীব যারা নিজেদের পুষ্টি ও শক্তি পায় অন্য জৈব পদার্থ খেয়ে, যেমন মানুষ। তবে সবাই এমন না—উদ্ভিদের মতো কিছু জীব নিজের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন নেয় বাতাসের CO₂ থেকে, যদিও শক্তির জন্য অন্য উৎস লাগে।
অক্সিজেনের রসায়ন: শক্তি তৈরির কারখানা
হেটারোট্রোফরা যখন খাবার খায়, তখন সেই জৈব পদার্থ থেকে ইলেকট্রন ছিঁড়ে নেয়। এই ইলেকট্রনগুলো মাইটোকন্ড্রিয়ার ঝিল্লির (membrane) এক এনজাইম থেকে আরেক এনজাইমে গিয়ে ছোট একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করে, যা প্রোটনগুলোকে এক পাশে ঠেলে পাঠায়। অক্সিজেন যেহেতু উচ্চ বৈদ্যুতিক আকর্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন (high electronegativity), তাই এই ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খলের (electron transport chain) শেষ গন্তব্য হিসেবে কাজ করে। এটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে এবং দুটি প্রোটন নিয়ে পানি তৈরি করে।
এই প্রক্রিয়ায় ঝিল্লির এক পাশে জমা হওয়া প্রোটনগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন চ্যানেলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, ঠিক যেন ছোট্ট কোনো জলবিদ্যুৎ বাঁধ। এই প্রোটিন, যাকে এটিপি সিন্থেস (ATP synthase) বলা হয়, টার্বাইনের মতো ঘুরতে ঘুরতে শক্তি উৎপন্ন করে যা অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) আকারে সঞ্চিত থাকে। কোষ এই শক্তি নিজের কাজে লাগায় অথবা শরীরের অন্য অংশে পাঠিয়ে দেয়।
বিকল্প কী ছিল?
জীব জগৎ অক্সিজেন ছাড়াও অনেক কিছু ব্যবহার করতে পারে ইলেকট্রন গ্রহণকারী হিসেবে, যেমন সালফেট, নাইট্রেট বা আয়রন। কিন্তু অক্সিজেন সবচেয়ে বেশি শক্তি দেয়।
Astrobiology জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের অধ্যাপক ডেভিড ক্যাটলিং ও তার গবেষণা দল উল্লেখ করেছেন, “ইলেকট্রন স্থানান্তরের সময় অক্সিজেনের হ্রাস (reduction) সবচেয়ে বেশি ফ্রি এনার্জি মুক্ত করে, ফ্লোরিন আর ক্লোরিন বাদে।”
ফ্লোরিন অক্সিজেনের চেয়েও বেশি শক্তি দিতে পারে, কিন্তু সমস্যা হলো ফ্লোরিন যখন জৈব পদার্থের সংস্পর্শে আসে, তখন সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। তাই এটা জীবদেহে ব্যবহারের যোগ্য নয়। ক্লোরিনও একই রকম বিষাক্ত। ফলে অক্সিজেনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, অর্থাৎ এটি বিষাক্ত উপাদান তৈরি করে না। অক্সিজেন ব্যবহার করে যে বিপাকীয় প্রক্রিয়া চলে (aerobic respiration), তাতে শুধু পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়, যা শরীর সহজেই সামলাতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকেও কথা আছে। অক্সিজেন অতিরিক্ত হয়ে গেলে কোষের ভেতরের DNA, প্রোটিনসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্যই আমাদের শরীর “অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট”-এর সাহায্য নেয়, যা এই ক্ষতি থেকে কোষকে রক্ষা করে।
সহজলভ্যতা: অক্সিজেনের বড় শক্তি
ফ্লোরিন বা ক্লোরিনের তুলনায় অক্সিজেন অনেক বেশি সহজলভ্য। যেহেতু উদ্ভিদ ও শৈবাল প্রতিনিয়ত ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করে, তাই এটি বাতাসে ও পানিতে প্রচুর মজুত থাকে। আর গ্যাস হিসেবে অক্সিজেন ঝিল্লির মধ্য দিয়ে সহজেই চলাচল করতে পারে, যেটা প্রাণের পক্ষে দারুণ সুবিধাজনক।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—বায়ুমণ্ডলের ৭৮% যেটা নাইট্রোজেন, সেটা কেন ব্যবহার করা হয় না?
অধ্যাপক ক্যনফিল্ড বলেন, “সমস্যা হলো নাইট্রোজেন একটি ত্রিবন্ধনে আবদ্ধ (triple bonded), আর এই বন্ধন ভাঙা খুবই কঠিন।” যদিও কিছু বিশেষ জীব আছে যারা প্রচুর শক্তি খরচ করে এই বন্ধন ভাঙতে পারে, এবং তা থেকেই জীব জগতে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে, কিন্তু সেটা সহজ ও স্বাভাবিক উপায় নয়।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান: অক্সিজেনের বিশেষত্ব
অক্সিজেনের এই অনন্য গুণের পেছনে আছে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের খেলা। সাধারণ অবস্থায় অক্সিজেন একই স্পিনের (same spin state) ইলেকট্রন গ্রহণ করে, ইলেকট্রন জোড়া নয়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি উচ্চ মাত্রায় জমে থাকা সত্ত্বেও দুম করে অতি বিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে না, কিন্তু যখন একে একে ইলেকট্রন সরবরাহ করা হয়, তখন প্রচুর শক্তি ছাড়ে—যা আমাদের কাজে লাগে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিবর্তনীয় জীবরসায়নের অধ্যাপক নিক লেইন বলেন, “অক্সিজেনের আসল কৌশল হলো—এটা একসাথে না, বরং ধাপে ধাপে ইলেকট্রন গ্রহণ করে, ফলে প্রচুর শক্তি ছাড়তে পারে।”
তাই অক্সিজেন?
সব বিবেচনায় অক্সিজেন যেন এক “সুইট স্পট”-এ অবস্থান করছে। এটা ক্লোরিন বা ফ্লোরিনের মতো অতিরিক্ত বিক্রিয়াশীল না, আবার নাইট্রোজেনের মতো চরম স্থিতিশীলও না। সালফেট বা নাইট্রেটের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর শক্তির উৎস। এটি সহজলভ্য, পরিবহনযোগ্য, এবং বিপাক শেষে বিষাক্ত কোনো বর্জ্যও তৈরি করে না।
সবচেয়ে বড় কথা, উদ্ভিদরা প্রতিনিয়ত আমাদের জন্য এই গ্যাসটি উৎপাদন করে চলেছে। আমরা শুধু এটাকে কাজে লাগাই, জীবনের ইঞ্জিন চালানোর জ্বালানির মতো করে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


