সম্প্রতি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (JWST) ডেটা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একটি বিরল এবং আশ্চর্যজনক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গঠনের সন্ধান পেয়েছেন, যা দেখতে অনেকটা পেঁচার মুখের মতো। এই গঠনটি ১১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, মহাবিশ্বের অতীতের এক দৃশ্য — যেখানে দুটি বিরল রিং গ্যালাক্সির সংঘর্ষ ঘটেছে, সৃষ্টি করেছে এই ‘কসমিক আউল’-এর।
গ্যালাক্সি সাধারণত বিভিন্ন আকৃতির হয় — যেমন আমাদের মিল্কিওয়ে হলো একটি সর্পিল (spiral) গ্যালাক্সি। তবে রিং গ্যালাক্সি একটি অত্যন্ত দুর্লভ রূপ, যেখানে একটি ছোট গ্যালাক্সি তার বড় সঙ্গীর মধ্য দিয়ে গিয়ে ধাক্কা খায়, ফলে তার কেন্দ্রের চারপাশে একটি গ্যাস ও তারকাখচিত রিং তৈরি হয়।
রিং গ্যালাক্সি মহাবিশ্বে অত্যন্ত বিরল। ধারণা করা হয় সব গ্যালাক্সির মধ্যে মাত্র ০.০১% হচ্ছে রিং গ্যালাক্সি। কিন্তু এই “কসমিক আউল” বা “নক্ষত্রপেঁচা” আরও অস্বাভাবিক, কারণ এটি দুইটি রিং গ্যালাক্সির সংঘর্ষে তৈরি! গবেষণাপত্রটি ১১ জুন, ২০২৫ তারিখে arXiv-এ প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি এখনও পিয়ার-রিভিউ হয়নি, তবে এর অস্তিত্ব ইতোমধ্যেই আরেক গবেষকদল আলাদাভাবে নিশ্চিত করেছে, যারা এটিকে “ইনফিনিটি গ্যালাক্সি” নামে ডেকেছে।
চীনের চিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল শিক্ষার্থী মিংইউ লি ও তার সহকর্মীরা JWST-এর পাবলিক ডেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই পেঁচামুখো গ্যালাক্সি জোড়ার সন্ধান পান। তাঁরা মহাকাশের বৃহত্তম মোজাইক ‘COSMOS ফিল্ড’ অঞ্চলের রেডিও সোর্সগুলো বিশ্লেষণ করছিলেন। হাই-রেজুলিউশন ইমেজে এই গ্যালাক্সি জোড়াটি চোখে পড়ে — দুইটিই রিং গ্যালাক্সি, এবং আকারে মিল্কিওয়ের চার ভাগের এক ভাগ, প্রায় ২৬,০০০ আলোকবর্ষ চওড়া।
প্রত্যেক গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যার প্রতিটিই সূর্যের চেয়ে ১ কোটিরও বেশি গুণ ভারী। এই কেন্দ্রীয় অঞ্চলদুটি মিলে তৈরি করেছে পেঁচার দুটি চোখ। ব্ল্যাক হোল দুটি এখনো তাদের চারপাশ থেকে পদার্থ টেনে নিচ্ছে, যাকে বলে “active galactic nuclei” — অর্থাৎ সক্রিয় গ্যালাক্টিক কেন্দ্র।
তবে এই মহাকাশীয় পেঁচার চোখ যতটা শান্ত, তার “ঠোঁট” বা সংঘর্ষস্থল ততটাই উত্তাল। সেখানে গ্যালাক্সি দুটি একে অপরের গায়ে ধাক্কা দিয়ে একটি বিস্ময়কর পরিমাণে আণবিক গ্যাস জমাট করে তুলেছে। গবেষকদের মতে, এটি হলো তারার জন্মের কাঁচামাল, যা এই সংঘর্ষে চাপে পড়ে নতুন তারা তৈরিতে ব্যস্ত। ALMA টেলিস্কোপের ডেটায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলটিতে বর্তমানে চলছে বিশাল তারাগোষ্ঠীর সৃষ্টি।
ক্রেডিট: Li et al.
আরও চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত Very Large Array (VLA) টেলিস্কোপের রেডিও-তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ থেকে। এক গ্যালাক্সির ব্ল্যাক হোল থেকে নির্গত চার্জযুক্ত কণার জেট ওই গ্যাসে আঘাত করছে, ফলে গ্যাস আরও সঙ্কুচিত হয়ে বিশাল এক ‘তারা তৈরির নার্সারি’ বা তারাকেন্দ্র তৈরি হয়েছে।
গ্যালাক্সির সংঘর্ষ অনেক সময় কয়েক শ’ মিলিয়ন বছর স্থায়ী হয়। গবেষকরা ধারণা করছেন, এই সংঘর্ষটি ঘটেছিল প্রায় ৩.৮ কোটি বছর আগে। ফলে এই পেঁচাসদৃশ দৃশ্যটি এখনও অনেক দিন ধরেই আমাদের সামনে দৃশ্যমান থাকবে।
তবে এর সৌন্দর্যই একমাত্র গুরুত্ব নয়। মিংইউ লির মতে, এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি “প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার”, যেখানে গ্যালাক্সির বিবর্তনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া একসাথে চলছে — যেমন, রেডিও জেট ও শকওয়েভের প্রভাবে নক্ষত্রের জন্মের হার দ্রুত বেড়ে যাওয়া। এটি বোঝায় যে, প্রাচীন মহাবিশ্বে নক্ষত্রের ভর এত দ্রুত কীভাবে গঠিত হয়েছিল, তার এক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এই গঠনেই নিহিত থাকতে পারে।
গবেষকরা ভবিষ্যতে আরও সিমুলেশন চালিয়ে বোঝার চেষ্টা করবেন যে, ঠিক কী অবস্থায় এমন “টুইন-রিং” ধাঁচের বিরল গঠন তৈরি হয়।
JWST আগে এরকম নানা অদ্ভুত গঠন খুঁজে পেয়েছে — যেমন প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো গ্যালাক্সির জোট, কিংবা নবজন্ম নেওয়া নক্ষত্রের গ্যাসের ধোঁয়া, যা দেখতে অনেকটা বিড়ালের লেজের মতো। এই নতুন “কসমিক আউল” সেগুলোর কাতারেই একটি নতুন, রহস্যময় সংযোজন। আমাদের মহাবিশ্ব যে এক বিশাল কল্পনালোক, তারই আরেকটি প্রমাণ এটা।
———
The Cosmic Owl: Twin Active Collisional Ring Galaxies with Starburst Merging Front at z=1.14, arXiv (2025).
DOI: 10.48550/arxiv.2506.10058
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



