নীল হাঙর বা ব্লু শার্ক (Prionace glauca) তার নামের চেয়েও বেশি কিছু হতে পারে। সামুদ্রিক এই চতুর শিকারির ত্বকে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু ন্যানো-গঠন আবিষ্কার করেছেন যা শুধু হাঙরের চিরাচরিত নীল রঙই তৈরি করে না, বরং ক্যামেলিয়নের মতো রঙ বদলানোর ক্ষমতাও রাখতে পারে।
প্রাণীরা বিভিন্নভাবে তাদের রঙ সৃষ্টি করে। কেউ কেউ তাদের শরীরে থাকা রঞ্জক কোষ (pigmented cells) ব্যবহার করে চারপাশের আলো থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য (wavelength) ছেঁটে ফেলে কাঙ্ক্ষিত রঙ ফুটিয়ে তোলে। আবার কেউ কেউ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গঠনের মাধ্যমে আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গ ছড়িয়ে বা প্রতিফলিত করে রঙ সৃষ্টি করে – যেমন ময়ূরের পালক।
কিন্তু খুব অল্প কিছু প্রাণী পরিবেশ অনুযায়ী নিজেদের রঙ-গঠন সামঞ্জস্য করতে পারে। তারা কীভাবে আলো শোষণ বা প্রতিফলন করে তা পরিবর্তন করতে সক্ষম।
সিটিওয়াই ইউনিভার্সিটি অব হংকং (City University of Hong Kong – CUHK)-এর গবেষকরা নতুন এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে নীল হাঙরও এমনই এক প্রাণী যার ত্বক পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রঙ পাল্টাতে পারে।
নামে যেমন বোঝা যায়, নীল হাঙরের পিঠ গাঢ় নীল এবং পেটের দিক তুলনামূলক হালকা রঙের হয়ে থাকে। এদের ত্বকে ক্ষুদ্র দাঁতের মতো আঁশ থাকে, যাকে বলা হয় dermal denticles। প্রতিটি আঁশের ভেতরে থাকে একটি pulp cavity, যা রঙ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক্রেডিট: Dr. Viktoriia Kamska
গবেষকরা ইলেকট্রন ও অপটিকাল মাইক্রোস্কোপ, স্পেকট্রোস্কোপি এবং অন্যান্য ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই আঁশগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা দেখেন, এই গহ্বরে guanine স্ফটিক থাকে যা নীল আলো প্রতিফলিত করে। এছাড়াও থাকে melanin নামক রঞ্জকের ক্ষুদ্র থলি, যা অন্যান্য রঙ শোষণ করে।
CUHK-এর মলিকিউলার বায়োলজিস্ট ভিক্টোরিয়া কামস্কা বলেন, “এই উপাদানগুলো আলাদাভাবে কোষে থাকে – যেন একদিকে আয়নাভর্তি ব্যাগ, আরেকদিকে কালো রঙ শোষণকারী ব্যাগ – কিন্তু একসঙ্গে এমনভাবে সাজানো যে তারা একসঙ্গে কাজ করে।”
গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই গঠনের ফলে শুধু হাঙরের নীল রঙই তৈরি হয় না, বরং এই গঠন তাদের রঙ পাল্টানোর সম্ভাবনাও রাখে। Guanine স্ফটিকগুলোর স্তরের মধ্যে ব্যবধান যত সংকীর্ণ, ত্বক তত বেশি নীল দেখায়। কিন্তু যদি সেই ব্যবধান একটু বিস্তৃত হয়, তবে তা সবুজ বা হলুদ রঙও তৈরি করতে পারে।
গিরগিটির বা ক্যামেলিয়নের ক্ষেত্রেও রঙ বদলানোর পদ্ধতি গঠিত হয় guanine স্ফটিকের বিন্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে। হাঙরের ক্ষেত্রেও এটি প্রাকৃতিকভাবে তাদের ছদ্মবেশ (camouflage) ক্ষমতা বাড়াতে পারে। যেমন, যদি তারা গভীর পানিতে ডুব দেয়, তাহলে পানির চাপে স্ফটিক স্তরগুলো আরও কাছাকাছি চলে আসবে এবং ত্বক আরও গাঢ় হবে, যা গভীর পানির অন্ধকার পরিবেশের সঙ্গে মিলে যাবে।
তবে এই প্রভাব আপাতত গবেষণাগারে কেবল সিমুলেশন বা কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে দেখা গেছে। গবেষকরা এখন প্রকৃত পরিবেশে, হাঙরের উপর এই প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে তা অনুসন্ধান করতে চান। এর মাধ্যমে জানা যাবে, প্রকৃতি কীভাবে এত সূক্ষ্ম স্তরে (ন্যানোস্কেল) রঙ তৈরি করে।
———
বেলজিয়ামে অনুষ্ঠিত Society for Experimental Biology Annual Conference-এ গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়েছিল।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



