প্রথমবারের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের বাইরে একটি সদ্য গঠিত সৌরজগতের খোঁজ পেয়েছেন। উক্ত সৌরজগতটিতে এখন গ্রহ তৈরির সূচনা ঘটছে। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা এমন একটি নবীন সৌরজগতের খোঁজে ছিলেন, যাতে আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের উৎপত্তি ও বিকাশ বোঝা যায়। এই গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পৃথিবীভিত্তিক ও মহাকাশভিত্তিক টেলিস্কোপ। লক্ষ্যবস্তু ছিল পৃথিবী থেকে ৪২০ পারসেক দূরের এক তরুণ নক্ষত্র যার নাম HOPS-315। এ ব্যাপারে গবেষণাপত্রটি গত ১৬ জুলাই, ২০২৫ এ Nature জার্নালে প্রাকাশিত হয়।
পারডিউ ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গবেষণাপত্রটির কো-রাইটার মেরেল ফান্ট হফ বলেন, “আমরা অনেকদিন ধরেই এমন এক ‘শিশু সৌরজগত’ খুঁজছিলাম, যা আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের শৈশবকালের প্রতিরূপ হতে পারে।”
প্রথমে বিজ্ঞানীরা HOPS-315-কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন কারণ এর চারপাশে crystalline silicate খনিজের উপস্থিতি ধরা পড়ে যা গ্রহ গঠনের শুরুর দিকের চিহ্ন। সাধারণত এই ধরণের খনিজ কণাগুলো গ্যাস ও ধূলিকণার ঘূর্ণায়মান ডিস্কে ঘনীভূত হয়ে গ্রহ গঠন শুরু করে।
ওরায়ন নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই নবীন নক্ষত্রটিকে বিজ্ঞানীরা আকর্ষণীয় মনে করেন আরও একটি কারণে। কারণটি হলো এর ডিস্ক বা ঘূর্ণায়মান গ্যাস-ধূলির স্তরটি দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কারভাবে। সচরাচর নবজাত নক্ষত্র থেকে নির্গত গ্যাসজেট (outflow) এই ডিস্ক ঢেকে ফেলে, কিন্তু HOPS-315 ছিল অনন্য, কারণ তার ডিস্ক সম্পূর্ণ দৃশ্যমান ছিল।
এই ডিস্কের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন James Webb Space Telescope (JWST)। তারা সেখানে প্রথমবারের মতো উষ্ণ সিলিকন মনোক্সাইড (SiO) এর উপস্থিতি শনাক্ত করেন। সেইসঙ্গে দেখা যায়, ডিস্কের মধ্যবর্তী অংশ খুবই উষ্ণ এবং সেই উষ্ণতায় খনিজ গলে গিয়ে পরে ঠান্ডা হয়ে আবার ঘনীভূত হয়েছে যা গ্রহ গঠনের জন্য অপরিহার্য উপাদান।
গবেষণার প্রধান লেখক, লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেলিসা ম্যাকক্লুর বলেন, “এই গরম খনিজ পদার্থই ডিস্কে গ্রহ তৈরির প্রথম উপাদান। এখান থেকেই সবকিছুর শুরু।”
এই গবেষণায় আরও অংশ নিয়েছে চিলির Atacama Large Millimeter-submillimeter Array (ALMA)। ALMA ও JWST-র সমন্বিত পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, এই নবীন নক্ষত্রের মাঝামাঝি অংশে এতটা উত্তাপ ছিল যে তা পাথরকে বাষ্পে পরিণত করেছে। পরে সেই গ্যাস ঠান্ডা হয়ে আবার খনিজে পরিণত হয়েছে।
ম্যাকক্লুর বলেন, “HOPS-315-কে আমরা এমন এক মুহূর্তে দেখেছি, যেটাকে বলা যায় গ্রহ গঠনের ‘টাইম জিরো’। এই মুহূর্তটি আগে কখনও এত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি।”
এর আগে বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের অতীত ব্যাখ্যা করেছেন উল্কাপিণ্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে যেগুলো ছিল সৌরজগত গঠনের সময়কার অবশিষ্টাংশ। তবে, HOPS-315-এর মতো ‘লাইভ অ্যাকশন’ দৃশ্যপট আমাদের নতুন তথ্য দেয়। “এটা দেখে আমরা ভাবতে পারি, আমাদের সূর্য মাত্র এক লক্ষ বছর বয়সে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দিয়ে যাচ্ছিল,” বলেন ম্যাকক্লুর।
গবেষণায় অংশ না নিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের National Radio Astronomy Observatory-র জ্যোতির্বিদ জন টোবিন মনে করেন, “এই প্রথম আমরা গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়াটাকে সরাসরি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমরা এখনও কেবল এর প্রাথমিক স্তরে পৌঁছেছি।”
ফান্ট হফ বলেন, তিনি HOPS-315 সম্পর্কে আরও জানতে চান। এর গঠন, তাপমাত্রা এবং এর মধ্যে আর কী কী অণু রয়েছে। এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে, তারা ভবিষ্যদ্বাণী করতে চান এই নবীন সৌরজগত কীভাবে বেড়ে উঠবে, কৈশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কী হবে। “মানুষের বেড়ে ওঠার ধাপগুলোর মতোই, প্রতিটি সৌরজগত আলাদা আলাদা। সেটাই আমরা বোঝার চেষ্টা করছি।”
———
Refractory solid condensation detected in an embedded protoplanetary disk. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09163-z
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


