কালপুরুষ নক্ষত্রমন্ডলীতে অবস্থিত লাল দানব নক্ষত্র (Red Supergiant) বেটেলজিউস (Betelgeuse) সম্পর্কে বহুদিনের একটি রহস্য অবশেষে সমাধান হলো। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অবশেষে এর চারপাশে ঘুরতে থাকা একটি ছোট ও ম্লান সহচর/সঙ্গী নক্ষত্রর দেখা পেয়েছেন।
এই ক্ষীণ নক্ষত্রটির বৈশিষ্ট্য বেটেলজিউসের আচরণের ওপর ভিত্তি করে আগে থেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। আরবিতে ‘বেটেলজিউস’ অর্থ ‘দানবিনীর হাত’। তাই গবেষক দল প্রস্তাব করেছেন, এই সহচর নক্ষত্রটির নাম হোক সিওয়ারহা (Siwarha), অর্থাৎ ‘তার চুড়ি’।
এই আবিষ্কার এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে অনেকে ভাবতেন, এটি কখনোই সম্ভব হবে না। তাই একে ‘বিস্ময়কর সাফল্য’ বলতেই হয়।
NASA Ames Research Center-এর জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভ হাওয়েল বলেন, “এটি ছিল জেমিনি টেলিস্কোপের হাই-অ্যাঙ্গুলার বিশ্লেষণক্ষমতার চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে করা একটি পর্যবেক্ষণ, এবং এটা সফল হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও অনুসন্ধানের পথ খুলে গেল।”
আনুমানিক ৫৪৮ আলোকবর্ষ দূরে কালপুরুষ (Orion) নক্ষত্রপুঞ্জে অবস্থিত বেটেলজিউস (বাংলা নাম আদ্রা) হলো আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল এবং বৃহৎ নক্ষত্র। এটি আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ১৬.৫ থেকে ১৯ গুণ ভারী এবং ব্যাস প্রায় ৭৬৪ গুণ।
ক্রেডিট: International Gemini Observatory/NOIRLab/NSF/AURA/M. Zamani
মাত্র ১ কোটি বছর বয়স হলেও এটি তার শেষ সময় পার করছে। কারণ বিশাল নক্ষত্ররা বেশি গরম ও উজ্জ্বল হয় এবং দ্রুত জ্বলে উঠে সুপারনোভা বিস্ফোরণে শেষ হয়। এই কারণেই বেটেলজিউস আমাদের নিকটবর্তী ও অল্পায়ু একটি নক্ষত্র যা বিস্ময়কর বিশ্লেষণের জন্য বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে।
এই পর্যবেক্ষণ থেকে মিলেছে অনেক অদ্ভুত তথ্যও। যেমন, ২০২০ সালের দিকে হঠাৎই বেটেলজিউসের আলো ৩৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল, যা পরে বিশাল ধূলিকণার নির্গমনের ফল বলে প্রমাণিত হয়।
বেটেলজিউসের আলো আরও নানা সময়ে ওঠানামা করে। এর দুটি বড় আলো-চক্র আছে, একটি ৪০০ দিনে, অন্যটি ৬ বছরে একবার। প্রথমটি নক্ষত্রর ইন্টারনাল পালসেশনের কারণে, তবে দ্বিতীয়টি নিয়ে ছিল বিভ্রান্তি।
বিগত কয়েকটি (১, ২) গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, একটি ক্ষুদ্র সহচর/সঙ্গী নক্ষত্র (আনুমানিক সূর্যের চেয়ে ১ থেকে ২ গুণ ভারী) এই ছয় বছরব্যাপী চক্রের জন্য দায়ী হতে পারে। তারা এমন পূর্বাভাসও দিয়েছিলেন যে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এটি দেখা যেতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এত বড় ও উজ্জ্বল বেটেলজিউসের পাশে ছোট একটি ম্লান নক্ষত্র খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাই গবেষকরা ব্যবহার করলেন স্পেকল ইমেজিং (speckle imaging) নামক একটি পদ্ধতি, যা খুব ছোট এক্সপোজার সময় ব্যবহার করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ডিসটর্শন দূর করে।
তাদের পাওয়া ফলাফল এখনও একেবারে নিশ্চিত নয় (১.৫ সিগমা), কিন্তু ঠিক পূর্বাভাস অনুযায়ীই ওই নক্ষত্রটিকে পাওয়া গেছে।
হাওয়েল এবং তাঁর দলের মতে, সিওয়ারহার ভর সূর্যের প্রায় ১.৬ গুণ, আর এটি বেটেলজিউস থেকে গড়ে ৪ অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিট (AU) দূরে ঘোরে অর্থাৎ সূর্য-পৃথিবীর দূরত্বের চারগুণ। এতে করে এর একবার আবর্তনে সময় লাগে প্রায় ৫.৯৪ বছর।
গবেষকরা বলেন, “এই ফলাফল নির্ধারক নয়, তবে বেটেলজিউসের একটি সঙ্গী নক্ষত্র থাকার ব্যাপারে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং শক্তিশালী প্রমাণ।”
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিওয়ারহা একটি F-টাইপ নক্ষত্র, যা এখনো মেইন সিকোয়েন্সে প্রবেশ করেনি অর্থাৎ এখনো এর কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন শুরু হয়নি।
যদিও বেটেলজিউস ও সিওয়ারহা সম্ভবত একই সঙ্গে জন্মেছিল, বিশালতার কারণে বেটেলজিউসের জীবন প্রায় শেষের পথে, আর সিওয়ারহার জীবন শুরুই হয়নি ঠিকমতো।
দুর্ভাগ্যবশত, হয়তো হবেই না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, আগামী ১ লাখ বছরের মধ্যে বেটেলজিউস সুপারনোভা বিস্ফোরণে ধ্বংস হবে এবং পেছনে একটি নিউট্রন তারা রেখে যাবে। সে সময় সিওয়ারহাও থাকবে সরাসরি তার বিপর্যয়রেখায়।
সিওয়ারহাকে আবারও পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ আসবে ২০২৭ সালের নভেম্বর মাসে। এর মধ্যেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেন তাদের প্রযুক্তি আরও উন্নত করতে হবে, যাতে আরও ভালোভাবে ধরা যায় এই রহস্যময় ও দূর্ভাগা নক্ষত্রটিকে।
———
Probable Direct Imaging Discovery of the Stellar Companion to Betelgeuse. ApJL (2025).
DOI: 10.3847/2041-8213/adeaaf
(arXiv)
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



