যখন জীববিজ্ঞানী অ্যান্টোনিও ব্রান্দাও বলেন যে তিনি একটি মশা কারখানায় কাজ করেন, তখন অনেকেই হতবুদ্ধি হয়ে যান। লোকেরা তাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে, “আরও মশা বানাতে হবে কেন? আমাদের তো আগেই যথেষ্ট আছে।” কিন্তু তিনি যখন বোঝান যে ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত এই বিশেষ মশারা আসলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সাহায্য করতে পারে—যে রোগ প্রতি বছর ব্রাজিলে লাখ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করে, জ্বর, মাথাব্যথা আর হাড়ের ব্যথা সৃষ্টি করে—তখন তারা মত বদলায়।
ব্রান্দাও শুধু কোনো সাধারণ মশা কারখানার ম্যানেজার নন, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মশা কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাপক। দক্ষিণ ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে অবস্থিত এই কারখানা এবছর জুলাই মাসে চালু হয়। এখানে প্রতি সপ্তাহে ১০ কোটি Aedes aegypti মশার ডিম উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এরা প্রকৃতির মশাদের মতো নয়। প্রাকৃতিক Aedes aegypti হলো ডেঙ্গু ভাইরাসের মূল বাহক, কিন্তু কারখানায় উৎপাদিত মশাদের শরীরে হার্মলেস Wolbachia নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার এক বাংলাদেশি গবেষণা বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করা মশায় একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এই ব্যাকটেরিয়া মশাদের ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পরিকল্পনা হলো—এই মশাদের (যাদের গবেষকরা ডাকেন “ওলবিতো”) শহরে ছেড়ে দেওয়া হবে, যাতে তারা বুনো মশাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মে Wolbachia ছড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে এলাকার মশাদের বেশিরভাগের শরীরে ব্যাকটেরিয়াটি থেকে যাবে এবং ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমে আসবে।
এই কৌশলটি (ওলবিতো স্ট্র্যাটেজি) বাস্তবায়ন করছে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড মশকুইটো প্রোগ্রাম (WMP)। এটি ইতিমধ্যেই কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে সফলতা দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিলের নিটেরই শহরে যেখানে Wolbachia-যুক্ত মশা ছাড়া হয়েছে, সেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৬৯% কমে যায়। দেশের ফেডারেল সরকার এখন ভ্যাকসিনের মতো অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি এই নতুন উপায়ও গ্রহণ করেছে, বিশেষ করে গত বছর দেশে রেকর্ড ৬৫ লাখ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর।
কারখানার ভেতরের কর্মচাঞ্চল্য
একটি মশা ডিম পাড়তে সামান্য পানি পেলেই যথেষ্ট, যেমন পুরোনো টায়ারের ভেতরে জমে থাকা পানি বা বোতলের ঢাকনায় থাকা ফোঁটা। শহরে মশা দমনে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই প্রবণতাকে কারখানা তাদের সুবিধায় কাজে লাগাচ্ছে। এখানে এমন বিশেষ ক্যাপসুল তৈরি করা হয়েছে যা ওষুধের ক্যাপসুলের মতো দেখতে এবং প্রতিটিতে প্রায় ৫০০ মশার ডিম রাখা যায়। এগুলো সহজেই বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো যায় এবং সামান্য পানিতে মিশিয়ে ডিম ফুটানো সম্ভব। ক্যাপসুলে আগে থেকেই মাছের খাবারও দেওয়া থাকে, যা ডিম ফেটে বের হওয়া লার্ভাদের খাওয়ার জন্য।
প্রতি সপ্তাহে এত বিপুল সংখ্যক ডিম উৎপাদন করতে, মিলিয়ন মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মশাকে সারাক্ষণ মিলন ও ডিম পাড়ার পরিবেশে রাখা হয়। গবেষকরা নিশ্চিত করেন যে সব মশার শরীরে Wolbachia ব্যাকটেরিয়ার সঠিক স্ট্রেন রয়েছে।
কারখানার সবচেয়ে আকর্ষণীয় কক্ষগুলোর একটিতে ৬৬টি বিশাল জালঘেরা খাঁচা রয়েছে, প্রতিটিতে একজন মানুষ ঢুকতে পারবে এমন সাইজ। এখানে মোটামুটি ১ কোটি মশা রাখা হয়। প্রতিটি খাঁচার নিচে রাখা কাগজের ফিতায় মা মশারা ডিম পাড়ে। এই ক্ষুদ্র কালো ডিমগুলো (যা বালুকণার মতো ছোট) সংগ্রহ করা হয়, তারপর ক্যাপসুলে ভরা হয় বা নতুন প্রজন্মের জন্য ল্যাবে ফোটানো হয়।
তবে ডিম থেকে মশার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো সহজ কাজ নয়। Aedes aegypti-এর জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে ভিন্ন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রয়োজন। ডিমগুলো শুকিয়ে না যায় এজন্য সেগুলো ঠান্ডা কিন্তু আর্দ্র কক্ষে রাখা হয়। কিন্তু লার্ভাদের উষ্ণ পরিবেশ দরকার, তাই তাদের আলাদা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে সরানো হয়। গবেষক মারলেন সালাজার বলেন, “ওরা খুবই নাজুক। তাপমাত্রা বা আর্দ্রতার সামান্য পরিবর্তনও উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
রক্তের জোগান
মশাদের খাবারের বিষয়টিও অপ্রত্যাশিতভাবে জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। Aedes aegypti-র স্ত্রী মশাদের ডিম পাড়ার জন্য রক্ত দরকার। শহরে বুনো মশারা সহজেই মানুষের রক্ত পেয়ে যায়, কিন্তু কারখানার মশাদের জন্য এত রক্ত সরবরাহ করা কঠিন। ছোটখাটো মশা গবেষণা ল্যাবগুলোতে সাধারণত ব্লাড ব্যাংক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণের কাছাকাছি থাকা রক্ত পাওয়া যায়। কিন্তু পূর্ণ ক্ষমতায় চললে Wolbachia কারখানার প্রতি সপ্তাহে ৭০ লিটার রক্তের প্রয়োজন হবে! মানুষের রক্তের ওপর নির্ভর করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাই তারা অন্য ব্যবস্থা নিয়েছে, একটি স্থানীয় ঘোড়ার খামার থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়, যেখানে নিয়মিত অ্যান্টিভেনম তৈরি করতে ঘোড়ার রক্ত নেওয়া হয়। প্রতিটি ঘোড়া থেকে একবারে প্রায় ৮ লিটার রক্ত নেওয়া সম্ভব, এতে প্রাণীর কোনো ক্ষতি হয় না। তবে মশারা নতুন এই খাবারের সাথে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নিচ্ছে। কারখানার সিইও এবং গবেষক লুসিয়ানো মোরেইরা বলেন, “আমাদের উপনিবেশকে সম্পূর্ণভাবে পশুর রক্তে অভ্যস্ত হতে কয়েক প্রজন্ম সময় লাগতে পারে।” এজন্য তারা পশুর রক্তের সাথে অল্প পরিমাণ মানব রক্ত মিশিয়ে দিচ্ছেন।
টিকে থাকার জন্য মানিয়ে নেওয়া
তবে শুধু রক্ত নয়, বুনো পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ওলবিতোদের আরও শক্ত হতে হবে। ব্রাজিলের অনেক শহরে বুনো মশারা কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। ফলে কারখানার মশারা তাদের তুলনায় দুর্বল হয়ে যায়। তাই তারা লক্ষ্য শহরগুলো থেকে বুনো মশা সংগ্রহ করে ল্যাবে Wolbachia-যুক্ত স্ত্রী মশাদের সাথে মিলিয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরি করছে। এতে মুক্তি দেওয়া মশারা পরিবেশে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারবে।
এছাড়া প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত ফাঁদ বসিয়ে ডিম সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওলবিতোরা বুনো মশাদের সঙ্গে সফলভাবে মিশে যাচ্ছে। একইসাথে দীর্ঘমেয়াদে নজরদারি চালানো হবে ডেঙ্গু ভাইরাস Wolbachia-র বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ তৈরি করছে কি না তা বুঝতে।
জনমত ও ভুয়া খবরের চ্যালেঞ্জ
তবে চ্যালেঞ্জ কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, সামাজিকও বটে। জুলাইয়ে কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা গুজব ছড়িয়েছে যে এই মশারাই নাকি রোগ ছড়াচ্ছে। মোরেইরা বলেন, “আমাদের অনেক সমর্থক আছে, আবার অনেক সমালোচকও।” এমনকি এক ব্যক্তি কারখানার বাইরে ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে পোস্ট করে, যেখানে কিছু মন্তব্যে ভবনটি পুড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ফলে পুলিশে অভিযোগ জানাতে হয়েছে।
তাই এখন কারখানার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মানুষকে বোঝানো। কারখানার ইমপ্লিমেন্টেশন ম্যানেজার গ্যাব্রিয়েল সিলভেস্ট্রে রিবেইরো জানান, প্রতিটি এলাকায় মশা ছাড়ার আগে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বৈঠক, কর্মশালা ও বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করেন। পাশাপাশি জরিপ চালান মানুষ বিষয়টি বুঝেছে ও মেনে নিয়েছে কিনা তা যাচাই করতে। রিবেইরো বলেন, “আমরা নিয়মিতভাবে ৯০% এর বেশি সমর্থন দেখতে পাচ্ছি।”
প্রথমবার ২৭ আগস্ট, ২০২৫ সান্তা কাতারিনা অঙ্গরাজ্যে মশা ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়াতেও ওলবিতো ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



