পৃথিবীর গভীরে, হাজার হাজার কিলোমিটার নিচে, ম্যান্টল ও কেন্দ্রের সীমানার কাছাকাছি থাকা উপাদানে ঘটেছে রহস্যময় এক পরিবর্তন।
ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে। তবে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি বিষয়টি ধরতে সক্ষম হন, যখন তারা পৃথিবীর মহাকর্ষের পরিবর্তন মাপা একজোড়া পুরনো স্যাটেলাইটের ডেটা বিশ্লেষণ করছিলেন। তাদের ধারণা, পৃথিবীর ম্যান্টল ও কেন্দ্রের সীমানার কাছে থাকা কিছু শিলা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আরও ঘন হয়ে উঠেছিল।
এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে কারণ ভূতাত্ত্বিক ওই পরিবর্তন পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছিল। “এটি একেবারেই নতুন ধরনের পর্যবেক্ষণ,” বলেন প্যারিস সিটি ইউনিভার্সিটির ভূ-পদার্থবিদ ইসাবেল পানেট। তিনি ও তার সহকর্মীরা গত মাসে Geophysical Research Letters জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশ করেছেন।
পানেট জানান, এ আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে—ভঙ্গুর ভূত্বক, কঠিন ম্যান্টল ও আংশিক তরল কেন্দ্র। এসব স্তরের আন্তঃসম্পর্ক বড় ভূমিকম্পের উৎপত্তি, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বজায় রাখা (যা সৌর ঝড় থেকে রক্ষা করে) ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত।
পানেটের দল আবিষ্কারটি করেছে মার্কিন–জার্মান স্যাটেলাইট যুগল GRACE (Gravity Recovery and Climate Experiment)-এর ডেটা ব্যবহার করে। ২০০২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এই স্যাটেলাইট দুটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছে।
যখন কোনো বিশাল পর্বতশ্রেণীর মতো মহাকর্ষীয় টানে তারা পড়ত, সামনের স্যাটেলাইটটি পেছনেরটি থেকে খানিকটা দূরে সরে যেত। সেই ক্ষুদ্র দূরত্ব পরিবর্তন হিসাব করে মহাকর্ষের পরিবর্তন ধরা সম্ভব হতো। সাধারণত গবেষকরা এই পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ পানির নিঃশেষ হওয়া বা হিমবাহ গলতে থাকার মতো বিষয়গুলো মাপতেন।
কিন্তু GRACE আরও গভীর পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম ছিল। এর আগে পানেট বড় ভূমিকম্পের আগে কয়েকশ কিলোমিটার গভীরে ভর পরিবর্তন খুঁজতে এটি ব্যবহার করেছিলেন। এবার তিনি প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার নিচে, কেন্দ্র–ম্যান্টল সীমানা পর্যন্ত অনুসন্ধান চালালেন।
২০০৭ সালের দিকে আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলের কাছাকাছি একটি অদ্ভুত সংকেত ধরা পড়ে GRACE ডেটায়। এটি পানির চলাচল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়নি। পানেট বলেন, “অন্তত আংশিকভাবে হলেও এর উৎস অবশ্যই পৃথিবীর ভেতরের কঠিন স্তরেই।”
এর আগে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র মাপা স্যাটেলাইটগুলো একই অঞ্চলে ২০০৭ সালের দিকে কিছু অস্বাভাবিকতা ধরেছিল। পানেটের ধারণা, নতুন মহাকর্ষগত পর্যবেক্ষণ হয়তো সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কিত।
বিজ্ঞানীদের মতে, ম্যান্টলের তলদেশে থাকা ‘পেরোভস্কাইট’ নামের একটি খনিজ প্রচণ্ড চাপের কারণে কাঠামো বদলেছে। এর ফলে শিলাগুলো ঘন হয়ে ভর বেড়ে গেছে। আশেপাশের শিলাগুলো অবস্থান পরিবর্তন করেছে, আর সেই পরিবর্তন সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে ম্যান্টল–কোর সীমা প্রায় ১০ সেন্টিমিটার বিকৃত করেছে। এতে তরল কেন্দ্রের প্রবাহ বদলে গিয়ে চৌম্বকক্ষেত্রে অস্বাভাবিক সংকেত দেখা দিতে পারে।
তবে পানেট সতর্ক করে বলেছেন, “এটি এখনও আরও গবেষণা করা দরকার।”
তবুও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির ভূকম্পবিদ বারবারা রোমানোভিজ বলেন, আবিষ্কারটি “খুবই আকর্ষণীয়।” তার ভাষায়, “প্রথমবারের মতো আমরা এমন প্রমাণ পেলাম যে ম্যান্টলের তলদেশে গতিশীল প্রক্রিয়া ঘটছে, যেটা আমরা ঘটার সময়েই পর্যবেক্ষণ করতে পারি।”
এখন পর্যন্ত পানেট ও তার দল আর কোনো বড় মহাকর্ষ সংকেত খুঁজে পাননি। তবে তারা GRACE-এর উত্তরসূরি স্যাটেলাইটগুলোর ডেটা পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে বোঝা যায় ভবিষ্যতে পৃথিবীর গভীরে আর কোনো রহস্যময় পরিবর্তন ঘটছে কিনা।
———
GRACE Detection of Transient Mass Redistributions During a Mineral Phase Transition in the Deep Mantle, Geophysical Research Letters (2025)
DOI: 10.1029/2025GL116408
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


