দুটি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে জোরালো সংঘর্ষ বিজ্ঞানীদের সুযোগ দিয়েছে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করার। ফলাফল দেখিয়েছে, আইনস্টাইন আবারও সঠিক।
২০২৫ সালে অতিসংবেদনশীল লেজার অ্যারে দিয়ে তৈরি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারী যন্ত্রগুলোর একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক স্থান কালের বুননে শক্তিশালী এক ঢেউ শনাক্ত করে। এই ঘটনাটির নাম দেওয়া হয় GW250114। ধারণা করা হয়, দুটি ব্ল্যাক হোলের একীভবনের ফলে এই সংকেত তৈরি হয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি বা লাইগো এবং ইতালির ভার্গো ডিটেক্টর রয়েছে। ২০১৬ সালে লাইগোর প্রথম শনাক্তকরণের তুলনায় বর্তমান যন্ত্রগুলো অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং অ্যাকুরেট। তাই GW250114 থেকে পাওয়া তথ্য আগের সব মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ঘটনার চেয়ে বেশি স্পষ্ট এবং কম নয়েজযুক্ত। এই কারণেই এই ঘটনা জেনারেল রিলেটিভিটির মতো সুপ্রতিষ্ঠিত ভৌত তত্ত্ব যাচাইয়ের জন্য এক অনন্য পরীক্ষাক্ষেত্র তৈরি করে।
গত বছর গবেষকেরা GW250114 এর তথ্য ব্যবহার করে স্টিফেন হকিংয়ের প্রস্তাবিত একটি তত্ত্ব পরীক্ষা করেন। এই তত্ত্বে বলা হয়, দুটি ব্ল্যাক হোল মিলিত হলে নতুন ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন তার মূল দুটি ব্ল্যাক হোলের মোট ইভেন্ট হরাইজনের চেয়ে ছোট হয় না। প্রায় ১০০ শতাংশ নিশ্চিততার সঙ্গে ফলাফল দেখায়, হকিং সঠিক ছিলেন।
এবার নিউ ইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিফ মিটম্যান এবং তার সহকর্মীরা আরও এক ধাপ এগিয়ে দেখেন, এই একীভবন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সঙ্গে কতটা মেলে।
আইনস্টাইনের সমীকরণ বর্ণনা করে, ভরযুক্ত যেকোনো বস্তু স্থান কালের ভেতর কীভাবে চলে। এই সমীকরণ দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমে ব্ল্যাক হোল দুটি ক্রমশ দ্রুত গতিতে একে অপরকে ঘিরে পাক খায়। তারপর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এরপর বিপুল শক্তি নির্গত করে এবং নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে কাঁপতে থাকে, ঠিক আঘাতের পর ছুটির ঘণ্টার মতো।
এই কম্পাঙ্কগুলোকে বলা হয় রিংডাউন মোড। আগের ঘটনাগুলোতে এই সংকেত এত দুর্বল ছিল যে ধরা পড়েনি। GW250114 এত জোরালো ছিল যে আইনস্টাইনের সমীকরণে পূর্বাভাস দেওয়া এই কম্পাঙ্ক সরাসরি পরীক্ষা করা যায়। মিটম্যানের দল সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে এই কম্পাঙ্কের মান অনুমান করে এবং পরিমাপ করা মানের সঙ্গে তুলনা করে। দুই ক্ষেত্রের ফল প্রায় হুবহু মিলে যায়।
মিটম্যান বলেন, ডেটা থেকে মাপা মানগুলো সংখ্যাতাত্ত্বিক আপেক্ষিকতার পূর্বাভাসের সঙ্গে অসাধারণভাবে মিলে গেছে। আইনস্টাইনের সমীকরণ সমাধান করা কঠিন। কিন্তু যখন সমাধান করি এবং ডিটেক্টরে পূর্বাভাস যাচাই করি, দুই দিকের ফল একই আসে।
যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লরা নাটাল বলেন, সারকথা হলো, আইনস্টাইন এখনো সঠিক। মহাকর্ষ নিয়ে তার যা বলা, সবকিছুই মিলছে।
তবে GW250114 যত জোরালোই হোক, এই কম্পাঙ্কগুলো এখনো এত দুর্বল যে আইনস্টাইনের পূর্বাভাসের সঙ্গে ১০ শতাংশের কম পার্থক্য পুরোপুরি বাতিল করা যায়নি। এর মূল কারণ বর্তমান ডিটেক্টরের সংবেদনশীলতার সীমা। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ডিটেক্টর এলে এই অনিশ্চয়তা কমবে। যদি কোথাও তত্ত্বের ভুল থাকে, এই পার্থক্য তখনও থেকে যাবে।
মিটম্যান বলেন, যত বেশি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করব, বা আরও জোরালো সংকেত ধরতে পারব, তত এই ত্রুটির সীমা কমবে। তা শূন্যের কাছাকাছি যেতে পারে, অথবা শূন্য থেকে দূরে থাকতে পারে। যদি দূরে থাকে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে।
———
Black Hole Spectroscopy and Tests of General Relativity with GW250114. Physical Review Letters (2026).
DOI: 10.1103/6c61-fm1n
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


