ব্যায়াম আপনার পেশিকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকেও সক্রিয় ও শক্তিশালী করে তোলে। ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে Neuron জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ট্রেডমিলে দৌড়ানোর মাধ্যমে ইঁদুরের মস্তিষ্কের ভেতরের স্নায়ু সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু নিউরন দ্রুত সক্রিয় হতে শেখে। এই ‘পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে দৌড়ানোর সহনশীলতা বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখে।
গবেষণাপত্রটির সহলেখক এবং ফিলাডেলফিয়ার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট নিকোলাস বেটলি বলেন, সহনশীলতা গড়ে ওঠার পেছনে মস্তিষ্ক সক্রিয়ভাবে কাজ করে। ইঁদুরের ক্ষেত্রে যেমন দেখা গেছে, মানুষের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই প্রক্রিয়া কাজ করে। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে কোনো শারীরিক কাজ সহজ হয়ে ওঠে। এই ক্ষমতাই সহনশীলতা। আর এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ভূমিকা আগে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি।
বেটলি বলেন, “আপনি যখন দৌড়াতে যান, আপনার ফুসফুস প্রসারিত হয়, হৃদস্পন্দন শক্তিশালী হয়, পেশি ক্ষয় হয় এবং পরে আবার গড়ে ওঠে। এসব পরিবর্তনের ফলে পরের বার দৌড়ানো সহজ লাগে। আমি ভাবিনি, এই পুরো প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক এত গভীরভাবে সমন্বয় করে।”
মস্তিষ্কের ব্যায়াম
গবেষকরা জানতে চেয়েছিলেন, মানুষ বা প্রাণী যখন নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়, তখন মস্তিষ্কের ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা মস্তিষ্কের ভেন্ট্রোমিডিয়াল হাইপোথ্যালামাস নামের একটি অংশের ওপর নজর দেন। এই অঞ্চল ক্ষুধা, শক্তির ব্যবহার এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
এরপর তারা এই অঞ্চলের ভেতরে থাকা এমন একদল নিউরনের দিকে মনোযোগ দেন, যেগুলো স্টেরয়ডোজেনিক ফ্যাক্টর ১ বা সংক্ষেপে SF1 নামের একটি প্রোটিন তৈরি করে। এই প্রোটিন বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরে SF1 তৈরির জিন মুছে ফেলা হয়েছিল, তাদের দৌড়ানোর সহনশীলতা স্পষ্টভাবে কমে গিয়েছিল।
বেটলির দল ট্রেডমিলে দৌড়ানোর সময় ইঁদুরের SF1 নিউরনের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখতে পান, ব্যায়ামের সময় এই নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। আরও মজার বিষয়, একদল SF1 নিউরন ব্যায়াম শেষ হওয়ার পর বেশি সক্রিয় হয়। কয়েকটি প্রশিক্ষণ সেশনের পর দেখা যায়, ব্যায়াম শেষে সক্রিয় হওয়া নিউরনের সংখ্যা বেড়েছে এবং তাদের সক্রিয়তার মাত্রাও আগের তুলনায় অনেক বেশি।
টানা তিন সপ্তাহ নিয়মিত অনুশীলনের পর গবেষকরা ইঁদুরের মস্তিষ্কের পাতলা অংশ বিশ্লেষণ করেন। সেখানে তারা দেখেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইঁদুরের SF1 নিউরনের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। এই নিউরনগুলো আগের তুলনায় অনেক সহজে সক্রিয় হচ্ছে। অর্থাৎ সামান্য উদ্দীপনাতেই এগুলো দ্রুত সাড়া দিচ্ছে।
একই সঙ্গে তারা লক্ষ্য করেন, বারবার ব্যায়ামের ফলে নিউরনের মধ্যে উত্তেজক সিন্যাপসের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সিন্যাপস হলো নিউরনের মধ্যকার সংযোগস্থল, যেখান দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত আদানপ্রদান হয়। উত্তেজক সিন্যাপস যত বেশি হবে, নিউরন তত দ্রুত ও শক্তিশালীভাবে সংকেত পাঠাতে পারবে। এই পরিবর্তনই সহনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় ভিত্তি তৈরি করে।
সহনশীলতার নিউরন
গবেষণার শেষ ধাপে বিজ্ঞানীরা অপ্টোজেনেটিক নামে একটি আধুনিক কৌশল ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিতে আলো ব্যবহার করে জিনগতভাবে পরিবর্তিত নিউরনকে চালু বা বন্ধ করা যায়। তারা ব্যায়ামের পর ইঁদুরের SF1 নিউরন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন।
ফলাফল ছিল স্পষ্ট। যেসব ইঁদুরের SF1 নিউরন বন্ধ রাখা হয়েছিল, তাদের দৌড়ানোর দক্ষতা সময়ের সঙ্গে বাড়েনি। তারা তুলনামূলক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, যেসব ইঁদুরের SF1 নিউরন সক্রিয় ছিল, তারা ধীরে ধীরে আরও বেশি সময় ও দূরত্ব দৌড়াতে সক্ষম হয়।
ডালাসের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ও গবেষক জেফরি জিগম্যান বলেন, ব্যায়ামের সহনশীলতায় মস্তিষ্কের এই নির্দিষ্ট নিউরনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, “এই গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, এই নিউরনগুলো সহনশীলতা তৈরিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। যত বেশি ব্যায়াম করবেন, তত বেশি উত্তেজক সিন্যাপস তৈরি হবে, আর তত বেশি সহনশীলতা বাড়বে।”
গবেষকরা আরও একটি আকর্ষণীয় পরীক্ষা চালান। তারা অপ্টোজেনেটিক পদ্ধতিতে ব্যায়ামের পর ইঁদুরের SF1 নিউরনের কার্যকলাপ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেন। এতে দেখা যায়, এই ইঁদুরগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি দূর ও দ্রুত দৌড়াতে পারে, এমনকি একই মাত্রার প্রশিক্ষণ পাওয়া অন্য ইঁদুরের তুলনায়ও তাদের পারফরম্যান্স ছিল ভালো।
বেটলি বলেন, ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখতে পারেন, মানুষের ক্ষেত্রেও এই নিউরনের কার্যকলাপ বাড়ানো সম্ভব কি না। এর মাধ্যমে অসুস্থতার পর পেশিশক্তি দ্রুত ফিরিয়ে আনা, বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশি ক্ষয় কমানো কিংবা ক্রীড়াবিদদের পারফরম্যান্স উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অপ্টোজেনেটিক পদ্ধতি এখনো পরীক্ষাগারে প্রাণীর ওপর সীমাবদ্ধ। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো বাস্তবসম্মত নয়।
বেটলি বলেন, “এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ জানুক, ব্যায়াম শুধু পেশি ভাঙা ও গড়ার বিষয় নয়। ব্যায়াম পুরো মস্তিষ্কের কাঠামো ও কার্যক্রম বদলে দেয়।”
———
Exercise-induced activation of ventromedial hypothalamic steroidogenic factor-1 neurons mediates improvements in endurance. Neuron (2026).
DOI: 10.1016/j.neuron.2025.12.033
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


