স্বাভাবিকভাবেই প্রিয়জনের মৃত্যু মানুষের জীবনে গভীর আঘাত রেখে যায়। শুরুতে তীব্র কষ্ট, শূন্যতা, কান্না আর অসহায়ত্ব কাজ করে। সময়ের সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই শোক থামে না। মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর ধরে যন্ত্রণা একই রকম তীব্র থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় Prolonged Grief Disorder (PGD) বা দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত মানসিক ব্যাধি।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে Trends in Neuroscience জার্নালে প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা জানাচ্ছে, এই সমস্যা নিছক মানসিক দুর্বলতা নয়। এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের গভীর জৈবিক পরিবর্তন। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে আনস্টেবল মানুষ শনাক্ত করতে এবং তাদেরকে দ্রুত সহায়তা দিতে সাহায্য করবে।
পরিসংখ্যান বলছে, শোকগ্রস্ত মানুষের প্রায় ৫ শতাংশ এই দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত সমস্যায় ভোগেন। ২০২২ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন প্রথমবারের মতো Prolonged Grief Disorder-কে মানসিক রোগের আনুষ্ঠানিক তালিকায় যুক্ত করে। সিদ্ধান্তটি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেকের প্রশ্ন ছিল, এতে কি স্বাভাবিক মানবিক শোককে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নতুন এই গবেষণা সেই বিতর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করল।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস-এর গবেষক রিচার্ড ব্রায়ান ও তাঁর দল শোকগ্রস্ত মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ তুলনা করেন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (PTSD), বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে।
তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু মিল থাকলেও PGD-র ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড ও মোটিভেশান সংক্রান্ত সার্কিটে পরিবর্তন অনেক বেশি স্পষ্ট। বিশেষ করে nucleus accumbens নামের একটি অংশ, যা আনন্দ ও প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে অস্বাভাবিক সক্রিয়তা দেখা যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শোকসংক্রান্ত শব্দ, ছবি বা স্মৃতির মুখোমুখি হলে এই অংশে সক্রিয়তা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যায়। এই সক্রিয়তার মাত্রা যত বেশি, মৃত প্রিয়জনের জন্য আকুলতা তত গভীর হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের মস্তিষ্ক মৃত ব্যক্তির স্মৃতি ও চিহ্নের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। বিপরীতে, PTSD বা অ্যাংজাইটি সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্ক সাধারণত এ ধরনের স্মৃতি এড়িয়ে চলার প্রবণতা তৈরি করে।
এ ছাড়া amygdala এবং right hippocampus নামের দুটি অংশে অস্বাভাবিক সক্রিয়তা ধরা পড়ে। এই অঞ্চল দুটি আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। কবরস্থান বা মৃত্যুসংক্রান্ত ছবি দেখালে এই অংশে অতিরিক্ত উত্তেজনা তৈরি হয়। অথচ শান্ত প্রকৃতি বা সুন্দর দৃশ্য দেখালে সেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় কম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এর মানে দাঁড়ায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা কমে যাওয়া।
রিচার্ড ব্রায়ানের ভাষায়, এই অবস্থায় মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম যেন মৃত প্রিয়জনের স্মৃতিতে আটকে যায়। অন্য কোনো উৎস থেকে আনন্দ বা তৃপ্তি খুঁজে পায় না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র আকুলতা ও শোক বজায় থাকে। তাঁর মতে, স্বাভাবিক শোক আর দীর্ঘস্থায়ী শোকের মূল পার্থক্য সময় ও মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতায়। দীর্ঘস্থায়ী শোকে মানুষ যেন আটকে পড়ে।
তবে গবেষকরা বলছেন, শুধু ব্রেন স্ক্যান দিয়ে এই রোগ নির্ণয় করা সহজ নয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যাথরিন শিয়ার জানান, শোকের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত জটিল ও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। একবারের স্ক্যানে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। তিনি বলেন, নতুন গবেষণায় “টু-পারসন নিউরোসায়েন্স” নামে একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, যেখানে দুইজন মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ দেখা হয়। এতে সামাজিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং সহায়তার ভূমিকা বোঝা সহজ হয়।
এই পর্যালোচনার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ণয়ে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয়জন হারানোর এক বছরের মধ্যে করা ব্রেন স্ক্যানে amygdala এবং পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ যত বেশি ছিল, পরবর্তী ছয় মাসে শোকের তীব্রতা তত বেড়েছে। এর মানে, শুরুতেই কিছু মস্তিষ্কীয় সংকেত দেখে বোঝা যেতে পারে, কে দীর্ঘস্থায়ী শোকে ভুগতে পারেন।
মেডিক্যাল কলেজ অব উইসকনসিন-এর গবেষক জোসেফ গোভিয়াস বলেন, আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব। এতে কাউন্সেলিং কিংবা বিশেষায়িত থেরাপি শুরু করা সহজ হয়।
গবেষকরা আরও জানান, এই রোগের নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া বোঝা গেলে ভুল রোগ নির্ণয় কমবে। চিকিৎসাও হবে লক্ষ্যভিত্তিক। দীর্ঘস্থায়ী শোক সাধারণত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টে ভালো সাড়া দেয় না। বরং শোক-কেন্দ্রিক সাইকোথেরাপি বেশি কার্যকর। তবে বিষণ্নতার সঙ্গে একসঙ্গে দেখা দিলে ওষুধ ও থেরাপির সমন্বয় ভালো ফল দেয়।
এই গবেষণা দেখাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী শোক একটি স্বতন্ত্র মানসিক সমস্যা। একে অবহেলা করা বা স্বাভাবিক শোক ভেবে ফেলে রাখার সুযোগ নেই। সময়মতো সঠিক সহায়তা পেলে বহু মানুষ এই গভীর মানসিক যন্ত্রণা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারে।
———
A neurobiological perspective on prolonged grief disorder. Trends in Neuroscience (2026).
DOI: 10.1016/j.tins.2026.01.001
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


