অস্ট্রেলিয়া থেকে পাওয়া প্রাচীন শিলার ক্রিস্টার বা স্ফটিক ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রাথমিক পৃথিবী হয়তো আজকের পৃথিবীর তুলনায় বিজ্ঞানীরা যতটা ভিন্ন ভাবতেন, বাস্তবে ততটা ভিন্ন ছিল না।
পৃথিবীর একেবারে প্রাচীন ইতিহাস এখনো অনেকটাই রহস্যে ঢাকা। কারণ টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত সরে যাওয়া ও পুনর্বিন্যাস বহু ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ মুছে ফেলেছে। এই সময়ের সম্পর্কে যে অল্প কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো জিরকন স্ফটিক। এই শক্ত খনিজের গঠনের মধ্যে রাসায়নিক তথ্য দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত থাকে। ২ মার্চ ২০২৬ এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাচীন পৃথিবীতে গবেষকদের ধারণার তুলনায় বেশি অক্সিজেন এবং সম্ভবত বেশি পানিও থাকতে পারে। পাশাপাশি গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর ৪.৫ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসের তুলনায় বেশ আগেই, অন্তত ৩.৩ বিলিয়ন বছর আগে থেকেই টেকটোনিক প্লেটের চলাচল শুরু হয়েছিল।
উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরসায়নবিদ জন ভ্যালি বলেন, “পৃথিবীর প্রথম এক বিলিয়ন বছরের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।”
এই প্রাচীন শিলায় প্রত্যাশার তুলনায় বেশি অক্সিজেনের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, সেই সময়ে পৃথিবীর পরিবেশ হয়তো জীবনের জন্য আগের ধারণার তুলনায় বেশি উপযোগী ছিল। আর যদি টেকটোনিক প্লেট তখনই চলাচল শুরু করে থাকে, তাহলে বোঝা যায় পৃথিবীতে তখনই এমন কিছু ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল যা আজও গ্রহটিকে গঠন করে চলেছে। এসব প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ পুনর্ব্যবহার করে, যা জীবনের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
এই গবেষণা প্রাথমিক পৃথিবী কেমন ছিল তা বোঝার দীর্ঘ প্রচেষ্টার একটি ছোট অংশ। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ভূতত্ত্ববিদ এবং গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক শেন হাউচিন বলেন, “ধরুন ১০,০০০ টুকরোর একটি ধাঁধা। আমরা হয়তো এখন মাত্র ৩ বা ৪টি টুকরো পেয়েছি।”
শিলার ভেতরের গল্প
হাউচিন এবং তাঁর সহকর্মীরা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক হিলস অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কয়েক ডজন জিরকন স্ফটিক পরীক্ষা করেন। এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শিলা খণ্ডগুলোর মধ্যে পড়ে। এর কিছু স্ফটিক হেডিয়ান যুগের, যে সময় পৃথিবী সদ্য গঠিত হয়েছিল এবং যা প্রায় চার বিলিয়ন বছর আগে শেষ হয়।
গবেষকেরা জিরকন স্ফটিক বিশ্লেষণে নানা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগোর কাছে অবস্থিত আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অ্যাডভান্সড ফোটন সোর্সে করা উন্নত এক্স রে বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণে স্ফটিকের প্রান্তের রাসায়নিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায় ইউরেনিয়াম প্রত্যাশার তুলনায় বেশি অক্সিডাইজড অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ ইউরেনিয়াম ইলেকট্রন হারিয়েছে, যা সাধারণত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ঘটে।
জিরকন স্ফটিক পৃথিবীর ভূত্বকের গলিত ম্যাগমা থেকে তৈরি হয়। তাই এই স্ফটিক ম্যাগমা কীভাবে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করেছিল তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। হাউচিন বলেন, আগ্নেয়গিরি থেকে যে গ্যাস বের হয়, তা নির্ভর করে ম্যাগমা কতটা অক্সিডাইজড তার ওপর। আর সেটিই প্রভাব ফেলে বায়ুমণ্ডলে কতটা অক্সিজেন থাকতে পারে।
গবেষণাটির পদ্ধতি নতুন ধরনের হলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন কিছু ভূরসায়নবিদ। সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইমন টার্নার এবং মেলবোর্নের মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউ ও’নিল জানান, জিরকনের প্রান্তে অক্সিডাইজড ইউরেনিয়াম থাকার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। যেমন মূল ম্যাগমার ভেতরে গ্যাস কীভাবে আচরণ করেছিল।
গভীরে অনুসন্ধান
এই জিরকন স্ফটিক ভূবিজ্ঞানের আরেকটি বিতর্কিত প্রশ্নের দিকেও ইঙ্গিত দেয়। পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেট কবে এবং কীভাবে চলাচল শুরু করেছিল?
প্রাথমিক পৃথিবীতে গলিত ম্যাগমা থেকে প্রথম কঠিন প্লেট তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে এই প্লেটগুলোর চলাচল পৃথিবীর বর্তমান গতিশীল কাঠামো তৈরি করে, যার ফলে সমুদ্রের অবস্থান বা পর্বতশ্রেণির গঠন নির্ধারিত হয়।
হাউচিনের দল জিরকন বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করেন স্ফটিকগুলো উচ্চ না নিম্ন তাপমাত্রা ও চাপের পরিবেশে তৈরি হয়েছিল। হেডিয়ান যুগের স্ফটিকগুলোতে দেখা যায় উচ্চ তাপমাত্রায় গঠনের চিহ্ন, যদিও চাপ তুলনামূলক কম ছিল। এতে বোঝা যায় তুলনামূলক কম গভীরতাতেও তখন শিলা বেশ গরম ছিল।
কিন্তু প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন বছর আগের স্ফটিকগুলো একই ধরনের তাপমাত্রায় তৈরি হলেও সেখানে চাপ বেশি ছিল। এতে ধারণা করা হয়, তখন ভূত্বকের প্লেটগুলো পৃথিবীর ভেতরের দিকে আরও গভীরে ঢুকে যাচ্ছিল, যেখানে চাপ বেশি। যদি তা সত্য হয়, তাহলে সেই সময়েই ভূত্বকের বড় বড় অংশ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাচ্ছিল।
এই ফলাফল অন্য কিছু গবেষণার সঙ্গেও মিল খুঁজে পায়। গত মাসে Nature জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় জন ভ্যালি এবং তাঁর সহকর্মীরাও জ্যাক হিলসের জিরকন বিশ্লেষণ করেন। তারা নিয়োবিয়ামসহ বিভিন্ন ট্রেস উপাদান পরীক্ষা করে আজকের মহাদেশীয় শিলার মতো রাসায়নিক চিহ্ন খুঁজে দেখেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার বিলিয়নেরও বেশি বছর আগে হেডিয়ান যুগেই ভূত্বকের অংশগুলো একে অন্যের নিচে ঢুকে যাচ্ছিল।
গবেষকেরা মনে করেন, তখন একাধিক ধরনের টেকটোনিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলতে পারে। ভূত্বকের কিছু অংশ ঠান্ডা হয়ে কম ভাসমান হওয়ায় ধীরে ধীরে গভীরে ডুবে গেছে। আবার কিছু অংশে তুলনামূলক হালকা, মহাদেশীয় ধরনের শিলা তৈরি হয়েছে, যেগুলো সংঘর্ষের কারণে নিচের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
হাউচিন ভবিষ্যতে আরও শত শত জিরকন স্ফটিক বিশ্লেষণ করতে চান। এর মাধ্যমে প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন। তাঁর কথায়, “আমাদের কাছে এখনো টুকরো টুকরো প্রমাণ আছে। আমরা সেগুলো জুড়ে পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের গল্প তৈরি করার চেষ্টা করছি।”
———
Oxidized Hadean magmas and Archean mobile-lid tectonics revealed by Jack Hills zircon. Proc. Natl. Acad. Sci. (2026).
DOI: 10.1073/pnas.2525466123
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


