২০০৮ সালে গবেষকেরা প্রথমবারের মতো একটি জীবন্ত জীবের সম্পূর্ণ কৃত্রিম জিনোম তৈরি করার ঘোষণা দেন। তাঁরা ব্যাকটেরিয়া Mycoplasma genitalium-এর প্রায় ৫৮০,০০০ নিউক্লিওটাইডের জিনোম রাসায়নিক পদ্ধতিতে তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় এই ধরনের জিনোম কোষের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে আবার “রিবুট” করা হয়। তখন বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, এটাই সিন্থেটিক জীবনের প্রথম উদাহরণ।
এবার গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স ডিজাইন করেছেন। এর মধ্যে একটি জিনোম তৈরি করা হয়েছে M. genitalium থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এই এআই মডেলটি জীবজগতের নানা প্রজাতির ট্রিলিয়ন সংখ্যক ডিএনএ অক্ষরের উপর ট্রেইন করা হয়েছে।
তবু অন্য গবেষকেরা বলছেন, এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এআই দিয়ে নতুন মাইক্রোবিয়াল জীবন তৈরির পথে এটি কেবল একটি ধাপ। ৪ মার্চ ২০২৬ Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় Evo 2 নামের ডিএনএ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করে এসব জিনোম ডিজাইনের কথা জানানো হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের Wageningen University–এর সিন্থেটিক জীববিজ্ঞানী নিকো ক্লাসেন্স বলেন, “বিষয়টি দারুণ, কিন্তু লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি।” তাঁর মতে, এআই দিয়ে তৈরি জিনোম বড় পরিসরে তৈরি ও পরীক্ষা করা একটি বড় বাধা। আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন জিনোম ডিজাইন করা, যা সবচেয়ে সরল জীবের সব মৌলিক কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম, জটিল কোষের কথা তো বাদই দিলাম।
তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে যারা শুরু থেকে জিনোম ডিজাইনের কাজ করছেন, তাঁদের মতে এই লক্ষ্য এখন আর অসম্ভব মনে হয় না। যুক্তরাজ্যের University of Manchester–এর জিনোম প্রকৌশলী প্যাট্রিক ইঝি কাই বলেন, “সিন্থেটিক জিনোমিক্সে এআই মডেলগুলো এক ধরনের ‘ChatGPT মুহূর্ত’। এখন এমন জিনিস লেখা শুরু করা যাচ্ছে, যা প্রকৃতিতে কখনও ছিল না।”
কার্যকর জিনোম তৈরি
এর আগে জিনোম লেখার প্রচেষ্টা মূলত পরিবর্তন বা সম্পাদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। প্যাট্রিক কাই বলেন, বিষয়টি অনেকটা বিদ্যমান বইয়ের একটি অধ্যায় সম্পাদনা করা বা সব কমা মুছে ফেলার মতো। তিনি বর্তমানে বেকারের ইস্ট Saccharomyces cerevisiae–এর জিনোম রিরাইটের প্রায় শেষ পর্যায়ের একটি প্রকল্পে যুক্ত আছেন।
আরেকটি গবেষণায় Escherichia coli ব্যাকটেরিয়ার জিনোমে প্রায় ২০,০০০ স্থানে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সেখানে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেওয়া ৬৪টি ‘কোডন’-এর মধ্যে ৩টি বাদ দেওয়া হয়।
Evo 2-এর মতো ডিএনএ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এমন কৃত্রিম জীব তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা বিদ্যমান জীবের তুলনায় অনেক বেশি ভিন্ন হতে পারে। ২০২৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার Arc Institute–এর কম্পিউটেশনাল জীববিজ্ঞানী ব্রায়ান হাই ও তাঁর সহকর্মীরা Evo মডেল ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ ঘটানো ভাইরাস ফেজের জিনোম লিখেছিলেন।
গবেষকেরা সেই নির্দেশনা Escherichia coli কোষে ঢুকিয়ে দেন। ২৮৫টি ডিজাইনের মধ্যে ১৬টি থেকে কার্যকর ভাইরাস তৈরি হয়, যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম।
তবে এসব ফেজ জিনোমে কয়েক হাজার ডিএনএ অক্ষর থাকে এবং খুব অল্প কিছু জিন থাকে। এটি ছোট ব্যাকটেরিয়াল জিনোমের তুলনায়ও অনেক ছোট ও কম জটিল। অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতে ভাইরাস মূলত জেনেটিক পরজীবী এবং জীবনের অনেক বৈশিষ্ট্যই তাদের নেই।
সাম্প্রতিক Evo 2 গবেষণায় ব্রায়ান হাই ও Arc Institute–এর বায়োইঞ্জিনিয়ার প্যাট্রিক হসুর নেতৃত্বে একটি দল M. genitalium–অনুপ্রাণিত জিনোম ছাড়াও মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়ার জিনোম এবং ইস্টের একটি ক্রোমোজোম ডিজাইন করেছে।
কম্পিউটার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, M. genitalium–অনুপ্রাণিত সিকোয়েন্সের প্রায় ৭০ শতাংশ জিন বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। কিন্তু একটি প্রয়োজনীয় জিনও যদি অনুপস্থিত থাকে বা ভুলভাবে মডেল করা হয়, তাহলে জিনোমটি কোষের ভেতরে কাজ করবে না বলে জানান ক্লাসেন্স। তাঁর ভাষায়, “আপনি ৭০ শতাংশ দিয়ে জীবন ডিজাইন করতে পারবেন না। কম্পিউটারে তা করা গেলেও বাস্তবে কাজ করবে না।”
আরও একটি সমস্যা হলো জিনগুলোর বিন্যাস। যুক্তরাজ্যের University of Cambridge–এর মেশিন লার্নিং বিজ্ঞানী মাচিয়েই ভিয়াত্রাক বলেন, জিনের ক্রম সঠিক না হলে পুরো নকশা ভেঙে পড়তে পারে। তিনি Bacformer নামের আরেকটি এআই টুল তৈরি করেছেন, যা ব্যাকটেরিয়াল জিনোম তৈরি করতে সক্ষম। তাঁর মতে, “একটি জিনোম দেখতে ঠিক লাগা আর সত্যিই ঠিকভাবে কাজ করা, এই দুটি একেবারে আলাদা বিষয়।”
গত সপ্তাহে bioRxiv–এ প্রকাশিত একটি প্রিপ্রিন্টে University of Texas at Austin–এর গবেষকেরা দেখিয়েছেন, Evo 2–এর তৈরি জিনোমের গঠন প্রাকৃতিক জিনোমের তুলনায় ভিন্ন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত। এর মানে এই নয় যে এআই–ডিজাইন করা জিনোম কাজ করবে না। কিন্তু জিনোমের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এগুলো হয়তো সীমিত তথ্য দেবে, যা সিন্থেটিক জিনোম গবেষণার একটি মূল উদ্দেশ্য ছিল।
চেষ্টা কি সার্থক
ভিয়াত্রাক মনে করেন, শুরু থেকে একটি মাইক্রোবিয়াল জিনোম ডিজাইন করা সময় ও অর্থের তুলনায় খুব বেশি লাভজনক নাও হতে পারে। তাঁর দল Bacformer ও Evo 2 ব্যবহার করে এমন জিনগুচ্ছ বা অপেরন ডিজাইন করতে আগ্রহী, যা একসঙ্গে কাজ করে বায়োফুয়েল তৈরির মতো ব্যবহারিক কাজ করতে পারবে।
ব্রায়ান হাই বিশ্বাস করেন, সময়ের সঙ্গে জিনোম ডিজাইনের সক্ষমতা উন্নত হবে। কিন্তু কার্যকর জিনোম খুঁজে বের করতে বিপুল সংখ্যক ডিজাইন পরীক্ষা করতে হবে। এর জন্য একটি পূর্ণ জিনোমের সমান ডিএনএ তৈরি করে সঠিক ক্রমে জোড়া লাগাতে হবে, যা বর্তমান প্রযুক্তিতে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, “এখন পরীক্ষাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠছে। এই পরিসরে ডিএনএ তৈরি ও নির্মাণের খরচ বড় বাঁধা তৈরি করছে।”
প্যাট্রিক হসু একটি সম্ভাব্য সমাধানের কথা বলেন। স্বয়ংক্রিয় ল্যাবরেটরি, যেখানে এআই ও রোবট একসঙ্গে কাজ করবে। সেখানে ছোট ছোট জিনোম অংশ বারবার ডিজাইন, পরীক্ষা ও উন্নত করা হবে, পরে সেগুলো একত্র করে সম্পূর্ণ কার্যকর জিনোম তৈরি করা যাবে।
ব্রায়ান হাইয়ের মতে, এই ধাপে ধাপে পদ্ধতি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মাইক্রোবিয়াল জিনোমের চেয়ে অনেক বড় ও জটিল জিনোমও লেখা সম্ভব হতে পারে। যেমন মানুষের বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর জিনোম।
ক্লাসেন্স মনে করেন, Evo 2–এর মতো এআই টুল সত্যিই কার্যকর কোষীয় জিনোম ডিজাইন করতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, এআইয়ের সঙ্গে মানুষের জ্ঞান ও অন্যান্য পদ্ধতির সমন্বয়ই সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়াবে।
———
Genome modelling and design across all domains of life with Evo 2. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-026-10176-5
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


