প্রায় ১১০ বছর ধরে জীববিজ্ঞানীদের কাছে একটি বিষয় রহস্যময় হয়ে ছিল। গৃহপালিত বিড়ালের কিডনিতে কেন এত বিপুল সংখ্যক লিপিড ড্রপলেট বা চর্বি সঞ্চয়কারী ক্ষুদ্র কাঠামো থাকে? জাপানের ইওয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসাও মিয়াজাকি ও তাঁর সহকর্মীদের নতুন গবেষণা এই রহস্যের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাঁদের মতে, কিডনির এসব লিপিড ড্রপলেট রাসায়নিক ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে এবং সময়ের সঙ্গে প্রস্রাবের গন্ধ বদলে গেলেও বিড়ালের নিজস্ব রাসায়নিক ‘গন্ধের স্বাক্ষর’ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
অনেক প্রাণী নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করতে সেন্ট ব্যবহার করে। এ ধরনের সেন্টের মাধ্যমে অন্য প্রাণীরা জানতে পারে, কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী সেখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু এখানে একটি সমস্যা রয়েছে। গন্ধ তৈরির অণুগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার পর ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত ও রাসায়নিকভাবে ভেঙে যায়। ফলে প্রাণীটি সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর সময়ের সঙ্গে সেই গন্ধের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও বদলে যেতে পারে।
নতুন গবেষণাটি গত ১৯ আগস্ট, ২০২৬ Current Biology জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, বিড়াল এই সমস্যার মোকাবিলায় ১৩ ধরনের ব্রাঞ্চড চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড বা শাখাযুক্ত শৃঙ্খলের ফ্যাটি অ্যাসিড, সংক্ষেপে BFA, ব্যবহার করে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রস্রাব বা অন্য কোনো নিঃসরণে এই শ্রেণির যৌগ আগে শনাক্ত করা হয়নি।
গবেষকদের মতে, প্রতিটি বিড়ালের প্রস্রাবে এই ফ্যাটি অ্যাসিডগুলোর একটি নির্দিষ্ট অনুপাত রয়েছে। প্রস্রাবের অন্য অনেক বেশি উদ্বায়ী রাসায়নিক উপাদানের তুলনায় এই রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সঙ্গে অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকে। একই সঙ্গে এগুলো খুবই ধীরে বাষ্পীভূত হয়। ফলে কোনো বিড়াল প্রস্রাব করার পর অন্তত এক দিন পর্যন্ত তার স্বতন্ত্র রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব থাকে।
অধ্যাপক মিয়াজাকি বলেন, বিড়ালের কিডনিতে থাকা লিপিড ড্রপলেটের কথা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জানা গেলেও, কেন বিড়ালের কিডনিতে এত বেশি পরিমাণে এসব কাঠামো রয়েছে, তা এতদিন রহস্যই ছিল। নতুন গবেষণার ফলাফল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রস্রাবে স্থিতিশীল রাসায়নিক সিগনেচার বজায় রাখা এসব লিপিড ড্রপলেটের একটি কাজ হতে পারে।
তবে কিডনির লিপিডে জমা থাকা BFA কীভাবে শেষ পর্যন্ত প্রস্রাবে পৌঁছায়, সেটি এখনও অজানা। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ গবেষণায় এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
গবেষণায় এই যৌগগুলো শনাক্ত করার জন্য গবেষকেরা বিড়ালের একটি বিশেষ আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন, যাকে ফ্লেমেন প্রতিক্রিয়া (Flehmen response) বলা হয়। এ সময় বিড়াল মুখ কিছুটা হাঁ করে এবং গন্ধকে মুখের ওপরের অংশে থাকা বিশেষ একটি অঙ্গে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এই আচরণটি অপরিচিত বিড়ালের প্রস্রাবের ক্ষেত্রে নিজের প্রস্রাবের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
একই প্রস্রাবের নমুনা বারবার দেওয়া হলে বিড়ালের ফ্লেমেন প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে কমে যায়। কিন্তু নতুন কোনো বিড়ালের প্রস্রাবের নমুনা দেওয়ার পর আবার সেই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এর মাধ্যমে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, বিড়াল বিভিন্ন ব্যক্তির প্রস্রাবের রাসায়নিক পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তী পরীক্ষায় গবেষকেরা প্রস্রাবের অন্যান্য উপাদান একই রেখে শুধু ফ্যাটি অ্যাসিডের মিশ্রণ পরিবর্তন করেন। বিড়াল তখনও বিভিন্ন নমুনার মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এর অর্থ, প্রাণীগুলো প্রস্রাবে থাকা এই ফ্যাটি অ্যাসিডের তথ্য সরাসরি শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখতে পান, এই ফ্যাটি অ্যাসিডগুলো প্রায় সম্পূর্ণভাবে কিডনিতেই উপস্থিত থাকে। সেখানে এগুলো কিডনির কর্টেক্স বা বাইরের স্তরে থাকা দীর্ঘদিনের রহস্যময় লিপিড ড্রপলেটের ভেতরে জমা থাকে।
শুধু গৃহপালিত বিড়ালের মধ্যেই এমন ব্যবস্থা দেখা যায়নি। সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, জাগুয়ার ও লিংক্সসহ আরও কয়েকটি বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণীর মধ্যেও একই ধরনের যৌগ এবং কিডনির লিপিড ড্রপলেট পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এসব ফ্যাটি অ্যাসিডের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আলাদা ছিল।
এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে বিড়ালের প্রস্রাবের গন্ধ নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। পাশাপাশি, যেহেতু ফ্যাটি অ্যাসিডের এই রাসায়নিক বিন্যাস কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীকে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তাই ভবিষ্যতে সংরক্ষণবিদেরা বিরল ও সহজে দেখা না পাওয়া বন্য বিড়াল শনাক্ত করতেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। এর জন্য প্রাণীটিকে সরাসরি দেখতে হবে না। তার রেখে যাওয়া গন্ধ বিশ্লেষণ করেই পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই গবেষণা বিড়ালের শরীরের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ কীভাবে ছোট অণুর মাধ্যমে প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব রাসায়নিক পরিচয় স্থিতিশীল রাখে, তার একটি নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিড়ালজাতীয় বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে কিডনিতে থাকা এই রাসায়নিক ভাণ্ডারের বৈচিত্র্যেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
———
Signatures of branched-chain fatty acids derived from a kidney reservoir confer stable chemical individuality on domestic cats. Current Biology (2026).
DOI: 10.1016/j.cub.2026.07.045
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


