OpenAI দাবি করেছে, তাদের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল গণিতের অন্যতম কঠিন ও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা, নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছে। সমস্যাটি বিখ্যাত মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমগুলোর তালিকায় রয়েছে। এই তালিকার কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান প্রমাণ করতে পারলে পুরস্কার হিসেবে ১০ লাখ মার্কিন ডলার পাওয়া যায়। নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় গবেষণা তৎপরতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে, OpenAI কীভাবে এই ফলাফলে পৌঁছেছে, তা নিয়ে একটি বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ তরল ও গ্যাসের মতো পদার্থ কীভাবে স্থান বা পরিবেশের মধ্যে প্রবাহিত হয়, তা বর্ণনা করে। যেমন, একটি বিমানের ডানার ওপর দিয়ে বাতাস কীভাবে প্রবাহিত হয় কিংবা টিউবওয়েল থেকে বের হওয়া পানি কীভাবে প্রবাহিত হয়, এসব ঘটনা বোঝাতে এই সমীকরণ ব্যবহৃত হয়। প্রায় ২০০ বছর আগে এই সমীকরণ প্রথম লেখা হলেও এগুলো সম্পর্কে গণিতবিদদের বোঝাপড়া এখনও অসম্পূর্ণ।
মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার অংশ হিসেবে ক্লে ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউট যে প্রশ্নটি সামনে রেখেছে, সেটি হলো, নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ সব পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে কাজ করে কি না। নাকি এমন কোনো পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে সমীকরণগুলো আর অর্থপূর্ণ ফল দেয় না এবং গণনার মান অসীমের দিকে চলে যায়। গণিতবিদেরা এই ধরনের পরিস্থিতিকে “ব্লো-আপ (blow-up)” বলে থাকেন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে OpenAI প্রথমে ১,০০০টি AI এজেন্টকে ইউলার সমস্যার ওপর কাজ করতে দেয়। ইউলার সমস্যা নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত একটি সমস্যা এবং পূর্ণ সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ক্ষেত্রে ব্লো-আপ খুঁজে পেতে AI এজেন্টগুলোর প্রায় ৫০ ঘণ্টা সময় লাগে।
এরপর OpenAI ১০,০০০টি AI এজেন্টকে কাজে লাগিয়ে ইউলার সমীকরণে পাওয়া ব্লো-আপের ধারণাটি পূর্ণ ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমস্যায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। OpenAI-এর দাবি অনুযায়ী, এই কাজ শেষ করতে মাত্র ১১ ঘণ্টা সময় লাগে।
এক সংবাদ সম্মেলনে OpenAI জানায়, কোনো গ্রাহক একই ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইলে তার খরচ প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার হতে পারে। OpenAI ব্যবহৃত AI মডেলটির নাম প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি শুধু জানিয়েছে, মডেলটি তাদের সর্বশেষ GPT-6 Astra মডেলের তুলনায়ও “উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সক্ষম”।
OpenAI-এর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে থাকা গণিতবিদ ভেঙ্কট চন্দ্রশেখরন বলেন, “এই সমস্যাটি ২০০ বছর ধরে অমীমাংসিত রয়েছে, কারণ নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণগুলো অত্যন্ত জটিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কাগজে-কলমে যে হিসাব করতে হয়, সেগুলোও অবিশ্বাস্য রকমের জটিল।”
OpenAI-এর সেবাস্তিয়ান বুবেক বলেন, এই খবরটি গত ১২ মাসে AI-এর সক্ষমতার যে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখা গেছে, তার একটি “অসাধারণ সমন্বয়”।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে AI-এর মাধ্যমে গণিতে নতুন আবিষ্কারের ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ঘটনা হলো OpenAI-এর এই দাবি। মে মাসে OpenAI-এর একটি মডেল গণিতবিদ পল এরদশের কয়েক দশক পুরোনো একটি অনুমান বা conjecture-এর সমাধান করে। ঘটনাটি গণিতের গবেষক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে Claude Fable 5 নামের একটি AI প্রায় এক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা জ্যাকোবিয়ান কনজেকচারের একটি counterexample খুঁজে পায়। গত সপ্তাহে আরেকটি AI মডেল মাত্র ১১ দিনে ফার্মার শেষ উপপাদ্যকে formalise করে।
OpenAI-এর সর্বশেষ বড় গাণিতিক আবিষ্কারের দাবি আসে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ট্রিস্টান বাকমাস্টার এবং AI প্রতিষ্ঠান Anthropic-এর লেভেন্ট আলপোগে নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার দিকে যাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ “stepping stone” হিসেবে বিবেচিত তিনটি সমস্যার সমাধান করার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর।
ক্রেডিট: OpenAI
বাকমাস্টার ও আলপোগে দেখিয়েছিলেন, ইউলার সমীকরণেও ব্লো-আপ দেখা দিতে পারে। এখন OpenAI দাবি করছে, একই ধরনের ঘটনা নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের ক্ষেত্রেও সত্য।
বাকমাস্টার ও আলপোগে জানান, তাদের কাজে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা LLM-এর কাছ থেকে “অনেক সাহায্য” পাওয়া গেছে। এর মধ্যে Anthropic ও OpenAI-এর তৈরি LLM-ও ছিল। কিন্তু OpenAI নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার আরও বিস্তৃত সমাধানে পৌঁছে গেছে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়। কয়েক ঘণ্টা পর OpenAI আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়।
এরপর বাকমাস্টার একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ না তুলেও OpenAI কীভাবে বিষয়টি সামলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, OpenAI তার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক এবং স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এমন আচরণ করেছে।
নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নথিতে বাকমাস্টার লেখেন, গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য তিনি OpenAI-এর একজন বিশিষ্ট গণিতবিদকে ইমেইল করেন। এরপর OpenAI-এর কর্মীদের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়। বাকমাস্টারের দাবি, সেই বৈঠকে OpenAI কীভাবে ফলাফলটি অর্জন করেছে, সে সম্পর্কে তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
তবে তিনি যতটুকু তথ্য পেয়েছিলেন, সেটিকে একটি “red flag” বা সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল, OpenAI যে কৌশল ও পথের কথা বর্ণনা করেছিল, সেটি তার এবং লেভেন্টের মধ্যবর্তী ফলাফল অর্জনের জন্য অনুসরণ করা কৌশলের সঙ্গে একই রকম।
বাকমাস্টারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরে OpenAI স্বীকার করে যে তার নিজস্ব AI অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল বাকমাস্টার ও আলপোগের কাজ সম্পর্কে জানার পর। OpenAI-এর AI মডেলটি আগে প্রকাশিত সেই কাজের ওপর প্রশিক্ষিত বা fine-tuned হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বাকমাস্টার প্রশ্ন করেন। তার দাবি, OpenAI এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
বাকমাস্টার ও আলপোগে তাদের কাজ OpenAI-এর Codex মডেলে সংরক্ষণ করছিলেন। ফলে তাত্ত্বিকভাবে OpenAI-এর সেই কাজের কাছে প্রবেশাধিকার থাকার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে তারা Codex ব্যবহার করেছিলেন একজন সাধারণ গ্রাহক হিসেবে, গবেষণা অংশীদার হিসেবে নয়। তাই তাদের প্রত্যাশা ছিল, তাদের কাজ নিরাপদ এবং গোপন থাকবে।
নিজের বক্তব্যে বাকমাস্টার স্পষ্ট করে দেন, OpenAI কীভাবে তাদের ফলাফলে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো দাবি বা অভিযোগ করছেন না। তিনি বলেন, তিনি চান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কেলেঙ্কারি বা রহস্যের বদলে গণিত নিয়ে থাকুক।
বাকমাস্টার তার প্রকাশিত নথিতে লেখেন, “আমি OpenAI-এর প্রমাণ দেখিনি। তাদের মডেল কী করেছে বা কীভাবে করেছে, আমি জানি না। আমাদের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও আমি জানি না। আমি কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করছি না।”
নিজেদের আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়ার সংবাদ সম্মেলনে OpenAI বাকমাস্টার ও আলপোগের প্রমাণ বা তাদের ব্যবহৃত prompts নিজেদের কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে। OpenAI আরও জানায়, ইউলার সমস্যার ক্ষেত্রে তাদের মডেল যে প্রমাণ তৈরি করেছে, সেটিও বাকমাস্টার ও আলপোগের প্রস্তাব করা প্রমাণের থেকে আলাদা।
OpenAI আরও জানায়, Codex-এর মধ্যে থাকা চলমান কাজ দেখতে কোনো মানুষ প্রবেশ করেনি। OpenAI-এর মার্ক চেনকে যখন প্রশ্ন করা হয়, একই কথা কি সমস্যাটিতে কাজ করা হাজার হাজার AI এজেন্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তখন তিনি বলেন, “এটিও আমাদের বোঝাপড়া।”
নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার সমাধানের দাবি সামনে আসতে দীর্ঘ সময় লাগলেও AI তৈরি গাণিতিক প্রমাণ নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। AI-এর তৈরি প্রমাণ অনেক সময় মানুষের জন্য বোঝা কঠিন হয়। একই সঙ্গে, মানুষের তৈরি প্রমাণের মতো নতুন অন্তর্দৃষ্টি বা গভীর গাণিতিক বোঝাপড়া এগুলো থেকে সব সময় পাওয়া যায় না।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের গণিতবিদ টেরেন্স তাও বলেন, “শুধু উত্তর পাওয়া এবং সেই উত্তর সম্পর্কে বোঝাপড়া অর্জনের মধ্যে এ বছর একটি অদ্ভুত ও নজিরবিহীন বিচ্ছিন্নতা দেখা গেছে।”
তার মতে, AI এত দ্রুত নতুন গাণিতিক ফলাফল তৈরি করছে যে সেগুলো বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় “ধীর, পরিকল্পিত আলোচনা” করার মতো পর্যাপ্ত সময় গবেষকদের হাতে থাকছে না।
আরেকটি বিষয়ের নিষ্পত্তি অবশ্য ধীরে ধীরে হবে। সেটি হলো ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মিলেনিয়াম প্রাইজ কীভাবে দেওয়া হবে।
ক্লে ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মার্টিন ব্রিডসন জানান, “মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতির রাখা হয়েছে এবং আমরা নিশ্চিত করব যে এটি সম্পূর্ণ কঠোরতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।”
অর্থাৎ, OpenAI-এর দাবি সত্যিই নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যার পূর্ণ সমাধান কি না, সেটি এখনই নিশ্চিত নয়। AI মডেলটি একটি প্রমাণ তৈরি করেছে বলে দাবি করলেই মিলেনিয়াম প্রাইজ পাওয়া যাবে না। স্বাধীন গণিতবিদদের কঠোর পর্যালোচনার পরই নির্ধারিত হবে প্রমাণটি গাণিতিকভাবে সঠিক কি না এবং ১০ লাখ ডলারের পুরস্কারের শর্ত পূরণ করে কি না।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



