বিজ্ঞানীরা নতুন একটি বিড়াল প্রজাতির আনুষ্ঠানিক বর্ণনা দিয়েছেন। ছোট আকারের, গায়ে ছোপ ছোপ দাগ থাকা এই বিড়ালের নাম দেওয়া হয়েছে টিলকায়ো বা Leopardus tilcayo। প্রাণীটির সন্ধান মিলেছে দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ার ইয়ুংগাস বনাঞ্চলে।
দক্ষিণ আমেরিকায় Leopardus গণের বেশ কয়েকটি ছোট আকারের বন্য বিড়াল রয়েছে। এর মধ্যে আছে ওসেলট, মারগে, কোডকোড, জিওফ্রয়ের বিড়াল এবং টাইগার ক্যাট বা অনসিলা। এসব বিড়াল সাধারণত নিশাচর এবং সহজে চোখে পড়ে না। একই সঙ্গে দেখতে অনেকটা একই রকম হওয়ায় কোনগুলো আলাদা প্রজাতি, আর কোনগুলো একই প্রজাতির অংশ, তা নির্ধারণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কঠিন ছিল।
বিশেষ করে টাইগার ক্যাটদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা গেছে। আকারে তারা অনেকটা গৃহপালিত বিড়ালের মতো। মধ্য আমেরিকার কোস্টারিকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের দেখা যায়। বলিভিয়া, ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তাদের বিস্তৃতি রয়েছে।
ইতিহাসে টাইগার ক্যাটদের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলভেদে অনেক স্থানীয় ও বৈজ্ঞানিক নাম ব্যবহার করা হয়েছে। পরে এসব নামকে একত্র করে সবগুলোকে একটি প্রজাতি হিসেবে Leopardus tigrinus নামের অধীনে রাখা হয়।
পরবর্তী সময়ে জেনেটিক গবেষণায় দেখা যায়, এই বিড়ালগুলো আসলে একক প্রজাতি নয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জিনগত পার্থক্য রয়েছে। গবেষণার ফলের ভিত্তিতে টাইগার ক্যাটদের চারটি পৃথক প্রজাতিতে ভাগ করা হয়। এর মাধ্যমে আগে ব্যবহৃত তিনটি বৈজ্ঞানিক নামও আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
২০১৩ সালে দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট বা Leopardus guttulus আলাদা প্রজাতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। ২০১৭ সালে স্বীকৃতি পায় Leopardus emiliae। এরপর ২০২৪ সালে স্বীকৃতি পায় ক্লাউডেড টাইগার ক্যাট বা Leopardus pardinoides।
এবার নতুন গবেষণায় টাইগার ক্যাটদের তালিকায় আরও একটি প্রজাতি যুক্ত হয়েছে।
ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রিতে অবস্থিত পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্ডে দো সুলের গবেষক এদুয়ার্দো আইজিরিক এবং তার সহকর্মীরা Leopardus গণের ৩৮টি বিড়ালের সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করেন। এসব নমুনার মধ্যে ২৬টি ছিল টাইগার ক্যাট। প্রাণীগুলো তাদের পরিচিত বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
জিনোম বিশ্লেষণে গবেষকরা বলিভিয়ার ইয়ুংগাস বনাঞ্চলে একটি আলাদা বংশগত গোষ্ঠীর সন্ধান পান। এই বনাঞ্চল আন্দিজ পর্বতমালার পূর্ব ঢালে অবস্থিত। বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, এই বিড়ালগুলো টাইগার ক্যাটদের পরিচিত প্রজাতিগুলোর থেকে যথেষ্ট আলাদা। তাই গবেষকরা এগুলোকে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নতুন প্রজাতিটির নাম রাখা হয়েছে Leopardus tilcayo। স্থানীয়ভাবে এই বিড়ালকে যে নামে ডাকা হয়, সেই নাম থেকেই বৈজ্ঞানিক নামটি নেওয়া হয়েছে।
আইজিরিক বলেন, বিজ্ঞানীরা এমন একটি নতুন বিড়াল প্রজাতি শনাক্ত করেছেন, যেটির আগে কোনো বৈজ্ঞানিক নাম ছিল না। তার মতে, গত প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো নতুন একটি বিড়াল প্রজাতি বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করার ঘটনা ঘটল।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের গবেষক লেসলি লায়ন্স বলেন, বিড়ালের নতুন প্রজাতি যুক্ত হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয়। তার মতে, এসব বিড়াল খুঁজে পাওয়া ও পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। ফলে আগে করা শ্রেণিবিন্যাসে এখন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে পরিবর্তন আসা অস্বাভাবিক নয়।
Leopardus tilcayo আকারে ছোট একটি বন্য বিড়াল। মাথা ও শরীর মিলিয়ে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। ওজন সাধারণত ১.৫ থেকে ২ কেজির মধ্যে। জিনোম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রজাতির বংশধারা সেই গোষ্ঠী থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে যায়, যে গোষ্ঠীর মধ্যে Leopardus tigrinus এবং Leopardus pardinoides রয়েছে।
চেহারা দেখে L. tilcayo কে অন্যান্য টাইগার ক্যাট থেকে আলাদা করা সহজ নয়। গবেষক দলের সদস্য এবং বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টওয়ার্পের গবেষক জোনাস লেস্ক্রোয়ার্ট বলেন, পাঁচটি টাইগার ক্যাট প্রজাতিই ক্রিপটিক প্রজাতি। অর্থাৎ তাদের চেহারাগত বৈশিষ্ট্য একে অপরের এত কাছাকাছি যে শুধু বাহ্যিক গঠন দেখে প্রজাতি আলাদা করা কঠিন।
তাই নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে জিনোম বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি প্রাণীগুলোর জিনগত সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেই গবেষকরা আলাদা বংশধারাটি শনাক্ত করতে পেরেছেন।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। আন্দিজ পর্বতমালার পশ্চিম পাশে অবস্থিত পেরুর ইয়ুংগাস বনাঞ্চলে L. tigrinus বংশধারার একটি আলাদা গোষ্ঠী রয়েছে। গবেষকরা এই গোষ্ঠীকে নতুন একটি উপপ্রজাতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে Leopardus tigrinus antisuyo।
দক্ষিণ আমেরিকার ভূপ্রকৃতি প্রাণীদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশাল পর্বতমালা, নদী এবং অন্যান্য ভৌগোলিক বাধা একই প্রাণীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা রাখে। দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে তাদের মধ্যে জিনগত পার্থক্য তৈরি হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত নতুন প্রজাতির উদ্ভব হতে পারে।
লেসলি লায়ন্সের মতে, দক্ষিণ আমেরিকায় এমন আরও অনেক ভৌগোলিক বাধা রয়েছে। ফলে এখনো অজানা আরও বিড়াল প্রজাতি সেখানে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা চালালে নতুন কোনো প্রজাতির সন্ধান পাওয়াও সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
নতুন প্রজাতি ও উপপ্রজাতি শনাক্ত হওয়ার ফলে সংরক্ষণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে Leopardus tigrinus প্রজাতিকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের বা IUCN-এর রেড লিস্টে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
তবে নতুন শনাক্ত হওয়া Leopardus tilcayo এবং Leopardus tigrinus antisuyo কে আলাদা সংরক্ষণ ইউনিট হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে বলে মনে করেন আইজিরিক। কারণ নতুন প্রজাতি ও উপপ্রজাতির নিজস্ব ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং পরিবেশগত চাহিদা রয়েছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব বিড়ালের আবাসস্থল ইয়ুংগাস বনাঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। কৃষিকাজের বিস্তার ও বনভূমি পরিবর্তনের কারণে তাদের বাসস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে নতুন প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি Leopardus tilcayo এবং নতুন উপপ্রজাতিটির সংরক্ষণ পরিস্থিতিও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
———
Phylogenomics and museomics reveal five distinct species of tiger cats in South America. Current Biology (2026)
DOI: 10.1016/j.cub.2026.08.059
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


