২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ (Karl Deisseroth), পিটার হেগেম্যান (Peter Hegemann) ও গেয়র্গ নাগেল (Georg Nagel)। স্নায়ুকোষকে আলো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য তাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পদ্ধতিটি অপটোজেনেটিকস (Optogenetics) নামে পরিচিত। এই পদ্ধতির মাধ্যমে জীবিত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ গড়ে তোলে, তা সরাসরি বোঝা সম্ভব হয়েছে। পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেল এককোষী এক ধরনের শৈবালে চ্যানেলরোডপসিন (channelrhodopsin) নামের অসাধারণ একটি প্রোটিন আবিষ্কার করেন। পরে কার্ল ডেইসেরথ এই প্রোটিনকে স্নায়ুকোষের জন্য আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন একটি সুইচে পরিণত করেন। তাদের কাজ স্নায়ুবিজ্ঞানের একটি নতুন যুগের ভিত্তি তৈরি করেছে।
এইযে এই কঠিন-কঠিন বাক্যগুলোর অর্থ আসলে কী? চলুন একটু ভিতরে ঢোকা যাক।
ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী ব্রিটিশ লেখক ভার্জিনিয়া উলফ (Virginia Woolf) লিখেছিলেন, “My own brain is to me the most unaccountable of machinery – always buzzing, humming, soaring, roaring, diving, and then buried in mud. And why? What’s this passion for?”
শুধু তিনি একা নন, ইতিহাস জুড়ে অনেক মানুষই মস্তিষ্ক নিয়ে এমন কৌতূহল প্রকাশ করেছেন। মাত্র ১.৩ কেজি ওজনের এই অঙ্গের মধ্যে কীভাবে শৈশবের স্মৃতি, দিবাস্বপ্ন আর অদ্ভুত সব সৃজনশীলতা জমা থাকে? কীভাবে এই অঙ্গই আনন্দ, ভালোবাসা, হিংসা, রাগ ও ক্ষোভের মতো অনুভূতির জন্ম দেয়? আর কীভাবেই এটি হৃদস্পন্দনের গতি, শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ এবং ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে?
প্রাচীনকাল থেকেই গবেষকেরা মস্তিষ্কের এই জৈবিক রহস্য বোঝার চেষ্টা করে আসছেন। বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা সফলভাবে শনাক্ত করতে শুরু করেন, মস্তিষ্কের কোন কোন অঞ্চল শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে মস্তিষ্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেলেও তখনকার গবেষণাপদ্ধতিগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে ধোঁয়াশাপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষ সরাসরি কোনো বিশেষ অনুভূতি বা আচরণের কারণ, এমনটা প্রমাণ করার মতো সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ সেই পদ্ধতিগুলোতে ছিল না। ফলে মস্তিষ্ক সম্পর্কে যে ধারণাটি তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটা ঝাপসা ছবির মতো। মূল কাঠামো দেখা গেলেও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি তথ্য ছিল অদৃশ্য।
মস্তিষ্কের অত্যন্ত জটিল স্নায়ুকোষের নেটওয়ার্ক অনুসন্ধানের জন্য আরও নিখুঁত পদ্ধতি আর যন্ত্রপাতি তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন বিজ্ঞানীদের একজন ছিলেন ফ্রান্সিস ক্রিক (১৯৬২ সালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন)। ১৯৫৩ সালে ডিএনএর দ্বি-সর্পিল (double helix) কাঠামো আবিষ্কারের যুগান্তকারী কাজের কয়েক দশক পর তিনি মানুষের চেতনার পেছনে থাকা প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
ক্রিক জীবিত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট একটি করে স্নায়ুকোষ সক্রিয় করার উপায় নিয়ে ভাবছিলেন। স্নায়ুকোষের সংকেত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে আলো ব্যবহার করাই সম্ভবত সবচেয়ে ভালো উপায় হবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা যদি কোনোভাবে স্নায়ুকোষকে পরিবর্তন করে এমনভাবে তৈরি করতে পারেন, যাতে সেগুলো আলোতে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে হয়তো আলো ব্যবহার করে স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ক্রিক তখন বলেছিলেন যে, ধারণাটি শুনতে বেশ অবাস্তব মনে হতে পারে, তবে পুরোপুরি অসম্ভবও নয়।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ক্রিকের সেই কল্পনা এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। স্নায়ুকোষের জন্য একটি আণবিক সুইচ আবিষ্কারের বড় ভূমিকা পালন করেছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেল। আলো ব্যবহার করে গবেষকেরা এখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ু সার্কিট চালু বা বন্ধ করতে পারেন। এর মাধ্যমে তারা স্মৃতিকে সক্রিয় করে তুলতে, অনুভূতি তৈরি করতে, আচরণ পরিচালনা করতে এবং বিভিন্ন মানসিক ও স্নায়বিক রোগের সঙ্গে জড়িত নিউরনের ধরনগুলো নিয়ে গবেষণা করতে পারছেন।
অপটোজেনেটিকস মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তি স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে শরীরের অন্যান্য অংশের বিভিন্ন কোষের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছে। এর মধ্যে হৃদপিণ্ড ও অন্ত্রের কোষও রয়েছে।
পুরো বিষয়টির শুরু হয়েছিল একজন গবেষকের কৌতূহল থেকে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে জার্মানির মার্টিন্সরিডে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োকেমিস্ট্রিতে কাজ করার সময় পিটার হেগেম্যান একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন। এককোষী শৈবাল Chlamydomonas কীভাবে এত দ্রুত আলোর প্রতি প্রতিক্রিয়া জানায়?
Chlamydomonas আলো লক্ষ্য করে সাঁতার কাটার ক্ষমতার জন্য পরিচিত। গবেষকেরা যখন এই সবুজ শৈবালকে একটি পেট্রি ডিশে থাকা তরলে মিশিয়ে দেন, তখন তরলটি হালকা সবুজ রঙ ধারণ করে। এরপর যদি পেট্রি ডিশের এক পাশে আলো ফেলা হয়, তাহলে সবুজ রঙের অংশ ধীরে ধীরে আলোর উৎসের দিকে সরে যায়। কারণ অতি ক্ষুদ্র শৈবালগুলো সেদিকে সাঁতার কাটতে থাকে।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
শৈবালগুলো একটি চোখের মতো ক্ষুদ্র অঙ্গের মাধ্যমে আলো অনুভব করে। কোষের পৃষ্ঠে এই অঙ্গকে আইস্পট বলা হয়। এতে রেটিনাল নামের আলো গ্রহণকারী একটি অণু থাকে।
হেগেম্যান এই শৈবালের আইস্পট নিয়ে গবেষণা করেন। অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড ব্যবহার করে তিনি মাপেন, আইস্পটে আলো পড়লে Chlamydomonas-এর মধ্যে কী ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। শৈবালটির প্রতিক্রিয়ার গতি ছিল অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত। আইস্পটে আলো পৌঁছানোর মাত্র আধা মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই সেখানে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হতো।
তখন গবেষকদের পরিচিত অন্যান্য জৈবিক ব্যবস্থার তুলনায় এই প্রতিক্রিয়ার গতি ছিল অত্যাধিক দ্রুত। উদাহরণ হিসেবে মানুষের চোখের কথা বলা যায়। মানুষের চোখে আলো পৌঁছালে একটি জটিল রাসায়নিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে অনেকগুলো ধাপ জড়িত। এই শৃঙ্খলের শেষ পর্যায়ে থাকা একটি প্রোটিন (যাকে আয়ন চ্যানেল বলা হয়) কোষের পৃষ্ঠে একটি পথ খুলে দেয়। সেই পথ দিয়ে চার্জযুক্ত আয়ন প্রবাহিত হয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে অন্তত ১০ মিলিসেকেন্ড সময় লাগে। তাহলে Chlamydomonas-এর আলোর প্রতিক্রিয়া আমাদের চোখের তুলনায় ২০ গুণেরও বেশি দ্রুত কীভাবে সম্ভব? শৈবালের এই দ্রুত আলোক প্রতিক্রিয়া হেগেম্যানের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়।
এত দ্রুত প্রতিক্রিয়ার একটিই ব্যাখ্যা হেগেম্যানের মাথায় আসছিল। মানুষের চোখের তুলনায় Chlamydomonas-এর এই প্রক্রিয়াটি নিশ্চয়ই অনেক বেশি সরল। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে তিনি একটি হাইপোথিসিস দেন। তার হাইপোথিসিস বলে, একটি মাত্র প্রোটিন কমপ্লেক্স একই সঙ্গে আলো গ্রহণ করবে এবং আয়ন চ্যানেল হিসেবে কাজ করবে। তবে তার এই ধারণা নিয়ে তখন যথেষ্ট সংশয় ছিল। সে সময় গবেষকেরা বিভিন্ন ধরনের আয়ন চ্যানেলের কথা জানতেন। কিন্তু এমন কোনো আয়ন চ্যানেল সম্পর্কে জানা ছিল না, যা নিজে থেকেই আলোর প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
নিজের ধারণা যাচাই করতে হেগেম্যান Chlamydomonas-এর আলো সংবেদনশীল প্রোটিনটি আলাদা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজটি যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটা সহজ ছিল না। শৈবালের আইস্পট থেকে প্রোটিনগুলো তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে আলাদা করে ফেললে সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত এবং সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ফলে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করা কঠিন হয়ে উঠেছিল।
তবে সহস্রাব্দের পালাবদলের সময়, বছরের পর বছর ব্যর্থতার পর গবেষক দলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পায়। জাপানি গবেষকেরা এরই মধ্যে Chlamydomonas-এর ডিএনএর ম্যাপ তৈরি করেছিলেন এবং হাজার হাজার জিনের জেনেটিক কোড গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। সেসব জিনের মধ্যে হেগেম্যানের দল এমন দুটি জিন খুঁজে পায়, যাদের সঙ্গে আলো গ্রহণকারী প্রোটিনের জন্য পরিচিত জিনের উল্লেখযোগ্য মিল ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে এই দুটি জিনের কোনো একটির মধ্যেই কি কাঙ্ক্ষিত প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা লুকিয়ে ছিলো?
উত্তর খুঁজতে হেগেম্যান তার এক সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্টের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োফিজিক্সের গেয়র্গ নাগেল। এই কাজের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা নাগেলের ছিল। আর সেই ধাপই শেষ পর্যন্ত স্নায়ুবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটানোর পথ তৈরি করে।
নাগেল ব্যাঙের ডিম্বাণু ব্যবহার করে প্রোটিন নিয়ে গবেষণা করতেন। তিনি যখন Chlamydomonas-এর ওই দুটি জিন পান, তখন প্রতিটি জিনের আলাদা-আলাদা কপি ব্যাঙের ডিম্বাণুর পৃথক কয়েকটি দলে প্রবেশ করান। এরপর ডিম্বাণুগুলো অজানা দুটি প্রোটিন বিপুল পরিমাণে তৈরি করতে শুরু করে।
প্রোটিনগুলো শেষ পর্যন্ত ডিম্বাণুর পৃষ্ঠে, অর্থাৎ কোষের চারপাশের ঝিল্লিতে গিয়ে অবস্থান নেয়। এরপর নাগেল সেগুলো কীভাবে কাজ করে, তা পরীক্ষা করার সুযোগ পান। খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, এক দশক আগে হেগেম্যান যে ধারণা দিয়েছিলেন, সেটিই সঠিক। নতুন আবিষ্কৃত প্রোটিনগুলো ছিল আয়ন চ্যানেল, যা আলো পড়লে খুলে যায়।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
এই প্রোটিনগুলোর নাম দেওয়া হয় চ্যানেলরোডপসিন-১ (channelrhodopsin-1) এবং চ্যানেলরোডপসিন-২ (channelrhodopsin-2)। প্রথম প্রোটিনটির আলোচনা এখানে বাদ দিয়ে আমরা দ্বিতীয়টির দিকে মনোযোগ দেব। কারণ চ্যানেলরোডপসিন-২-ই পরবর্তীতে অপটোজেনেটিকসের পথ তৈরি করে।
হেগেম্যানের পরীক্ষার মতোই, নাগেল যখন চ্যানেলরোডপসিন-২-এর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন, তখন দেখা যায় প্রোটিনটি আলোর ক্ষুদ্র একটি ঝলকের প্রতি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। আলো পড়ার মাত্র ০.২ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ব্যাঙের ডিম্বাণুর কোষপৃষ্ঠে একটি চ্যানেল খুলে যায়। এরপর ওই চ্যানেল দিয়ে ধনাত্মক চার্জযুক্ত আয়ন প্রবাহিত হতে থাকে। এর ফলে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়।
হেগেম্যান ও নাগেল বুঝতে পারলেন, তারা একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন। তারা চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিনটি ভ্রূণীয় মানব কিডনি কোষ এবং হ্যামস্টারের কিডনি কোষে প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করেন। কোষগুলো আলোক সংবেদনশীল হয়ে উঠল। আলোতে উন্মুক্ত করার পর কোষগুলো বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে শুরু করল।
২০০৩ সালে হেগেম্যান ও নাগেল তাদের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। তারা প্রস্তাব করেন, আলো ব্যবহার করে কোষের মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করার জন্য চ্যানেলরোডপসিন-২ একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এরপর এই গবেষণার দায়িত্ব এগিয়ে নেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ বিজ্ঞানী।
১৯৯০-এর দশকে কার্ল ডেইসেরথ যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন, তখন তিনি নিউরোসার্জন হওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু তার প্রশিক্ষণের একটি অংশ হয়েছিল একটি মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে। সেখানে রোগীদের কষ্ট এবং তাদের সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একই সময়ে তার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে, মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে একেকজনের ক্ষেত্রে এত ভিন্নভাবে কাজ করে? বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের জন্য আনন্দ অনুভব করা এত কঠিন কেন? অটিজমের কারণ কী? সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের বিভ্রমই বা কেন হয়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি স্নায়ুবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। গবেষণাগারে তিনি মস্তিষ্কের পাতলা টিস্যু ব্যবহার করে পেট্রি ডিশে সেগুলো পরীক্ষা করতেন। তার গবেষণা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তিনি বুঝতে পারলেন, ক্লিনিকে দেখা রোগগুলোর প্রকৃতি বোঝার জন্য তাকে জীবিত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা করতে হবে।
অন্য গবেষকেরাও ফ্রান্সিস ক্রিকের প্রস্তাবিত ধারণার মতো নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাদের অনেকেই এমন একটি কাজের পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় করা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, যেটিকে তখন অবাস্তব স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছিল।
ডেইসেরথ বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তাকে নিতেই হবে। তিনি যেসব চিকিৎসা তার রোগীদের দিতে পারতেন, সেগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর হতো এবং প্রায়ই গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করত। রোগীদের আরও ভালোভাবে সাহায্য করতে হলে মস্তিষ্ক সম্পর্কে তার আরও গভীর ধারণা প্রয়োজন ছিল।
ডেইসেরথ নিজের গবেষণাগার গড়ে তোলার পর তার দল এমন একটি প্রোটিনের সন্ধান শুরু করে, যা ব্যবহার করে স্নায়ুকোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করা সম্ভব হবে। তারা অসংখ্য সম্ভাব্য প্রোটিন পরীক্ষা করেন। এরপর ডেইসেরথ যখন চ্যানেলরোডপসিন-২ আবিষ্কারের কথা জানতে পারেন, তিনি গেয়র্গ নাগেলকে চিঠি লিখে এই প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা বহনকারী ডিএনএ পাওয়ার অনুরোধ করেন।
ডিএনএটি ডেইসেরথের গবেষণাগারে পৌঁছানোর পর তিনি সেটি পেট্রি ডিশে কালচার করা ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করান। তার আশঙ্কা ছিল, সংবেদনশীল স্নায়ুকোষগুলো হয়তো বাইরের এই জিনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা দেখা গেল না। কোষগুলো স্বাভাবিকভাবেই চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরি করতে শুরু করল।
গবেষক দলটি যখন স্নায়ুকোষগুলোর ওপর নীল আলো ফেলল, কোষগুলো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাল। আলো স্নায়ুকোষে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করল, যা পরবর্তী সময়ে অন্য স্নায়ুকোষেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
২০০৫ সালে ডেইসেরথের গবেষক দল তাদের এই আবিষ্কারের ফল প্রকাশ করে। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছিল। তবে ডেইসেরথ জানতেন, তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি। সেই লক্ষ্য ছিল জীবিত প্রাণীর মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
এরপর কার্ল ডেইসেরথ পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেলসহ আরও অনেক গবেষকের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেন। তিনি নিজের আবিষ্কারের কথা এমন অন্যান্য গবেষকদেরও জানান, যারা এই প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন। ডেইসেরথের গবেষণাগার এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার পর গবেষকেরা দ্রুত আরও অনেক প্রোটিন খুঁজে পান, যেগুলো আলো ব্যবহার করে স্নায়ুকোষকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে। এসব প্রোটিন আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সক্রিয় হয়।
২০০৬ সালে এই নতুন পদ্ধতির নাম দেওয়া হয় অপটোজেনেটিকস। এর এক বছর পর, ২০০৭ সালে, ডেইসেরথ জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে সফলভাবে স্নায়ুকোষ সক্রিয় করতে সক্ষম হন। তার গবেষক দল মোটর কর্টেক্সে থাকা একটি নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিন ২ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিন প্রবেশ করায়। মোটর কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে।
এরপর গবেষকেরা একটি সরু অপটিক্যাল ফাইবার মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবেশ করান। মাথার খুলিতে করা ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে ফাইবারটি মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তারা ইঁদুরের গোঁফের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন।
একই বছর অন্য গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে ডেইসেরথ অপটোজেনেটিকস ব্যবহার করে ঘুমন্ত ইঁদুরকে নিয়ন্ত্রিতভাবে জাগিয়ে তোলেন। গবেষক দলটি চ্যানেলরোডপসিন-২ এমন এক ধরনের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করায়, যেটি সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং গবেষকেরা ধারণা করেছিলেন, এই কোষগুলো জেগে থাকার অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যখন ওই স্নায়ুকোষগুলোর ওপর আলো ফেললেন, ইঁদুরগুলো জেগে উঠল। এর মাধ্যমে তাদের ধারণাটিও নিশ্চিত হলো।
অপটোজেনেটিকসের শুরুর সময়কার আরেকটি বিখ্যাত গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ১৯৮৭ সালে ইমিউনোলজিতে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া সুসুমু টোনেগাওয়ার সঙ্গে কাজ করে ডেইসেরথ সফলভাবে একটি এনগ্রাম সক্রিয় করেন। কোনো স্মৃতি তৈরি হওয়ার সময় মস্তিষ্কে যে নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের বিন্যাস তৈরি হয়, তাকে এনগ্রাম বলা হয়।
গবেষকেরা ইঁদুরের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করেন, যখন ইঁদুরগুলো ভয় পাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। তারা লক্ষ করেন, কোন স্নায়ুকোষগুলো ওই অভিজ্ঞতার স্মৃতি তৈরির সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হচ্ছে। পরে তারা যখন ওই স্নায়ুকোষগুলো আবার সক্রিয় করেন, তখন ইঁদুরগুলো ভয় পাওয়ার লক্ষণ দেখায়, যদিও সেই মুহূর্তে তাদের সামনে কোনো বিপদ ছিল না।
এটি ছিল প্রথম এমন পরীক্ষা, যেখানে গবেষকেরা নির্দিষ্ট একটি স্মৃতি তৈরির জন্য ঠিক কোন স্নায়ুকোষগুলো প্রয়োজন, তা সরাসরি দেখাতে সক্ষম হন।
মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষকে আলাদাভাবে সক্রিয় করার সক্ষমতা এই জটিল অঙ্গটি সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৯ হাজার কোটি স্নায়ুকোষ থাকে। প্রতিটি স্নায়ুকোষ আবার অন্য হাজার হাজার স্নায়ুকোষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।
অনেক ক্ষেত্রেই একটি স্নায়ুকোষ থেকে বের হওয়া স্নায়ুপথ মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছায়। আবার শরীরের একেবারে আলাদা ধরনের শারীরিক কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুকোষগুলোও মস্তিষ্কের একই অঞ্চলে একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকতে পারে।
অপটোজেনেটিকসের মাধ্যমে গবেষকেরা এখন জটিল স্নায়ুকোষের একটি গুচ্ছের মধ্যে ঠিক কোন স্নায়ুকোষ মস্তিষ্কের কোন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তা শনাক্ত করতে পারছেন। যেমন, তারা এমন স্নায়ু সার্কিট শনাক্ত করেছেন, যেগুলো ব্যথার অনুভূতি, সামাজিক আচরণ, তৃষ্ণা, খাবার গ্রহণ, পুরস্কার বা আনন্দের অনুভূতি এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছু স্নায়ুকোষের কাজও শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো শরীরের দৈনিক জৈবিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার পর জ্বর তৈরি করা পর্যন্ত নানা কাজে যুক্ত।
গবেষকেরা যখন ইঁদুরের বাচ্চাদের যত্ন নেওয়ার মতো আরও জটিল আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন, তখন তারা দেখতে পান, একটি আচরণের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা স্নায়ু সার্কিটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। যেমন, একটি সার্কিট ইঁদুর কীভাবে তার বাচ্চাদের এক জায়গায় জড়ো করে বাসায় নিয়ে আসে, তা নিয়ন্ত্রণ করে। আরেকটি সার্কিট বাচ্চাদের শরীর পরিষ্কার করে দেওয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
মস্তিষ্কের বাইরেও স্নায়ুতন্ত্র ও কোষের কাজের মানচিত্র তৈরি করতে অপটোজেনেটিকস ব্যবহার করা যায়। ডেইসেরথ দেখিয়েছেন, হৃদস্পন্দনের ছন্দ আমাদের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। হৃদপিণ্ডকে জোর করে দ্রুত ও বেশি কাজ করানো হলে উদ্বেগের অনুভূতি আরও তীব্র হতে পারে। অন্য গবেষকেরা অন্ত্রে থাকা নির্দিষ্ট কিছু কোষ শনাক্ত করেছেন, যেগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে কেন কিছু মানুষ কৃত্রিম মিষ্টিকারকের বদলে চিনি খেতে বেশি পছন্দ করেন। এগুলো অসংখ্য গবেষণার মধ্যে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ।
অপটোজেনেটিকস থেকে পাওয়া জ্ঞান নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরিতে কাজে লাগবে, এমন আশা ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। এই পদ্ধতি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, আলঝেইমার এবং পারকিনসন রোগের মতো বিভিন্ন মানসিক ও স্নায়বিক রোগের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষকদের আরও গভীর ধারণা দিয়েছে।
গবেষকেরা অপটোজেনেটিকসকে সরাসরি চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। বর্তমানে চলমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তারা রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। এই রোগ চোখের রড ও কোষ ধ্বংস করে ধীরে ধীরে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়।
একজন দৃষ্টিহীন মানুষের রেটিনায় চ্যানেলরোডপসিনের মতো একটি প্রোটিন প্রবেশ করানোর পর তিনি আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। বিশেষ ধরনের চশমা ব্যবহার করে তিনি টেবিলের ওপর রাখা বস্তু শনাক্ত করতে এবং সেগুলো ধরতে সক্ষম হন।
ককলিয়া ইমপ্ল্যান্টের উন্নতিতেও অপটোজেনেটিকস কাজে লাগতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই ধরনের ইমপ্ল্যান্ট বৈদ্যুতিক সংকেত ব্যবহার করে শ্রবণ স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। এর পরিবর্তে অপটোজেনেটিকস ব্যবহার করা গেলে আরও নির্ভুলভাবে শ্রবণ স্নায়ুকে সক্রিয় করা সম্ভব হতে পারে।
কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেলকে ২০২৬ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এমন সব আবিষ্কারের জন্য, যেগুলো মিলে স্নায়ুবিজ্ঞানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গবেষণাপদ্ধতির জন্ম দিয়েছে।
অপটোজেনেটিকস এখনও মানবজাতির অন্যতম বড় রহস্যের উত্তর খুঁজে চলেছে আর সেটা হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পুরোপুরি বের করা।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।






