২০ মার্চ, ২০২৫ এ Science জার্নালে প্রকাশিত একটি ব্রেইন-স্ক্যানিং গবেষণা অনুসারে, মাত্র এক বছর বয়সী শিশুরাও স্মৃতি গঠন করতে পারে। আগে মনে করা হতো শিশুদের প্রখম কয়েকবছর স্মৃতি তৈরি হয় না। একে যাকে চাইল্ডহুড অ্যামনেশিয়া (বা infantile amnesia) বলা হয়। কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল এমনটা ইঙ্গিত দেয় যে জীবনের প্রথম কয়েক বছর স্মরণ করতে না পারার কারণ স্মৃতি তৈরি না হওয়া নয়, বরং সেগুলো রিকল করতে অসুবিধা হওয়ার কারণে হয়ে থাকে।
নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার গবেষক ট্রিস্টান ইয়েটস এ ব্যাপারে বলেন বলেন, “একটি দারুণ সম্ভাবনা হলো, ছোটবেলার এই স্মৃতিগুলো আসলে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও রয়ে যায়—শুধু আমরা সেগুলো মনে করতে পারি না”
স্মৃতির রহস্য
যতই চেষ্টা করি না কেন, আমরা আমাদের জীবনের প্রথম কয়েক মাস বা বছরের ঘটনাগুলো মনে করতে পারি না। তবে এর কারণ কী? শিশুদের হিপোক্যাম্পাস (মস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ) কি তখনও ঠিকমত গঠিত হয়নি? নাকি বড় হওয়ার পর আমরা সেই স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনতে পারি না?—এই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় ছিল।
এই রহস্য উদঘাটনের জন্য, ইয়েটস এবং তাঁর সহকর্মীরা ৪ মাস থেকে ২ বছর বয়সী ২৬ জন শিশুর মস্তিষ্ক স্ক্যান করতে functional magnetic resonance imaging (fMRI) ব্যবহার করেন।
গবেষণায় শিশুদের একটি নতুন মুখ, বস্তু বা দৃশ্য ২ সেকেন্ডের জন্য দেখানো হয়, তারপর প্রায় এক মিনিট পরে একই ছবি আবার দেখানো হয়। এই দুই সময়ে গবেষকরা হিপোক্যাম্পাসের অ্যাকটিভিটি মেজার করেন।
ফলাফলে দেখা যায়, যখন শিশু নতুন একটি ছবি দেখছিল, তখন হিপোক্যাম্পাস যত বেশি সক্রিয় ছিল। পরবর্তীতে সেই একই ছবি দেখানো হলে তারা একটু বেশিক্ষণ ধরেই দেখেছিলো। যেহেতু শিশুরা সাধারণত পরিচিত জিনিসের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, তাই এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে তারা আগের দেখা জিনিস মনে করতে পারছে।
গবেষকরা দেখতে পান, স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী সক্রিয়তা হিপোক্যাম্পাসের পেছনের অংশে দেখা গেছে। এই অংশ প্রাপ্তবয়স্কদের স্মৃতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত। এই গবেষণা মোটামুটি প্রমাণ করে যে শিশুর মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণের সক্ষমতা রাখে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ১২ মাসের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই মস্তিষ্কগত সংকেত আরও শক্তিশালী, যা নির্দেশ করে যে শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের হিপোক্যাম্পাস স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও দক্ষ হয়ে ওঠে।
ক্রেডিট: 160/90
এই গবেষণাকে “চমৎকার” বলে প্রশংসা করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণগত স্নায়ুবিজ্ঞানী এমি মিল্টন। তিনি বলেন, “এত ছোট শিশুদের কাছ থেকে ডাটা সংগ্রহ করা সহজ কাজ নয়। এই গবেষণা নিশ্চিতভাবে ইঙ্গিত দেয় যে ইমম্যাচিউর হিপোক্যাম্পাসও অন্তত কিছু পরিমাণে স্মৃতি গঠনে সক্ষম।”
ভুলে গেলেও হারিয়ে যায়নি
তাহলে, প্রাপ্তবয়স্করা কেন শৈশবের স্মৃতিগুলো মনে করতে পারে না? টার্ক-ব্রাউন ব্যাখ্যা করেন, “সম্ভবত এটি ‘স্মৃতি সংরক্ষণ’ ও ‘স্মৃতি পুনরুদ্ধারের’ পদ্ধতির মধ্যে অমিলের কারণে ঘটে। মস্তিষ্ক সেই পুরনো স্মৃতিগুলো খুঁজে পেতে ভুল ‘সার্চ টার্ম’ ব্যবহার করছে।”
এর কারণ হতে পারে, শিশুদের অভিজ্ঞতা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক আলাদা হয়। যেমন, শিশুকালে আমরা যা দেখি ও শুনি, সেগুলো প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণ ও শ্রেণিবদ্ধ করার ক্ষমতা আমাদের থাকে না। এমনকি হামাগুড়ি থেকে হাঁটতে শেখার মধ্যেও বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কারণ এতে পার্সপেক্টিভ পুরোপুরি বদলে যায়।
ইঁদুরের ওপর করা গবেষণাও ইঙ্গিত দেয় যে শৈশবের স্মৃতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কে রয়ে যেতে পারে। ২০১৬ সালের এক গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা ‘অপ্টোজেনেটিকস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুরের মস্তিষ্কে শিশু অবস্থার স্মৃতি সক্রিয় করেন, যা প্রমাণ করে যে সেই স্মৃতিগুলো হারিয়ে যায়নি।
নীতিগতভাবে মানুষের মস্তিষ্কে এই পরীক্ষা চালানো সম্ভব নয়, তবে সকল গবেষণা শক্তিশালীভাবেই প্রমাণ করে যে শৈশবের স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কেই রয়ে যায়, সেসব স্মৃতি রিকল করতে না পারার কারণে মনে হয় যে সেসব স্মৃতি চাইল্ডহুড অ্যামনেশিয়ার কারণে তৈরি হয় না বা ডিলিট হয়ে যায়।
———
Hippocampal encoding of memories in human infants. Science 387, 1316-1320 (2025)
DOI: 10.1126/science.adt7570
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



