বছর দশেক আগেও কেউই জানত না যে Asgard archaea নামে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব ছিলো। তবে ২০১৫ সালে, গভীর সমুদ্রের তলদেশের পলিমাটির নমুনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকরা এমন কিছু জিনের টুকরো আবিষ্কার করেন যা এক নতুন এবং অজানা একধরনের অণুজীবের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
কম্পিউটারের সহায়তায়, গবেষকরা এই জিনের টুকরোগুলোকে ধাঁধার মতো জোড়া লাগিয়ে পুরো জিনোম গঠন করেন। তখনই তারা বুঝতে পারেন যে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের আর্কিয়া (archaea) জীবগোষ্ঠী। আর্কিয়া (archaea) ব্যাকটেরিয়ার মতোই এককোষী অণুজীব। তবে জিনগত দিক থেকে এদের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, বিশেষত কোষের আবরণ ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে।
আরও গবেষণার পর, জীবাণুবিজ্ঞানীরা এই অণুজীবের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন, তাদের বিশদ বর্ণনা দেন এবং তাদের Asgard archaea নামে archaea-এর একটি স্বতন্ত্র উপশাখা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। এই নামটি নেওয়া হয়েছে নর্স পুরাণের স্বর্গীয় রাজ্য অ্যাজগার্ডের (অনেকে মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সেও দেখে থাকবেন) থেকে, কারণ এই জীবগোষ্ঠীর প্রথম নমুনা পাওয়া গিয়েছিল Loki’s Castle নামে পরিচিত একটি সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি, যা নরওয়ে ও স্ভালবার্ডের মাঝামাঝি আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে অবস্থিত।
আশ্চর্যের বিষয়, Asgard archaea আসলেই গবেষণার জন্য যেন স্বর্গ থেকে পাঠানো এক নিখোঁজ সূত্রের মতো কাজ করেছে। গবেষকরা দেখতে পান, এই অণুজীবগোষ্ঠী archaea এবং eukaryotes-এর মধ্যে এক অনুপস্থিত সংযোগ—অর্থাৎ এমন এক স্তর যা archaea এবং সকল ইউক্যারিওটিক জীবের (যাদের কোষে নিউক্লিয়াস থাকে, যেমন উদ্ভিদ ও প্রাণী) মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে।
ট্রি অব লাইফ থেকে কি একটি শাখা কমে গেল?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, গবেষণায় প্রমাণ মিলছে যে Asgard archaea এবং eukaryotes-এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং ইউক্যারিওটিক জীবের উৎপত্তি সম্ভবত Asgard archaea থেকেই হয়েছে। ফলে, জীববিজ্ঞানে প্রচলিত তিনটি প্রধান জীবগোষ্ঠীর (ব্যাকটেরিয়া, আর্কিয়া, এবং ইউক্যারিওটস) বিভাজন এই আবিষ্কারের ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
কিছু গবেষক পরামর্শ দিচ্ছেন যে eukaryotes-কে আসলে Asgard archaea-এরই একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা উচিত। যদি এটি সত্যি হয়, তবে জীবনের বিদ্যমান তিনটি গোষ্ঠী কমে দুইটি হয়ে যাবে: archaea (যার মধ্যে eukaryotes অন্তর্ভুক্ত) এবং bacteria.
ক্রেডিট: Florian Wollweber/ETH Zurich
ইটিএইচ জুরিখ (ETH Zurich) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্টিন পিলহোফার ও তার গবেষক দল Asgard archaea নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। দুই বছর আগে Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় তারা Lokiarchaeum ossiferum নামের এক Asgard archaea-এর কোষের কাঠামো ও আর্কিটেকচার বিশ্লেষণ করেন। স্লোভেনিয়ার একটি লবণাক্ত পানির চ্যানেলের পলিমাটির নমুনা থেকে এই জীবটি সংগ্রহ করা হয়। এটি গবেষক ক্রিস্টা শ্লেপারের ল্যাবে পৃথকীকৃত করা হয়েছিল, যা ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত।
সেই গবেষণায়, পিলহোফার ও তার সহগবেষক জিংওয়ে সু এবং ফ্লোরিয়ান উলওয়েবার দেখান যে Lokiarchaeum ossiferum এমন কিছু কোষীয় গঠন বহন করে, যা সাধারণত eukaryotes-এর মধ্যে দেখা যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের সন্ধান
পিলহোফার বলেন, “আমরা এই প্রজাতির মধ্যে এমন একটি অ্যাক্টিন প্রোটিন খুঁজে পেয়েছি, যা ইউক্যারিওটিক কোষের অ্যাক্টিন প্রোটিনের সঙ্গে অত্যন্ত মিল রাখে—এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রায় সব Asgard archaea-তে এই প্রোটিন পাওয়া গেছে।”
প্রথম গবেষণায়, গবেষকরা বিভিন্ন ধরণের মাইক্রোস্কোপিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখান যে এই প্রোটিন—যাকে তারা Lokiactin নাম দেন—ফিলামেন্টের মতো কাঠামো গঠন করে, বিশেষ করে কোষের অনেকগুলো তন্তুর মতো প্রসারিত অংশে। ফ্লোরিয়ান উলওয়েবার বলেন, “এগুলো সম্ভবত Asgard archaea-এর জটিল কোষীয় কাঠামোর কঙ্কাল গঠন করে।”
ইউক্যারিওটিক কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলো মাইক্রোটিউবিউলস, যা টিউবের মতো গঠনযুক্ত এবং টিউবুলিন নামক প্রোটিন দ্বারা গঠিত। এই ক্ষুদ্র নলাকার কাঠামো কোষের অভ্যন্তরীণ পরিবহন এবং কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোসোম আলাদা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই মাইক্রোটিউবিউলগুলোর উৎপত্তি এতদিন অজানা ছিল—অবশেষে রহস্য উদঘাটিত হলো। গত ২১ মার্চ, ২০২৫, Cell জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায়, ইটিএইচ জুরিখের বিজ্ঞানীরা Asgard archaea-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট কাঠামোর সন্ধান পেয়েছেন এবং সেগুলোর গঠন বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তাদের পরীক্ষাগুলো দেখায় যে Asgard archaea-তে থাকা টিউবুলিন প্রোটিনগুলোর মাধ্যমে গঠিত মাইক্রোটিউবিউলগুলো ইউক্যারিওটিক জীবের মাইক্রোটিউবিউলের মতোই, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কিছুটা ছোট।
তবে, খুব কম সংখ্যক Lokiarchaeum কোষই এই মাইক্রোটিউবিউল গঠন করে। আর অ্যাক্টইন (actin) প্রোটিন ব্যাপকভাবে পাওয়া গেলেও, এই টিউবুলিন (tubulin) প্রোটিনগুলো Asgard archaea-এর খুব কম সংখ্যক প্রজাতিতে দেখা যায়।
কেন এত বিরল?
বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে Lokiarchaea-তে এই tubulin প্রোটিন এত কম পাওয়া যায় কেন, বা কোষগুলোর জন্য এগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্যারিওটিক জীবের ক্ষেত্রে, মাইক্রোটিউবিউল কোষের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু ক্ষেত্রে, মোটর প্রোটিন এই নলাকার কাঠামোর উপর দিয়ে “হেঁটে যায়” এবং কোষের অভ্যন্তরে বিভিন্ন উপাদান স্থানান্তর করে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত, Asgard archaea-তে এই ধরনের মোটর প্রোটিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
তবে, ETH গবেষকদের নতুন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই tubulin-এর তৈরি নলগুলোর এক প্রান্ত বৃদ্ধি পায়। এর মানে হতে পারে যে এগুলো ইউক্যারিওটিক মাইক্রোটিউবিউলের মতোই পরিবহন কার্যক্রমে সাহায্য করে। এই গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক জিংওয়ে সু বলেন, “আমরা দেখাতে পেরেছি যে এই টিউবগুলো তাদের এক প্রান্ত থেকে বৃদ্ধি পায়। তাই আমাদের ধারণা, এগুলো ইউক্যারিওটিক মাইক্রোটিউবিউলের মতো পরিবহন কাজে যুক্ত থাকতে পারে।” তিনি আরও জানান যে, এই গবেষণার জন্য তিনি পোকামাকড়ের কোষে tubulin তৈরি করেছিলেন এবং এর গঠন বিশ্লেষণ করেন।
এই গবেষণায় জীবাণুবিজ্ঞান, জীবরসায়ন, কোষতত্ত্ব এবং গঠনগত জীববিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করেছেন।
ক্রেডিট: F. Wollweber el at./Cell
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, জটিল জীবনের বিকাশে সাইটোস্কেলেটন কি অপরিহার্য ছিল? যদিও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি, তবে গবেষকদের দৃঢ় বিশ্বাস যে সাইটোস্কেলেটন (কোষের অভ্যন্তরীণ কাঠামো) ইউক্যারিওটিক জীবের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল।
এই ধাপ সম্ভবত সেই সময় ঘটেছিল, যখন একটি Asgard archaea তার হাতের মতো অংশ দিয়ে একটি ব্যাকটেরিয়াকে জড়িয়ে ধরেছিল। বিবর্তনের ধারায়, এই ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে কোষের শক্তিকেন্দ্র মাইটোকন্ড্রিয়াতে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোষের নিউক্লিয়াস ও অন্যান্য অঙ্গাণু (অর্গ্যানেল) গঠিত হয়—এভাবেই ইউক্যারিওটিক কোষের জন্ম হয়।
এ ব্যাপারে পিলহোফার বলেন, “এই বিস্ময়কর সাইটোস্কেলেটনই হয়তো এই বিবর্তনের সূচনা করেছিল। এটি Asgard archaea-কে হাতের মতো প্রসারিত অংশ গঠনের সুযোগ দিয়েছিল, যা তাদের আশেপাশের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে এবং পরে সেগুলোকে গ্রাস করতে সাহায্য করেছিল।”
অ্যাজগার্ড আর্কিয়া নিয়ে আরও গবেষণা
পিলহোফার ও তার গবেষক দল এখন actin ফিলামেন্ট ও আর্কিয়ার tubulin-এর কার্যকারিতা এবং সেগুলোর মাধ্যমে গঠিত মাইক্রোটিউবিউল নিয়ে আরও গবেষণা করতে চান।
তারা এই অণুজীবগুলোর পৃষ্ঠে পাওয়া নতুন প্রোটিন চিহ্নিত করতেও আগ্রহী। পিলহোফার আশা করছেন, তার দল এই প্রোটিনগুলোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি অ্যান্টিবডি ডেভেলপ করতে পারবে, যা বিজ্ঞানীদের Asgard archaea খুঁজে আলাদা করতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন,
“আমাদের এখনো Asgard archaea সম্পর্কে অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, বিশেষত এদের ইউক্যারিওটিক জীবের সঙ্গে সম্পর্ক এবং এদের ব্যতিক্রমী কোষবিজ্ঞান নিয়ে।” “এই রহস্যময় অণুজীবগুলোর গোপন সত্য উন্মোচন করা সত্যিই রোমাঞ্চকর!”
———
Microtubules in Asgard archaea, Cell (2025).
DOI: 10.1016/j.cell.2025.02.027
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।




