গোলাপের পাপড়ি যেমনটা দেখতে সুন্দর, তেমনি এর বেড়ে ওঠার পেছনে লুকিয়ে আছে জটিল গণিত। পদার্থবিদদের একদল গবেষক সম্প্রতি দেখিয়েছেন, পাপড়ির গঠন নির্ভর করে এমন এক ধরনের জ্যামিতিক কৌশলের ওপর—যা এর আগে প্রকৃতিতে দেখা যায়নি। তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, কম্পিউটার সিমুলেশন এবং নমনীয় প্লাস্টিক শিট নিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা দেখেছেন, যখন পাপড়িগুলো বাইরের দিকে গুটিয়ে যায়, তখন মেকানিকাল ফিডব্যাক তার বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে পাপড়ির কিনারায় গড়ানো প্রান্ত ও কোণাকৃতি ধার তৈরি হয়।
এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১ মে, ২০২৫ Science জার্নালে। গবেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই জ্যামিতি স্থাপত্যবিদ্যায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
জ্যামিতিক নকশা যে জীবের বিকাশে প্রভাব ফেলে, তা অনেক আগে থেকেই জানা। তবে আগে যত গবেষণা হয়েছে, সবক্ষেত্রেই বিষয়টি ছিল পৃষ্ঠের ইন্ট্রিনসিক (intrinsic) জ্যামিতির ওপর ভিত্তি করে। ইন্ট্রিনসিক বৈশিষ্ট্য বলতে বোঝায় পৃষ্ঠের যেকোনো দুইটি বিন্দুর মধ্যকার দূরত্ব।
কিন্তু একই ইন্ট্রিনসিক জ্যামিতি থাকা সত্ত্বেও একটি পৃষ্ঠ অনেকভাবে ত্রিমাত্রিক জগতে অস্তিত্ব রাখতে পারে—এগুলোকে বলে এক্সট্রিনসিক (extrinsic) জ্যামিতি। যেমন, একটি কাগজের পাতাকে একদম সমানভাবে বিছানোও যায়, আবার সেটিকে গোল করে সিলিন্ডারের মতোও মোড়ানো যায়। এতে ঔ কাগজের পৃষ্ঠের পিঠে হাঁটতে থাকা একটি পিঁপড়া তার হাঁটার দূরত্বে কোনো পার্থক্য বুঝবে না কিন্তু ত্রিমাত্রিক জায়গায় কাগজের ভাঁজে থাকা বিন্দুগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব ঠিকই বদলে যাবে বা যেতে পারে।
একটি প্রকৃতিগতভাবে বাঁকা পৃষ্ঠকে সমানভাবে বিছাতে গেলে সেটিকে টানতে হয়, যা সেই পৃষ্ঠের ভেতরে চাপ বা স্ট্রেস তৈরি করে।
জীবন্ত টিস্যুতে এই চাপ অন্য অনেক জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। ধরুন, একটি পাতার এমনভাবে বেড়ে ওঠার প্রবণতা আছে যাতে এটি বাঁকিয়ে গেলে শক্তি খরচ কম হয়। কিন্তু যদি পাতাটি মোটা হয় বা এর আলাদা স্তর ভিন্নভাবে বাঁকতে চায়, তাহলে ওই প্রাকৃতিক বাঁকানোর পথ ব্যাহত হয়। এই ধরনের বৈপরীত্য বা ‘অসমতা’ (incompatibility) প্রকৃতিতে দেখা যায় এবং এর ফলে জটিল গঠন ও শক্তিশালী পৃষ্ঠ তৈরি হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন একটি গোলাপের পাপড়ির বেড়ে ওঠার আকার নির্ভর করে এক নতুন ধরনের অসামঞ্জস্যতার ওপর, যা ইন্ট্রিনসিক নয়, বরং এক্সট্রিনসিক জ্যামিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, গোলাপের পাপড়ি অভ্যন্তরীণভাবে একটি সমতল পৃষ্ঠ হিসেবে গঠন পেতে চায়, কিন্তু বাহ্যিকভাবে এটি সিলিন্ডারের মতো বাঁকতে চায়। পুরো কিনারাটি একটানা সিলিন্ডারের মতো বাঁকতে না পারায়, এটি একাধিক সিলিন্ডার আকৃতির অংশে ভেঙে যায় এবং প্রতিটি অংশের মাঝে তৈরি হয় তীক্ষ্ণ কোণ বা ‘কাস্প’। অর্থাৎ প্রতিটি সিলিন্ডার অংশ একত্রে মিলিত হয় কাস্পে। পাপড়ি যত বাড়ে, প্রতিটি কাস্পে জমে থাকা চাপ গোল প্রান্তকে ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ কোণে রূপান্তরিত করে দেয়।
এই আকৃতিগত গঠন গোলাপের জন্য কোনো প্র্যাক্টিক্যাল সুবিধা এনে দেয় কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সম্ভবত এটি বেশি পরাগবাহী পতঙ্গ আকর্ষণ করতে, শিশির জমাতে বা ফুলের কাঠামোগত শক্তি বাড়াতে সহায়তা করে থাকতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
———
Geometrically frustrated rose petals. Science (2025).
DOI: 10.1126/science.adt0672
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


