আমরা সবাই জানি, নিউটনের সূত্র মতে দুটি বস্তুর মধ্যে একটি আকর্ষণজনিত বল কাজ করে — যাকে আমরা মহাকর্ষ বলি। পরে আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে দেখান, এই বল আসলে মহাকাশ-সময়ের বক্রতাজনিত একটি প্রভাব। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় পদার্থবিদ ড. মেলভিন ভপসন জানাচ্ছেন এক বিস্ময়কর ব্যাখ্যা: মহাকর্ষ আসলে কোনো মৌলিক বল নয়, এটি হতে পারে মহাবিশ্বের ভেতরে চলমান এক ধরণের গণনামূলক প্রক্রিয়ার ফসল!
ড. ভপসনের এই তত্ত্ব ইনফরমেশন ফিজিক্স (Information Physics) নামক একটি ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই ধারায় বিশ্বাস করা হয় যে, বাস্তবতা শুধুই বস্তুগত নয়, বরং এটি একটি গঠিত তথ্যের কাঠামো — অনেকটা বিশাল এক কম্পিউটার সিমুলেশনের মত, যেখানে সমস্ত কিছুর আচরণ নির্ধারিত হয় কিছু নির্দিষ্ট কোড ও তথ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
তথ্যের সংকোচন থেকেই মহাকর্ষ?
ভপসনের মতে, বস্তুগুলোর মধ্যে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ দেখা যায়, তা আসলে মহাবিশ্বের তথ্যকে অপটিমাইজ বা সংক্ষেপ করার একটি কৌশল। তার ভাষায়, মহাবিশ্ব যেন “ঘর গুছিয়ে নিচ্ছে” অর্থাৎ এনট্রপি কমাতে বস্তুগুলোকে গুচ্ছবদ্ধ করে রাখছে, যাতে একাধিক জায়গায় না ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে, বস্তুগুলো একত্রিত হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় — যাকে আমরা মহাকর্ষ বলেই জানি।
তাঁর গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাশূন্যকে যদি অসংখ্য ক্ষুদ্র “প্রাথমিক কোষে” ভাগ করা যায়, তবে প্রতিটি কোষ হয় ফাঁকা (০) নাহলে বস্তুযুক্ত (১)। এগুলো ০ এবং ১ হিসাবে বাইনারি তথ্য ধারণ করে। যখন একাধিক কণা আশেপাশের কোষে অবস্থান করে, তখন তথ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোকে এক কোষে এনে তথ্যসংখ্যা কমিয়ে ফেলা যায়। এটি অনেকটা কম্পিউটার গেম বা সিমুলেশনে রিসোর্স ব্যবহারে দক্ষতা আনার কৌশলের মত।
তথ্য, ভর এবং মহাবিশ্ব
ড. ভপসনের আগের গবেষণাগুলোতে তিনি দেখিয়েছিলেন যে তথ্যের নিজস্ব ভর থাকতে পারে, এবং মৌলিক কণাগুলো জীবকোষের ডিএনএ-এর মতো করে তথ্য সংরক্ষণ করতে সক্ষম। এবার তিনি এটিও দাবি করছেন যে মহাবিশ্বের “কোড” বা তথ্যভিত্তিক কাঠামোর কারণেই বস্তুগুলো একত্রিত হয় — যেন মহাবিশ্ব একটি সুবিন্যস্ত, কম বিশৃঙ্খল তথ্যভাণ্ডার হিসেবে নিজেকে বজায় রাখে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহাকর্ষ কোনো দূরপাল্লার মৌলিক বল নয়, বরং একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যা মহাবিশ্বের নিজস্ব প্রোগ্রামিং রুলস অনুযায়ী কাজ করে চলা একটি গণনামূলক প্রক্রিয়ার অংশ। এতে ধারণা করা যায় যে মহাকর্ষীয় বল আসলে তথ্য এনট্রপি হ্রাসের ফল, যাতে মহাশূন্যের কোডিং এবং পার্টিকল ট্র্যাকিং সহজ হয়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রশ্ন
ভপসন মনে করেন, এই মডেল প্রচলিত তত্ত্বগুলোর থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন এবং এর বড় প্রভাব পড়তে পারে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি এবং কোয়ান্টাম তথ্যতত্ত্বে। তবে, তিনি এটাও স্বীকার করেন যে এই তত্ত্ব এখনো গবেষণার পর্যায়ে, এবং এটি ভবিষ্যতে কতটা গৃহীত হবে বা ব্যবহারিক ফলাফল দেবে — তা সময়ই বলে দেবে।
তবুও, ড. ভপসনের এই গবেষণা তথ্যতত্ত্বের আলোকে বাস্তবতাকে নতুনভাবে কল্পনা করার প্রয়াসেরই অংশ। মহাবিশ্বের প্রকৃত গঠন ও কার্যপ্রণালী বুঝতে হলে আমাদের চিন্তার সীমানা ভাঙতে হবে — আর এই ধরনের কাজ সেটাই করছে।
———
Is gravity evidence of a computational Universe? AIP Advances (2025),
DOI: 10.1063/5.0264945
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


