বিজ্ঞানীরা একটি শক্তিশালী অ্যান্টিভেনম তৈরি করেছেন। অ্যান্টিভেনমটি এক ব্যক্তির রক্তে থাকা অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে বানানো হয়েছে যিনি বহুবার বিষাক্ত সাপের কামড় খেয়েছেন। এই অ্যান্টিভেনম ১৯টি প্রাণঘাতী সাপের বিষের বিরুদ্ধে ইঁদুরকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম, যার মধ্যে কিং কোবরা (Ophiophagus hannah) ও রয়েছে।
এই অ্যান্টিভেনমে মিশ্রিত করা হয়েছে ভ্যারেসপ্লাডিব (varespladib) নামের একটি ঔষধ এবং টিম ফ্রিডে নামের এক মার্কিন সাপ সংগ্রাহকের রক্ত থেকে সংগৃহীত অ্যান্টিবডির কপি। ফ্রিডে নিজেকে ৬০০ বারের বেশি সাপের বিষ দিয়েছেন এবং প্রায় ২০০ বার বিষাক্ত সাপের কামড় খেয়েছেন নিজ ইচ্ছায়। মে, ২০২৫ এ Cell জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় এই অ্যান্টিভেনমের কথা জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গবেষণা বহু প্রতীক্ষিত চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে, তবে যেহেতু এটি একজন ব্যক্তির আত্ম-পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে তৈরি, তাই এর নৈতিকতা প্রশ্নের মুখে। গবেষণাকরা বলছেন, তারা ফ্রিডেকে এভাবে বিষ প্রয়োগে উৎসাহিত করেননি। গবেষক জ্যাকব গ্লানভিল, বায়োমেডিকেল কোম্পানি Centivax-এর সিইও, বলেন, “আমরা ফ্রিডেকে এভাবে কিছু করার পরামর্শ দিইনি এবং ভবিষ্যতে আর কাউকে এটি করতেও হবে না কারণ আমাদের প্রয়োজনীয় সব অণু এখন আমাদের হাতে রয়েছে।” তিনি আরও সতর্ক করেন: “সাপের বিষ বিপজ্জনক, কেউ ফ্রিডের পথ অনুসরণ করবেন না।”
বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় ঘোড়া বা অন্যান্য প্রাণীর শরীরে সাপের বিষ প্রয়োগ করে, তারপর তাদের শরীর থেকে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করে। প্রতিটি অ্যান্টিভেনম সাধারণত গুটিকয়েক প্রজাতির সাপের বিরুদ্ধেই কাজ করে।
ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স-এর অ্যান্টিভেনম গবেষক কার্তিক সুনাগার বলেন, “আজকের ইমিউনোলজির উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনো পুরনো এই পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছি, যা হতাশাজনক।”
এই গবেষণায় লক্ষ্য ছিল এমন একটি অ্যান্টিভেনম তৈরি করা যা বিশ্বের ৬০০+ বিষাক্ত সাপের বিস্তৃত পরিসরের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। প্রথম ধাপে তারা Elapidae পরিবারের সাপ নিয়ে কাজ শুরু করে, যার মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক বিষধর সাপ রয়েছে। এই সাপের বিষে থাকে SNX (short-chain neurotoxins) ও LNX (long-chain neurotoxins) নামের পেপটাইড, যেগুলো স্নায়ুকোষে সংবেদী রিসেপ্টরে আটকে স্নায়ুর কার্যকারিতা ও পেশীর নড়াচড়া বন্ধ করে দিতে পারে।
গ্লানভিল ও আরেক গবেষক নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট, পিটার কোয়াং, সংবাদমাধ্যমে ফ্রিডের আত্ম-পরীক্ষার খবর দেখে আগ্রহী হন। ফ্রিডের সম্মতি ও সাপের বিষের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তারা তাঁর রক্ত সংগ্রহ করে। দুইটি রক্তের নমুনা থেকে অ্যান্টিবডি আলাদা করে গবেষণাগারে ইঁদুরে পরীক্ষা চালানো হয়। পরে এতে যোগ করা হয় ভ্যারেসপ্লাডিব, একটি ওষুধ যা সাপের বিষে থাকা এনজাইম নষ্ট করে পেশী ও স্নায়ু ধ্বংস প্রতিরোধ করে।
তারা দেখতে পান, ফ্রিডের রক্ত থেকে নেওয়া দুটি অ্যান্টিবডি ও ভ্যারেসপ্লাডিবের সংমিশ্রণে তৈরি ককটেল ইঁদুরকে ১৯টি ভিন্ন ধরনের বিষাক্ত Elapid সাপের মারাত্মক বিষ থেকেও বাঁচাতে পারে। একটি অ্যান্টিবডি LNX বিষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে, অন্যটি SNX বিষের।
গ্লানভিল বলেন, মানুষের অ্যান্টিবডির সঠিক কপি প্রাণীর উপর ভিত্তি করে তৈরি অ্যান্টিবডির তুলনায় কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
সুনাগারসহ অনেক বিজ্ঞানী এই গবেষণার নৈতিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তারা গবেষণাটিকে কার্যকরভাবে পরিচালিত বলেও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ছোট অণুর ওষুধ (যেমন ভ্যারেসপ্লাডিব) ও মানব অ্যান্টিবডির সংমিশ্রণ আশা জাগায়। তবে এই অ্যান্টিবডি শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন করা যাবে কিনা এবং তা সাশ্রয়ী হবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন।
ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান IRD-র ভেনম বিশেষজ্ঞ জ্যঁ-ফিলিপ শিপো বলেন, সাপের কামড়ের প্রধান সমস্যা অ্যান্টিভেনম নয়, বরং সেটি দেরিতে প্রয়োগ করা হয়। “আমাদের ভাবতে হবে কীভাবে অ্যান্টিভেনম আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে বিষাক্ত সাপের কামড় বেশি ঘটে, এবং রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে আসতে উৎসাহিত করতে হবে,” বলেন তিনি। “এই নতুন অ্যান্টিবডিগুলো তা আদৌ পারবে কিনা, বলা কঠিন।”
গ্লানভিল বলেন, তিনি এই অ্যান্টিভেনমকে আরও বহনযোগ্য ও সাশ্রয়ী করার উপায় ভাবছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানুষের ওপর পরীক্ষা শুরু করার আগে বাস্তব জগতে এই ককটেল কাজ করে তা প্রমাণ করতে হবে।
Centivax কোম্পানি প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় সাপে কামড়ানো কুকুরের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করতে চায়। প্রয়োগের পর কিছু সময়ের মধ্যে যদি কাজ না করে, তাহলে ঐ কুকুরকে প্রচলিত অ্যান্টিভেনম দেওয়া হবে।
———
Snake venom protection by a cocktail of varespladib and broadly neutralizing human antibodies. Cell (2025)
DOI: 10.1016/j.cell.2025.03.050
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


