মধ্যযুগীয় আলকেমিরা স্বপ্ন দেখত সীসাকে সোনায় রূপান্তর করার। কিন্তু আজ আমরা জানি, সীসা ও সোনা দুটি ভিন্ন মৌল এবং কেমিস্ট্রির কোন কৌশলেই একটিকে অন্যটিতে রূপান্তর করা সম্ভব না।
তবে আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের জানায়, সীসা ও সোনার পরমাণুর মূল পার্থক্য হল এর প্রোটনের সংখ্যা। সীসার পরমাণুতে সোনার তুলনায় মাত্র তিনটি প্রোটন বেশি থাকে। তাহলে কি শুধু এই তিনটি প্রোটন সরিয়েই সীসাকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব? হ্যাঁ, তা সম্ভব। তবে ব্যাপারটা মোটেই সহজ নয়।
সুইজারল্যান্ডের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (LHC) ALICE নামক এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীরা সীসার পরমাণুগুলোকে আল্ট্রা-হাই স্পিডে একে অপরের সাথে সংঘর্ষ করিয়ে বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী মুহূর্তের পরিস্থিতি অনুকরণ করার চেষ্টা করেন। সেই প্রচেষ্টায় তারা দুর্ঘটনাবশত অতি সামান্য পরিমাণে সোনা তৈরি করতে সক্ষম হন। ৭ মে, ২০২৫ Physical Review C জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে গবেষক দল জানিয়েছে যে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে LHC-তে সংঘটিত সংঘর্ষগুলোর ফলে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি হয়েছে। মাত্র ১ গ্রামের ২৯ ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ!
স্বর্ণের এই পরমাণুগুলো প্রায় ১ মাইক্রোসেকেন্ডের মতো সময় টিকে ছিল, তারপর কোথাও ধাক্কা খেয়ে অথবা ভেঙে গিয়ে অন্যান্য কণায় রূপান্তরিত হয়ে যায়।
কীভাবে সম্ভব?
প্রোটন থাকে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে, এবং যেহেতু প্রোটনের বৈদ্যুতিক চার্জ রয়েছে, তাই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র দ্বারা সেগুলোকে টানা বা ঠেলা যায়। কিন্তু নিউক্লিয়াস একত্রে বাঁধা থাকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বল দ্বারা, যার নাম স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স বা সবল নিউক্লিয় বল। এই বল অতিক্রম করতে হলে বজ্রপাতের চেয়েও প্রায় দশ লক্ষ গুণ বেশি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রয়োজন।
এই শক্তিশালী ক্ষেত্র তৈরি করতে বিজ্ঞানীরা সীসার নিউক্লিয়াসকে প্রায় আলোর গতিবেগে একে অপরের দিকে গুলি করে পাঠান।
যখন সীসার নিউক্লিয়াস একে অপরকে সরাসরি ধাক্কা দেয়, তখন তারা স্ট্রং ফোর্সের অধীনে একদম গুঁড়িয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় তারা একে অপরকে শুধু ছুঁয়ে যায়, এবং তখন কেবল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স কাজ করে।
একটি বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত বস্তু থেকে দূরত্ব যত কম, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তত বেশি। ফলে যখন একটি সীসার নিউক্লিয়াস আরেকটির খুব কাছ দিয়ে যায়, তখন তাদের মাঝে তৈরি হয় ভয়ঙ্কর শক্তিশালী একটি ক্ষেত্র। এই পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র নিউক্লিয়াসগুলোকে কাঁপিয়ে দেয়, এবং মাঝে মাঝে কিছু প্রোটন ছিটকে বেরিয়ে আসে। যদি ঠিক তিনটি প্রোটন ছিটকে পড়ে, তাহলে সেই সীসার নিউক্লিয়াসটি সোনায় রূপান্তরিত হয়।
সোনা যে তৈরি হয়েছে তার প্রমাণ
কিন্তু তাহলে কীভাবে বোঝা যায় যে সীসা থেকে সোনা হয়েছে? ALICE এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন জিরো-ডিগ্রি ক্যালোরিমিটার নামের বিশেষ ডিটেক্টর, যা প্রোটন গুনে ফেলতে পারে।
তারা সরাসরি সোনার নিউক্লিয়াস দেখতে পান না, তবে প্রোটনের হিসাব থেকেই তারা বোঝেন যে সোনা তৈরি হয়েছে। গণনা অনুযায়ী, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮৯,০০০টি সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। তারা থেলিয়াম (একটি প্রোটন কম) ও পারদ (দুটি প্রোটন কম) তৈরির ঘটনাও নজরে রাখেন।
যখন একটি সীসার নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন খসে পড়ে, তখন সেটি আর LHC-এর ভ্যাকুয়াম রিংয়ে নিখুঁতভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে না। কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যেই তা দেয়ালে ধাক্কা মারে। এর ফলে কোলাইডারের বিম ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই “সোনার উৎপাদন” বিজ্ঞানীদের কাছে লাভজনক নয়, বরং একটি বিরক্তির কারণ।
ক্রেডিট: Maximillien Brice/CERN
প্রতিবারই যখন LHC-তে সীসার বীম একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন স্বর্ণ তৈরি হয়। তবে ALICE একমাত্র পরীক্ষা যেখানে এই প্রক্রিয়াটি শনাক্ত করার মতো ডিটেক্টর রয়েছে।
নিউ ইয়র্কের স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী জিয়াংইয়ং জিয়া জানান, CERN-এর আরেকটি অ্যাক্সিলারেটর SPS-এ ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সীসা থেকে স্বর্ণে রূপান্তরের প্রমাণ দেখা গিয়েছিল। তবে এই এক্সপেরিমেন্ট বেশি শক্তিতে করায় স্বর্ণ তৈরির সম্ভাবনাও অনেক বেশি, এবং পর্যবেক্ষণগুলোও অনেক পরিষ্কার; যেটা আগে ছিলো না।
CERN-এর গবেষকরা স্বর্ণ তৈরি করে ব্যবসা শুরু করার কোনো পরিকল্পনা করছেন না, তবে তারা বলছেন, ফোটন কীভাবে নিউক্লিয়াস পরিবর্তন করতে পারে তা ভালোভাবে বোঝা গেলে LHC-এর কর্মক্ষমতা আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
এরকম দুর্ঘটনাজনিত আলকেমিকে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের আরও বড় ও জটিল গবেষণাগুলোর ভিত্তি গঠনে সহায়ক হবে।
———
Proton emission in ultraperipheral Pb-Pb collisions at √𝑠𝑁𝑁=5.02 TeV. Phys. Rev. C (2025).
DOI: 10.1103/PhysRevC.111.054906
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



