চীনের সাংহাইয়ের টংজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নাসার স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদরের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছেন। যদিও সামগ্রিকভাবে অ্যান্টার্কটিকায় উল্লেখযোগ্য হারে বরফ হ্রাস পেয়েছে, তবে দেখা গেছে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কিছু বরফ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এটি এই অর্থে নয় যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বা জলবায়ু পরিবর্তন হঠাৎ থেমে গেছে। এটি অনেকটা যেন একটি লম্বা স্কি ঢালের শেষে হালকা একটি উঁচু ঢালের মতো—অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদরের তথ্যকে গ্রাফে ফেলে এমনই একটি চিত্র পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক বরফ বৃদ্ধি পেলেও, তা গত ২০ বছরের বরফ হ্রাসের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার ধারের কাছেও না।
এই বরফ বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বিশেষ ধরনের আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে, যেখানে অ্যান্টার্কটিকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত (তুষার ও কিছুটা বৃষ্টিসহ) হয়েছে, যার ফলে বেশি বরফ জমেছে। তবে এই বরফ বৃদ্ধি ধারা ২০২৪ সালের শুরুতেই কমে এসেছে। নাসার ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বরফের পরিমাণ ২০২০ সালের মতোই রয়েছে।
অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফ স্তূপ। এটি পুরো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বড় এবং পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা Antarctic and Southern Ocean Coalition এর তথ্যমতে এটি বিশ্বের ৯০% বিশুদ্ধ পানি ধারণ করে। অ্যান্টার্কটিকার চারপাশে রয়েছে সামুদ্রিক বরফ (বরফে পরিণত হওয়া সমুদ্রের পানি), যা শীতে বিস্তৃত হয় এবং গ্রীষ্মে উপকূলে সরে আসে।
২০২৫ সালের মার্চ ১৯ তারিখে Science China Earth Sciences জার্নালে প্রকাশিত সর্বশেষ গবেষণাটি নাসার GRACE এবং GRACE Follow-On স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এই স্যাটেলাইটগুলো ২০০২ সাল থেকে অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদর পর্যবেক্ষণ করছে। বরফ গলে গেলে সমুদ্রে পানি যোগ হয়, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ, তাই এই পরিবর্তন জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্যাটেলাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা বরফ হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি এই সময়ের শেষ ভাগে বরফ হ্রাসের গতি বেড়ে গিয়েছিল। ২০০২ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বছরে গড়ে ৮১ বিলিয়ন টন বরফ হারালেও, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় বছরে গড়ে ১৫৭ বিলিয়ন টনে।
তবে এই ধারা ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কিছুটা বদলায়—এই সময়ে প্রতি বছর গড়ে ১১৯ বিলিয়ন টন বরফ বাড়ে। পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার চারটি হিমবাহেও বরফ হ্রাসের পরিবর্তে বরফ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
ক্রেডিট: Science China Press
“এটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়,” বলেন যুক্তরাজ্যের নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী টম স্লেটার, যিনি এই গবেষণায় অংশ নেননি। তিনি জানান, “উষ্ণ জলবায়ুতে বায়ুমণ্ডলে বেশি আর্দ্রতা ধারণ করা সম্ভব, ফলে তীব্র তুষারপাতের সম্ভাবনা বেড়ে যায়—যা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকায় বরফ বৃদ্ধির কারণ হয়েছে।”
২০২৩ সালের একটি গবেষণায় ২০২১-২২ সালের অ্যান্টার্কটিকার অভূতপূর্ব বরফ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। সেই গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়, বেশি বৃষ্টিপাতের কারণেই বরফ বৃদ্ধি ঘটেছে। নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, এই প্রবণতা অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল।
স্লেটার জানান, গবেষকরা মনে করছেন এই বরফ বৃদ্ধি সাময়িক। “অ্যান্টার্কটিকার স্থলভিত্তিক বরফ হ্রাস মূলত অন্যান্য অঞ্চলের হিমবাহ থেকে আসে, যেগুলো গলে গিয়ে উষ্ণ মহাসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে,” তিনি বলেন। “এই প্রক্রিয়া এখনো চলছে—সাম্প্রতিক তুষারপাত সাময়িকভাবে এই ক্ষতি পূরণ করলেও, এটি স্থায়ী কোনো পরিবর্তন নয়।”
জলবায়ু পরিবর্তন মানে এই নয় যে পৃথিবীর সব জায়গা সমান হারে উষ্ণ হবে। একক কোনো অঞ্চল দিয়ে পুরো বৈশ্বিক উষ্ণতার চিত্র বোঝা যায় না। এমনিকেও অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের তুলনায়, যেখানে উষ্ণতা চার গুণ দ্রুত বেড়েছে। সমুদ্র বরফের ক্ষেত্রেও অ্যান্টার্কটিকা আগে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা পরিবর্তন হচ্ছে।
২০২৩ সালে অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্র বরফ রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। একই সময়ে, বৈশ্বিক সমুদ্র বরফের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড সর্বনিম্ন বা তার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে, এবং বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রাও একইভাবে রেকর্ড বা প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে।
২০১৫ সালে বিশ্বনেতারা প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমাবদ্ধ রাখা (সর্বোচ্চ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা এখন হুমকির মুখে—ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৫ ছিল গত ২২ মাসের মধ্যে ২১তম মাস, যেখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম হয়েছে।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



