গুগলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান DeepMind এক নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা AlphaEvolve উদ্ভাবন করেছে, যা গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সৃজনশীল সমাধান দিতে সক্ষম।
এই AlphaEvolve সিস্টেমটি তৈরি করা হয়েছে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)–এর সৃজনশীলতা এবং সেই মডেলের প্রস্তাবিত সমাধানগুলো যাচাই ও উন্নত করতে সক্ষম এমন অ্যালগরিদমের সমন্বয়ে। নতুন এই এআই টুলটি গত ১৪ মে, ২০২৫ এ DeepMind-এর একটি হোয়াইট পেপারে বর্ণনা করা হয়।
জার্মানির এরল্যাঙ্গেনের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের Artificial Scientist Lab–এর প্রধান মারিও ক্রেন বলেন, “এই গবেষণাপত্রটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। আমার মতে, AlphaEvolve-ই প্রথম কার্যকর উদাহরণ, যেখানে সাধারণ উদ্দেশ্যের LLM ব্যবহার করে নতুন কোনো আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।”
শুধু থিয়োরিটিক্যাল সমস্যা নয়, DeepMind ইতোমধ্যেই এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে নিজেদের বাস্তবভিত্তিক ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যা সমাধানে সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান পুশমীত কোহলি।
AlphaEvolve-এর সহায়তায় তারা পরবর্তী প্রজন্মের টেনসর প্রসেসিং ইউনিট (TPU) উন্নত করতে পেরেছে এবং গুগলের বিশ্বব্যাপী কম্পিউটিং ক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপায় বের করেছে, যার ফলে ০.৭% রিসোর্স সাশ্রয় হয়েছে। কোহলি জানান, “এর প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।”
সাধারণ উদ্দেশ্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
গবেষক মারিও ক্রেন জানান, এ পর্যন্ত বিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল প্রয়োগ (যেমন AlphaFold) মূলত নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি এলগরিদমের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু AlphaEvolve একটি জেনারেল-পারপাস এআই, যা LLM-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোড তৈরি করে সমস্যার সমাধান করতে পারে।
DeepMind AlphaEvolve-কে “এজেন্ট” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, কারণ এটি একাধিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে এটি বিজ্ঞান প্রক্রিয়ার সেই অংশে কাজ করে, যেখানে অন্য এজেন্টিক সিস্টেমগুলো সাধারণত তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় বা হাইপোথিসিস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
AlphaEvolve গঠিত হয়েছে গুগলের Gemini LLM এর ওপর ভিত্তি করে। প্রতিটি টাস্ক ব্যবহারকারী একটি প্রশ্ন এবং ইন্সট্রাকশন ইনপুট দিয়ে শুরু হয়, যার জন্য এলএলএম শত শত বা হাজার হাজার পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়। এরপর “ইভালুয়েটর” অ্যালগরিদম এই পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে কোনটি ভালো সমাধান তা নির্ধারণ করে। সেই অনুযায়ী নতুন ও আরও কার্যকর সমাধান উদ্ভাবিত হয়।
গবেষক মাতে বালোচ বলেন, “আমরা এই পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধানের অসংখ্য সম্ভাব্য পথ অনুসন্ধান করি।”
ফানসার্চ
AlphaEvolve-এর ভিত্তি হল ২০২৩ সালে DeepMind-এর তৈরি FunSearch পদ্ধতি, যা মানুষের তুলনায় আরও ভালোভাবে আনসলভড গাণিতিক সমস্যার সমাধান দিতে পেরেছিল। তবে AlphaEvolve বৃহত্তর কোড ও জটিল অ্যালগরিদম সামলাতে সক্ষম, এবং এটি বিজ্ঞানের অনেকগুলো ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগযোগ্য।
DeepMind দাবি করেছে, AlphaEvolve এমন একটি ম্যাট্রিক্স মাল্টিপ্লিকেশন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যা কিছু ক্ষেত্রে ১৯৬৯ সালে ভল্কার স্ট্রাসেনের তৈরি দ্রুততম পদ্ধতির চেয়েও দ্রুত। এটি নিউরাল নেটওয়ার্ক ট্রেইনিং এ ব্যবহৃত হয়। বিস্ময়করভাবে, এই জেনারেল-পারপাস সিস্টেমটি ম্যাট্রিক্স সমস্যার জন্য বিশেষভাবে তৈরি AlphaTensor-এর চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে।
বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত
ক্রেন বলেন, এই পদ্ধতিটি উন্নয়ন, অপ্টিমাইজেশন এবং সিমুলেশন ভিত্তিক যেকোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা যেতে পার। হতে পারে সেটা নতুন ধরনের মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ বা কোনো পদার্থ তৈরি।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক গবেষক সাইমন ফ্রিডার মনে করেন, AlphaEvolve কেবল সেই ধরনের সমস্যাতেই কার্যকর, যেগুলো কোডের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক হুয়ান সান বলেন, DeepMind-এর বাইরে এটি কতটা কার্যকর তা বোঝার আগে, এই সিস্টেমটি বৃহৎ এবং ওপেন পরিসরে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ফ্রিডার জানান, তিনি অপেক্ষা করছেন কবে গবেষকেরা এটির ওপেন সোর্স সংস্করণ তৈরি করবেন।
যদিও AlphaEvolve চালাতে AlphaTensor-এর তুলনায় কম শক্তি লাগে, তবে এটি এখনও এতটাই রিসোর্স-নির্ভর, যে DeepMind এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে পারছে না।
তবুও প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, এই প্রযুক্তি প্রকাশের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিজেদের ক্ষেত্রেও AlphaEvolve ব্যবহার করতে আগ্রহী হবেন। কোহলি বলেন, “আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বেশি মানুষ যেন এর সুবিধা পেতে পারে।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


