একটি ছোট্ট ছেলের খুব জটিল এক জেনেটিক (জন্মগত) রোগ ছিল, কিন্তু এখন সে সুস্থভাবে বড় হচ্ছে। এই শিশুটি হলো পৃথিবীর প্রথম মানুষ, যার জন্য একেবারে আলাদা করে, শুধুমাত্র তার শরীরের জন্য তৈরি একটি বিশেষ জিন-সম্পাদনার চিকিৎসা (CRISPR) দেওয়া হয়েছে। এই CRISPR থেরাপিটি শুধুমাত্র তার নির্দিষ্ট রোগ-সৃষ্টিকারী জেনেটিক মিউটেশন সংশোধনের জন্য তৈরি।
এই শিশুটির নাম কেজে মালডুন। এখন তার বয়স প্রায় দশ মাস, এবং তার বাবা-মা জানাচ্ছেন, সে ভালো আছে। তার শরীরের প্রোটিন প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে মিউটেশনের কারণে, সেটি সারানোর জন্য তাকে তিন ডোজ CRISPR থেরাপি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকেরা এখনই এটাকে সম্পূর্ণ “সুস্থ হয়ে যাওয়া” বলতে নারাজ। তারা বলছেন, এটা এখনো শুরুর দিক, এবং আরও অনেক কিছু শেখার আছে।
এই চিকিৎসা তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও সরকারি সংস্থা মাত্র ছয় মাস সময় নিয়েছে। তবে The New England Journal of Medicine-এ ১৫ মে, ২০২৫ এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এই থেরাপিটি কেবল মালডুনের শরীরের জিন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে, অন্য কারো ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা যাবে না।
গবেষকেরা আশা করছেন, এই ঘটনা ভবিষ্যতে বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত অন্য মানুষদের জন্য নতুন পথ দেখাবে।
CRISPR-ভিত্তিক থেরাপি ইতিমধ্যেই সিকল-সেল অ্যানিমিয়ার মতো জেনেটিক রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে সেসব থেরাপি একই ধরনের রোগে অনেক মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তাদের জেনেটিক পার্থক্য উপেক্ষা করে। কিন্তু মালডুনের ক্ষেত্রে থেরাপিটি তার নির্দিষ্ট জেনেটিক মিউটেশনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।
মালডুন মা-বাবার কাছ থেকে দুটি ভিন্ন মিউটেশন পেয়েছিল, যার ফলে তার শরীর carbamoyl phosphate synthetase 1 (CPS-1) নামের প্রয়োজনীয় একটি এনজাইম তৈরি করতে পারত না। এতে তার শরীরে প্রোটিন ভাঙার সময় উৎপন্ন হওয়া নাইট্রোজেন যৌগ প্রক্রিয়াজাত করতে সমস্যা হতো। ফলে তার রক্তে অ্যামোনিয়া জমে যেত, যা মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত।
এই রোগের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হলো লিভার প্রতিস্থাপন, কিন্তু মালডুন তখনো তা নেওয়ার মতো বড় হয়নি। প্রতিদিন তার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছিল। এরকম CPS-1 ঘাটতি জনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় অর্ধেকই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট পাওয়ার আগেই মারা যায়।
ড. আর্নস-নিকলাস বাচ্চাটির পরিবারকে অন্য একটি পথের প্রস্তাব দেন। তিনি এবং তার দল CRISPR-এর একটি নতুন কৌশল বেস এডিটিং নিয়ে কাজ করছিলেন, যা ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে একক অক্ষরের পরিবর্তন আনতে পারে। তারা ভাবছিলেন, এবার হয়তো মানুষের ওপর এই কৌশল প্রয়োগের সময় এসেছে।
মালডুনের বাবা-মায়ের সম্মতি নিয়ে গবেষকরা এক বিশাল সহযোগী দল গঠন করেন। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেরা বেস এডিটিং পদ্ধতি নির্বাচন করেন এবং সেটি ইঁদুর ও বানরের ওপর পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের প্রযুক্তিগত সাহায্য ও উপাদান দিয়ে সহায়তা করে। মার্কিন FDA এই চিকিৎসার মূল্যায়ন দ্রুত সম্পন্ন করে অনুমোদন দেয়।
মাত্র ছয় মাসেই মালডুন প্রথম ডোজ পায়—যা চিকিৎসকদের মতে একটি বড় সাফল্য। প্রথম ডোজের পর কেজ বয়স অনুযায়ী প্রোটিন খেতে পারছিল, তবে অ্যামোনিয়ার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ দরকার ছিল। দ্বিতীয় ডোজের পর ওষুধ পরিমাণ কিছুটা কমানো হয়, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।
এরপর কেজ তৃতীয় এবং শেষ ডোজ পায়। এখন তার ডাক্তাররা ধীরে ধীরে ওষুধ কমাচ্ছেন।
এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও বিরল রোগের চিকিৎসায় কিভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ জিন থেরাপি এমনকি শত শত মানুষের জন্য তৈরি হলেও, খরচ অত্যন্ত বেশি। আবার এটার সহজ কোনো সমাধানও নেই।
তবে কেজের বাবা-মায়ের জন্য তার বাচ্চা এই চিকিৎসার প্রতিটি অগ্রগতি একেকটা ছোট্ট অলৌকিক ঘটনা। কিছুদিন আগে কেজের মা দেখেন, তার বাচ্চা নিজে নিজে খাটে বসে আছে। তিনি আবেগভরে বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি এমন কিছু দেখতে পাব।”
———
Patient-Specific In Vivo Gene Editing to Treat a Rare Genetic Disease. New England Journal of Medicine (2025).
DOI: 10.1056/NEJMoa2504747
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


