বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পরস্পরের চারপাশে ঘুরতে থাকা দুইটি বাইনারি স্টারের বিবর্তনে একটি ‘হারিয়ে যাওয়া যোগসূত্র’-এর ইঙ্গিত পেয়েছেন। এটি এমন একটি স্টার সিস্টেম, যেখানে পালসার নামের একটি দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন স্টার (একটি বিশাল সুপারনোভার ধ্বংসাবশেষ) তার বড় সঙ্গী নক্ষত্রের ভেতরে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে সেটির বাইরের স্তর ছিঁড়ে ফেলে কেবল কেন্দ্রটি রেখে দেয়।
খুঁজে পাওয়া এই নিউট্রন তারাটি একটি বিরল ‘স্পাইডার পালসার’-এর উদাহরণ। স্পাইডার পালসার হলো একধরনের নিউট্রন তারা, যা খুব দ্রুত ঘোরে এবং তার সঙ্গী তারাটিকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলে। এটি হয় আশপাশের পদার্থ শুষে নেয়ার মাধ্যমে করে, অথবা তীব্র রেডিও তরঙ্গ নির্গত করার মাধ্যমে। গত ২২ মে, ২০২৫ তারিখে Science জার্নালে প্রকাশিত এই আবিষ্কারটি ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে এমন সব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজার্ভেটরিতে ধরা পড়া অসাধারণ সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটে — যার মধ্যে দুইটি নিউট্রন তারা, দুইটি ব্ল্যাক হোল, কিংবা একটি নিউট্রন তারা ও একটি ব্ল্যাক হোল জড়িত থাকতে পারে।
বেইজিংয়ের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিজ-এর প্রধান রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিন-লিন হান বলেন যে, এই পালসারটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কারণ এটি যে রেডিও সংকেত পাঠায় তা থেকে বোঝা যায় যে এটি প্রতি ৩.৫ ঘণ্টায় একবার সঙ্গী তারাকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু এই সময়ের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ সময় সেটি অদৃশ্য থাকে, যা ইঙ্গিত দেয় যে সঙ্গী তারাটি সম্ভবত গ্যালাক্টিক ধূলিকণায় আচ্ছাদিত। যা ইঙ্গিত দেয় এর ধ্বংস হবার প্রক্রিয়াকে
হান ও তার সহকর্মীরা এই তারাটিকে চার বছর ছয় মাস ধরে বারবার পর্যবেক্ষণ করেন — যার মধ্যে তিনটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সম্পূর্ণ কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ করেছিল। তারা দক্ষিণ চীনের গুইঝো প্রদেশে অবস্থিত ফাইভ-হানড্রেড-মিটার অ্যাপারচার স্ফেরিক্যাল রেডিও টেলিস্কোপ (FAST) ব্যবহার করেন — যা এখন পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ।
গবেষকেরা হিসাব করে দেখান, সঙ্গী তারাটির ভর সূর্যের চেয়ে ১ থেকে ১.৬ গুণ বেশি — কিন্তু তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটি একটি সাধারণ তারা হতে পারে না, যেমন আমাদের সূর্য, কারণ এটির কক্ষপথ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যেহেতু পালসারটি মাঝে মাঝে আড়াল হয়ে যায়, তাই সঙ্গী তারা খুব বেশি সঙ্কুচিতও হতে পারে না — অর্থাৎ এটি অন্য কোনো নিউট্রন তারা, ব্ল্যাক হোল বা হোয়াইট ডোয়ার্ফ নয়।
তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সঙ্গী তারাটি একটি হিলিয়াম তারা — যার বাইরের হাইড্রোজেন স্তর ইতোমধ্যেই ছিঁড়ে গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে এই ব্যবস্থা একটি ‘কমন এনভেলপ’ পর্যায় অতিক্রম করেছে: অর্থাৎ সঙ্গী তারাটি বয়সে বৃদ্ধ হয়ে এতটাই ফুলে উঠেছিল যে সেটি নিউট্রন তারাটিকে গ্রাস করে ফেলে। এরপর নিউট্রন তারাটি কয়েক হাজার বছর এই বাইরের স্তরের ভিতরে অবস্থান করে, এবং তার রশ্মির মাধ্যমে সেই স্তরটিকে ধীরে ধীরে মহাকাশে উড়িয়ে দেয়। মনে করা হয় এই ধরনের ‘কমন এনভেলপ’ পর্যায় বাইনারি স্টারদের কক্ষপথ এতটাই সংকুচিত করে দেয় যে তারা অভিকর্ষীয় তরঙ্গ নির্গত করতে শুরু করে — যা কক্ষপথ আরও সংকুচিত করে, যতক্ষণ না তারা একত্রে মিশে যায়।
‘স্পাইডার পালসার’-এর নামকরণ করা হয়েছে স্ত্রী মাকড়সার অনুকরণে, যারা সঙ্গমের পর পুরুষ মাকড়সাকে খেয়ে ফেলে। এই নামগুলো নির্ভর করে সঙ্গী তারাটির ধরনের ওপর — যেমন ‘ব্ল্যাক উইডো’ বা ‘রেডব্যাক’। এটি প্রথম ‘স্পাইডার পালসার’, যার সঙ্গী একটি হিলিয়াম তারা। “জ্যোতির্বিদদের হয়তো এখন একটি উপযুক্ত নাম খুঁজে পেতে মাকড়সা বিশেষজ্ঞদের (অ্যরাকনোলজিস্ট) শরণাপন্ন হতে হতে পারে,” বলেন সেলমা ডে মিনক, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, গারচিং, জার্মানির একজন তাত্ত্বিক জ্যোতির্পদার্থবিদ।
———
A pulsar-helium star compact binary system formed by common envelope evolution. Science (2025).
DOI:10.1126/science.ado0769
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


