একসময়, যখন স্পেস এজ বা মহাকাশ যুগ সবে শুরু হয়েছিল, পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছিল হাতে গোনা কয়েকটা স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ। আর এখন, মাত্র ৭০ বছরের ব্যবধানে, হাজার হাজার উপগ্রহ পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে — আর প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন উপগ্রহ মহাকাশে ছোড়া হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ঠিক কতগুলো কৃত্রিম উপগ্রহ এখন পৃথিবীর কক্ষপথে আছে? ভবিষ্যতে আর কতগুলো যোগ হতে পারে? আর এত এত উপগ্রহ একসঙ্গে থাকলে কী ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে?
অনেক দশক ধরে প্রতি বছর মহাকাশে যত উপগ্রহ পাঠানো হতো, সেই সংখ্যাটা বেশ স্থিরই ছিল। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক’ মহাকাশে পাঠানোর পর থেকে প্রতি বছর গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হতো। এই ধারা চলেছে ২০১০ সালের কাছাকাছি পর্যন্ত। এরপর যখন স্পেসএক্স-এর মতো বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলো সক্রিয় হতে শুরু করে, তখন থেকেই উৎক্ষেপণের সংখ্যা বাড়তে থাকে। The Space Report এর প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি ৩৪ ঘণ্টায় একটি রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, যা দিয়ে মোট ২,৮০০-এর বেশি কৃত্রিম উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে।
কৃত্রিম উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানোর এই দ্রুতগতিতে বৃদ্ধির পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, এখন মহাকাশে উপগ্রহ পাঠানো আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ ২০২৫ এর ১৪ জানুয়ারি ইউটিউবার মার্ক রোবার তার স্পেস সেলফি প্রজেক্টের স্যাটেলাইট SAT GUS* উৎক্ষেপন করে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে।
দ্বিতীয় কারণ হলো, এখন রকেট আগের চেয়ে সহজে এবং সস্তায় অনেক বেশি সংখ্যক কৃত্রিম উপগ্রহ বহন করতে পারে। এই বৃদ্ধি রকেটের শক্তি বেড়ে যাওয়ার কারণে নয়; বরং এর পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে ইলেকট্রনিক্স বিপ্লব, যার ফলে উপগ্রহগুলো আকারে অনেক ছোট হয়ে গেছে। ২০২০ সালে উৎক্ষেপণ করা সব মহাকাশযানের মধ্যে ৯৪ শতাংশই ছিল স্মলস্যাট – অর্থাৎ এমন উপগ্রহ যাদের ওজন প্রায় ৬০০ কেজিরও কম।
২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১১,৭০০টি সক্রিয় উপগ্রহ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। এর বেশিরভাগই পৃথিবীর খুব কাছের ‘লো-আর্থ অরবিটে’ (LEO) — মানে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ২,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে। এই তথ্য দিয়েছেন হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোনাথন ম্যাকডাওয়েল, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে উপগ্রহের গতিবিধি নজরদারি করছেন।
তবে সব উপগ্রহই যে এখন কাজ করছে এমন নয়। অনেক উপগ্রহ ইতিমধ্যেই অকেজো হয়ে গেছে, কিছু এখনো কক্ষপথে পড়ে আছে, কিছু আবার সরিয়ে “গ্রেভইয়ার্ড অরবিটে” পাঠানো হয়েছে। জাতিসংঘের মহাকাশ বিষয়ক দপ্তর United Nations’ Office for Outer Space Affairs-এর তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় মিলিয়ে উপগ্রহের সংখ্যা হতে পারে প্রায় ১৪,৯০০টি — যদিও এটা ঠিকভাবে গণনা করা কঠিন।
এটাই কেবল শুরু। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভবিষ্যতে সক্রিয় উপগ্রহের সংখ্যা ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর তা হলে জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাকাশ অনুসন্ধান ও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যারন বোলি বলেন, “এত উপগ্রহ থাকার ফলে মহাকাশে ট্রাফিকের সমস্যা তৈরি হচ্ছে, মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণ বাড়ছে, জ্যোতির্বিজ্ঞান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আর রকেট উৎক্ষেপণ ও পুনঃপ্রবেশের সময় বায়ুমণ্ডলে দূষণ ছড়াচ্ছে। এই প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে, সেটা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।”
ক্রেডিট: Edwin Aguirre/University of Massachusetts Lowell
উপগ্রহের এই বৃদ্ধির বিস্ফোরন মূলত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর তৈরি “মেগাকনস্টেলেশন” বা বিশাল উপগ্রহ ঝাঁকের কারণে। যেমন স্পেসএক্স-এর “স্টারলিংক” প্রকল্প, যা সারা পৃথিবীতে ইন্টারনেট পরিষেবা দিতে তৈরি করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর কক্ষপথে রয়েছে প্রায় ৭,৪০০টি সক্রিয় স্টারলিংক উপগ্রহ — যা মোট সক্রিয় উপগ্রহের ৬০ শতাংশের বেশি। এই সবকটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে ২০১৯ সালের মে মাসের পর থেকে।
স্পেসএক্স এই দৌড়ে সবার আগে থাকলেও, পিছিয়ে নেই অন্যরা। ইউরোপের ইউটেলস্যাট-এর “ওয়ানওয়েব”, AST-এর “স্পেসমোবাইল”, অ্যামাজনের “প্রজেক্ট কুইপার” এবং চীনের “থাউজেন্ড সেলস” এর মতো প্রকল্পগুলোও বেশ ভালোমতোই চলছে।
সঠিকভাবে অনুমান করা কঠিন যে, কতগুলো উপগ্রহ ভবিষ্যতে উৎক্ষেপণ হবে। তবে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতে পারেন, পৃথিবীর কক্ষপথে নিরাপদে সর্বোচ্চ কতগুলো উপগ্রহ থাকতে পারে। এটাকে বলা হয় “ক্যারিং ক্যাপাসিটি” বা ধারণক্ষমতা।
ম্যাকডাওয়েল, বোলি এবং আরও কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীর মতে, লো-আর্থ অরবিটের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ১,০০,০০০ সক্রিয় উপগ্রহ হতে পারে। এরপর নতুন উপগ্রহ উৎক্ষেপণ হলে, তা শুধু পুরনো ও অকেজো উপগ্রহের জায়গা নেবে।
এই সীমা কখন পৌঁছাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বর্তমান হারে যদি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ চলতে থাকে, তাহলে ২০৫০ সালের আগেই এই সীমায় পৌঁছে যেতে পারে।
এত উপগ্রহ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরাফেরা করলে একাধিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। একটি বড় সমস্যা হলো “স্পেস জাঙ্ক” বা মহাকাশে আবর্জনা। অনেক রকেট আংশিকভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হলেও, লো-আর্থ অরবিটে পড়ে থাকা রকেটের বুস্টারগুলো বছরের পর বছর ধরে ঘুরে বেড়াতে পারে। যদি এসব আবর্জনা একে অপরের সাথে বা কোনো উপগ্রহ বা মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তাহলে হাজার হাজার ছোট টুকরো তৈরি হতে পারে — যা ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি করে।
এই সমস্যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন “কেসলার সিনড্রোম” — যেখানে একটার পর একটা ধাক্কায় এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যাতে লো-আর্থ অরবিট পুরোপুরি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যায়।
উপগ্রহগুলো পৃথিবীর দিকে আলো প্রতিফলিত করে, যা জ্যোতির্বিদদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করে। অনেক সময় দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তু দেখার সময়, উপগ্রহের আলো টেলিস্কোপের ছবিতে লম্বা রেখা তৈরি করে দেয়।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে “রেডিও দূষণ”। যেমন, স্টারলিংক উপগ্রহ থেকে নির্গত বিকিরণ রেডিও টেলিস্কোপে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। যদি ভবিষ্যতে উপগ্রহের সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়, তাহলে কিছু ধরনের রেডিও সংকেত সংশ্লিষ্ট গবেষণা একেবারেই সম্ভব হবে না।
রকেট উৎক্ষেপণের সময় বায়ুমণ্ডলে অনেক পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়ায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। একটা রকেট উৎক্ষেপণে যত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, তা গড়ে একটি যাত্রীবাহী বিমানের ১০ গুণের মতো।
আরো একটি আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যখন পুরনো উপগ্রহগুলো বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পুড়ে যায়, তখন সেগুলো অনেক পরিমাণে ধাতব কণা বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। কিছু গবেষক বলছেন, যদি এভাবে প্রচুর উপগ্রহ পুড়ে যায়, তাহলে তা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে — যার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ।
হ্যাঁ, এসব বেসরকারি উপগ্রহ দিয়ে বিশ্বের দূরবর্তী বা সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে ইন্টারনেট পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলছেন — এই উপকারগুলো কি ভবিষ্যতের ভয়াবহ ঝুঁকির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে একমত যে, এখনই আমাদের উৎক্ষেপণের গতি কমিয়ে, পুরো পরিস্থিতি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
অ্যারন বোলি বলেন, “উপগ্রহ উৎক্ষেপণ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে যতক্ষণ না পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে ভালো কোনো নিয়ম-কানুন তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ ধীর গতিতে এগোনোটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



