নিয়ানডার্থালদের বিলুপ্তি নিয়ে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলছে। এর মূল কারণ হলো তাদের অস্তিত্ব ও হঠাৎ বিলুপ্তির পেছনের প্রকৃত কারণগুলো আজও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল, ‘Science Advance’ জার্নালে প্রকাশিত তাদের এক গবেষণায় দাবি করেছে, নিয়ানডার্থালরা মহাজাগতিক কারণে বিলুপ্ত হয়েছিল।
গবেষণাটি নেতৃত্ব দেন স্পেস ফিজিক্সের বিশেষজ্ঞ অগ্নি মুখোপাধ্যায়। স্পেস ফিজিক্স হচ্ছে এমন একটি শাখা যা মহাকাশের প্রাকৃতিক প্লাজমা (পদার্থের একটি অবস্থা) নিয়ে কাজ করে, যেমন আমাদের সৌরজগতের ভেতরের প্লাজমা। উল্লেখ্য, সূর্য ও নক্ষত্রগুলোর মতো মহাবিশ্বের বেশিরভাগ বস্তুই প্লাজমা দিয়ে তৈরি।
ক্রেডিট: Agnit Mukhopadhyay/University of Michigan/Science Advance
মুখোপাধ্যায়ের মতে, আজ থেকে প্রায় ৪১,০০০ বছর আগে পৃথিবীর চৌম্বক মেরুর হঠাৎ স্থানান্তর (যাকে বলা হয় ল্যাশঁপ ইভেন্ট) নিয়ানডার্থালদের বিলুপ্তির পেছনে বড় কারণ হতে পারে।
এই ঘটনায় পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে মহাজাগতিক রশ্মি ও অতিবেগুনি বিকিরণ অনেক বেশি পরিমাণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে। এর ফলে একপ্রকার ‘বিরুপ’ পরিবেশ তৈরি হয়, যা নিয়ানডার্থালরা সহ্য করতে পারেনি। আর সেই সুযোগেই আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হয়।
হোমো স্যাপিয়েন্সের সুবিধা কোথায় ছিল?
গবেষণায় বলা হয়েছে, হোমো স্যাপিয়েন্সরা সম্ভবত গা-লেগে থাকা পোশাক পরত, রোদ থেকে রক্ষার জন্য ওখার (এক ধরনের খনিজ পদার্থ) ব্যবহার করত, এবং গুহায় আশ্রয় নিত। এসব কারণে তারা অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতি থেকে বাঁচতে পেরেছিল। অবশ্য গুহা, নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্স; দু’দলই একসঙ্গে ব্যবহার করতো।
এই গবেষণাটি ত্রি-মাত্রিক ভূ-স্থানিক মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি। তবে একটি মাত্র ভেরিয়েবলের ওপর ভিত্তি করে এত জটিল একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত টানা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।
ক্রেডিট: Agnit Mukhopadhyay/University of Michigan
ঘন পোশাক ও সেলাই সুচ
এই তত্ত্বের একটি মূল ভিত্তি হলো—নিয়ানডার্থালরা গা-লেগে থাকা পোশাক পরত না, তাই তারা অতিরিক্ত সূর্যরশ্মির শিকার হতো।
এটা সত্যি যে, নিয়ানডার্থালদের সঙ্গে সেলাই সুচ (sewing needle) সরাসরি যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। ইউরেশিয়ায় প্রথম সুচের খোঁজ মিলেছে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগের, যা ডেনিসোভান বা স্যাপিয়েন্সদের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিম ইউরোপে এগুলো এসেছে আরও পরে, প্রায় ২৩,০০০ বছর আগে।
তবে, সুচ না থাকার মানে এই নয় যে নিয়ানডার্থালরা পোশাক পরত না। বরং, হোমো স্যাপিয়েন্সরাও অনেক ঠান্ডা সময়ে (যেমন হাইনরিখ ৪ ইভেন্ট, প্রায় ৩৯,৬০০ বছর আগে) সেলাই সুচ ছাড়াই পোশাক বানিয়েছিল।
আর্কিওলজিকাল প্রমাণ অনুযায়ী, নিয়ান্ডারথালরা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করত; তাদের ব্যবহৃত স্ক্র্যাপার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সেটা প্রমাণ করে। তাই ধরে নেওয়া যায়, তারা চামড়া দিয়ে পোশাক, জুতা বা তাঁবুর মতো কিছু তৈরি করতে পারত। সুচ না থাকলেও চামড়া বাঁধার জন্য হাড়ের খুঁটি বা দড়ির মতো বিকল্প ব্যবহার সম্ভব ছিল।
তবে পশম বা পোশাক ব্যবহারের ইতিহাস আরও অনেক পুরোনো। আসলে, বডি লিচ জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ অন্তত ২,০০,০০০ বছর আগে থেকেই পোশাক পরা শুরু করেছিল।
তার ওপর, ইউরোপের মতো ঠান্ডা অঞ্চলে, যেখানে নিয়ানডার্থালরা বাস করত, শরীর আচ্ছাদন ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভবই হতো না। তারা যদি সূচ ব্যবহার না-ও করে থাকে, তবুও খুব সম্ভবত তারা দড়ি বা হাড়ের টুকরোর মতো বিকল্প পদ্ধতিতে পশুর চামড়া শরীরের সঙ্গে মানিয়ে নিত। তাই সূচ না থাকাকে কার্যকরী পোশাকের অনুপস্থিতি ভাবা ঠিক নয়।
প্রাগৈতিহাসিক সানস্ক্রিন: ওখার ব্যবহার
গবেষণাটি বলছে, হোমো স্যাপিয়েন্সরা ওখার ব্যবহার করত সূর্যের রশ্মি থেকে রক্ষার জন্য।
যদিও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ওখার মধ্যে UV রশ্মি ঠেকানোর ক্ষমতা থাকতে পারে, তবে এটি শুধুই স্যাপিয়েন্সদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে আফ্রিকা, নিকটপ্রাচ্য ও আইবেরিয়ান উপদ্বীপে বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর মধ্যে রঙ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
নিয়ানডার্থালদের ওখার ব্যবহার প্রায় ১,০০,০০০ বছর আগের ইউরোপ ও লেভান্ত অঞ্চল থেকে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের এই ব্যবহার ছিল বহুবিধ— ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো প্রতীকী, চিকিৎসা, প্রসাধনী, ক্ষত সারানো কিংবা পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য।
ক্রেডিট: João Zilhão
তাই শুধু স্যাপিয়েন্সদের ক্ষেত্রেই এটা সুরক্ষামূলক ব্যবহার ছিল বলে ধরা সঠিক হবে না। আর এটা যে সানস্ক্রিন হিসেবেই ব্যবহৃত হতো, সেটাও নিশ্চিত নয়।
সংখ্যায় কম ছিল নিয়ান্ডারথালরা
নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে তাদের জনসংখ্যার তুলনামূলক স্বল্পতা। তারা সংখ্যায় কম ছিল, আর স্যাপিয়েন্সরা বেশি। ফলে নিয়ান্ডারথালরা ধীরে ধীরে আধুনিক মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়।
এই ধারণাটি জেনেটিক গবেষণায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। আধুনিক মানুষের ডিএনএ-তে নিয়ান্ডারথালদের অংশ রয়েছে—যা প্রমাণ করে, তারা একেবারে বিলুপ্ত না হয়ে বিবর্তনের ধারায় মিশে গেছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও স্যাপিয়েন্সরা এগিয়ে ছিল। নিয়ান্ডারথালদের দূর থেকে আক্রমণের অস্ত্র ছিল না, যেখানে স্যাপিয়েন্সরা প্রজেক্টাইল (নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র) ব্যবহার করত, যা তাদের শিকার ও অভিযোজনের ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব
মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, সূর্যের অতিরিক্ত রশ্মি ও পৃথিবীর চৌম্বকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়ান্ডারথাল বিলুপ্তির সরাসরি সম্পর্ক টানা হলেও এর পক্ষে শক্ত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।
ল্যাশঁপ ইভেন্ট চলাকালীন হঠাৎ জনসংখ্যা ধসে পড়েছে—এমন কোনো নিদর্শন নেই। এই সময়ে অন্য মানব ও প্রাণী প্রজাতির মধ্যেও কোনো ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রমাণ মেলেনি।
তদুপরি, যদি অতিবেগুনি রশ্মিই প্রধান কারণ হতো, তবে আফ্রিকার উষ্ণ অঞ্চলের স্যাপিয়েন্সদের মাঝেও বড় আকারের মৃত্যু হতো, যাদের অনেকেই গা-লেগে থাকা পোশাক পরত না কিংবা গুহায় থাকত না। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেছে বলে জানা যায় না।
নিয়ান্ডারথালদের হঠাৎ ‘বিলুপ্তি’ বুঝতে হলে, আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃবিজ্ঞান ও জেনেটিক নানা দিক একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তারা কেবল প্রযুক্তির দীনতা বা পরিবেশের শিকার ছিল না। বরং, তারা ছিল অভিযোজিত ও সাংস্কৃতিকভাবে জটিল এক মানব প্রজাতি, যারা ৩ লাখ বছরেরও বেশি সময় ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে ছিল—যেমন ১,২০,০০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ব্লেক ইভেন্টের সময়।
তারা জটিল সরঞ্জাম বানাতে পারত, বিশাল অঞ্চল দখলে রেখেছিল, এবং বহু দিক থেকে আমাদের আধুনিক প্রজাতির সঙ্গে তাদের মিল ছিল, যা আগে ভাবা হতো না।
তাই, পৃথিবীর চৌম্বক মেরুর উল্টেপড়া কি নিয়ান্ডারথালদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল? উত্তর সম্ভবত—না।
———
Wandering of the auroral oval 41,000 years ago. Sci. Adv. (2025)
DOI: 10.1126/sciadv.adq7275
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।





