মানুষসহ সকল স্তন্যপায়ী প্রাণী সাধারণত মা ও বাবার কাছ থেকে পাওয়া দুটি জিনগত অবদান নিয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক চমকপ্রদ গবেষণায় চীনের শাংহাই জিয়াও তং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো শুধুমাত্র পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত দুটি শুক্রাণুর জিন ব্যবহার করে সফলভাবে পূর্ণাঙ্গ, সুস্থ এবং প্রজননক্ষম পুরুষ ইঁদুর তৈরি করেছেন। এই গবেষণাটি অ্যান্ড্রোজেনেসিস, অর্থাৎ শুধুমাত্র পুরুষ প্রাণীর জিনগত উপাদান ব্যবহার করে যৌনবিহীন প্রজননের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সাফল্য।
আমরা আগেও ল্যাবে ইঁদুরের ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রোজেনেসিস সফল হতে দেখেছি: চলতি বছরের শুরুতে গবেষকরা দু’টি পুরুষের জিনগত উপাদান ব্যবহার করে ইঁদুর তৈরি করতে পেরেছিলেন, যেখানে ডিম্বাণুতে মায়ের জিন ছিল না। তবে সেই ইঁদুরের বাচ্চাগুলো বন্ধ্যা ছিল এবং প্রজনন করতে সক্ষম হয়নি।
গবেষকরা এটাও দেখিয়েছেন, কেন একমাত্র পিতামাতার জিনযুক্ত (অর্থাৎ অ্যান্ড্রোজেনেটিক) স্তন্যপায়ী ভ্রূণ স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না, এবং সেই বাধা কীভাবে অতিক্রম করা সম্ভব। মূল বাধাটি হলো জিনোমিক ইমপ্রিন্টিং নামক এক ধরনের উপযুক্ত জিন সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তার ছাঁচ, যা একটি জিন মায়ের দিক থেকে এসেছে না বাবার দিক থেকে, তার উপর নির্ভর করে।
এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে বিজ্ঞানীরা সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ইমপ্রিন্টিং কন্ট্রোল রিজিয়ন (ICRs) এর নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে DNA মিথাইলেশন (methylation) সম্পাদনার মাধ্যমে জিনের সক্রিয়তা নির্ধারণ করেছেন। অত্যাধুনিক CRISPR ভিত্তিক এপিজেনেটিক এডিটিং পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁরা একাধিক ICR–এ জিনগত ছাপ ঠিক করেছেন, যেন শুধু পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত জিন দিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর বিকাশ সম্ভব হয়।
এই পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দুটি পৃথক শুক্রাণু থেকে নেওয়া জিন একত্র করে মায়ের ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস বাদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করেন। এরপর সংশোধিত ভ্রূণগুলোকে একটি প্রতিস্থাপিত মা ইঁদুরের গর্ভে প্রতিস্থাপন করে দেখা যায়, কয়েকটি ইঁদুর পূর্ণ বয়সে পৌঁছেছে এবং এমনকি প্রজননক্ষমও হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব ভ্রূণই সঠিকভাবে বিকশিত হয়নি; অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু হয়েছে গর্ভকালীন শেষভাগে। এটি বোঝায় যে, জিনোমিক ইমপ্রিন্টিং-এর নিখুঁত সামঞ্জস্য না থাকলে বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তবে যে দুটি পুরুষ ইঁদুর বেঁচে থাকে, তাদের সব সাতটি ICR–এ উপযুক্ত মিথাইলেশন ছিল এবং তারা স্বাভাবিকভাবে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে।
এই গবেষণা একদিকে যেমন স্তন্যপায়ী জীবনে একক পিতৃত্ব দিয়ে প্রজননের দ্বার উন্মোচন করল, তেমনই জিন-সম্পাদনার মাধ্যমে উন্নত প্রজনন প্রযুক্তি, জিনগত রোগ নিরাময় এবং স্টেম সেল থেরাপিতে বিপ্লবের সম্ভাবনা সৃষ্টি করল।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন—এই প্রযুক্তি এখনো নিখুঁত নয়, এবং মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীতে প্রয়োগের আগে আরও গবেষণা ও নৈতিক চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
———
Fertile androgenetic mice generated by targeted epigenetic editing of imprinting control regions, Proceedings of the National Academy of Sciences (2025).
DOI: 10.1073/pnas.2425307122
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


