যখনই মানুষ “ইউরেনিয়াম” শব্দটা শোনে, অনেকের মাথায় প্রথমেই ভেসে ওঠে হিরোশিমা নাগাসাকির কথা, পারমাণবিক বিস্ফোরণের মাশরুম আকৃতির মেঘ, কোল্ড ওয়ারের উত্তেজনা, বা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সবুজ আলোতে জ্বলা রডের ছবি। কিন্তু ইউরেনিয়াম শুধু ভয় বা ধ্বংসের জ্বালানিই নয়, এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান, যা আধুনিক জ্বালানি, চিকিৎসা মতোর বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০২৫ সালের জুন মাসে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি স্থানে সামরিক হামলা চালায়, যেগুলোতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকার সন্দেহ ছিল। এই ঘটনা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের (nuclear proliferation) আশঙ্কা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা উস্কে দেয়। বহু সংবাদে উঠে আসে যে, ইরান ৬০% ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু এই “৬০% সমৃদ্ধি” আসলে কী বোঝায়? সেটাই আমার আজকে জানবো।
ইউরেনিয়াম কী?
পারমাণবিক পর্যায় সারণিতে ইউরেনিয়ামের অবস্থান ৯২ নম্বরে। এটি একটি তেজস্ক্রিয় ধাতব মৌল। তেজস্ক্রিয়তা হলো এমন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে কিছু পরমাণু (যেমন ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম বা রেডিয়াম) নিজের থেকেই ভেঙে যায় এবং শক্তি নিঃসরণ করে।
১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হেনরিখ ক্ল্যাপরথ প্রথম ইউরেনিয়াম আবিষ্কার করেন। তিনি নতুন আবিষ্কৃত গ্রহ ইউরেনাস-এর নামে এর নামকরণ করেন। তবে ইউরেনিয়ামের প্রকৃত শক্তি জানা যায় ২০ শতকে, যখন বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, ইউরেনিয়ামের পরমাণু নিউক্লিয়ার ফিশান (nuclear fission) প্রক্রিয়ায় ভেঙে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। এই বিভাজনে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস এক বা একাধিক অংশে ভাগ হয়ে যায় এবং সেইসাথে প্রচুর শক্তি ছড়িয়ে পড়ে।
ইউরেনিয়াম পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে – মাটি, পাথর, পানি, এমনকি গাছপালা ও প্রাণীতেও (অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে)। বেশিরভাগ ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় পৃথিবীর ভূত্বকে। সেখান থেকে এটি উত্তোলন করে এর সবচেয়ে কার্যকর তেজস্ক্রিয় রূপ (ইউরেনিয়াম-২৩৫) বেশি পরিমাণে পাওয়ার জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে ইনরিচমেন্ট বা সমৃদ্ধিকরণ বলা হয়।
সমৃদ্ধিকরণের জটিলতা
ইউরেনিয়াম-২৩৫ হলো ইউরেনিয়ামের একটি আইসোটোপ। অর্থাৎ, এটি একই মৌল, তবে এর ভর একটু বেশি বা কম। একে ভাবুন গাছে ফলা তরমজের মতো, সবগুলোই তরমুজ, কিন্তু ওজনে একটু কমবেশি। সেইভাবে, একটি মৌলের বিভিন্ন আইসোটোপ মানে একই মৌলিক পরিচয়, শুধু ভর আলাদা।
প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ইউরেনিয়ামের বেশিরভাগ অংশই ইউরেনিয়াম-২৩৮, আর মাত্র ০.৭% থাকে ইউরেনিয়াম-২৩৫। এই ইউরেনিয়াম-২৩৫ মূলত নিউক্লিয়ার ফিশানের জন্য প্রয়োজনীয়। তাই ইউরেনিয়ামকে “সমৃদ্ধ” করা হয় – অর্থাৎ ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানো হয়।
সমৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক চুল্লি বা অস্ত্র তৈরির জন্য আরও উপযোগী করা যায়, কারণ প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ এতটাই কম থাকে যে তা নিউক্লিয়ার চুল্লি বা অস্ত্রে ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। এই সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া তিন ধাপে হয়ে থাকে:
প্রথমে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয় – যেটাকে বলা হয় ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড। এরপর এই গ্যাস প্রবাহিত করা হয় “সেন্ট্রিফিউজ” নামে এক ধরনের যন্ত্রের মধ্যে, যা অত্যন্ত দ্রুত ঘোরে। ইউরেনিয়াম-২৩৫ অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়ায় এটি ধীরে ঘুরে বাইরের দিকে যায়, আর ইউরেনিয়াম-২৩৮ অপেক্ষাকৃত ভারী হওয়ায় আলাদা হয়ে যায়। এইভাবে একবার ঘুরালেই যথেষ্ট হয় না – বহু সেন্ট্রিফিউজের মধ্য দিয়ে বারবার ঘুরিয়ে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর ঘনত্ব ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়।
৩% থেকে ৫% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম-২৩৫ থাকলে এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার উপযোগী হয়। এটিকে বলা হয় “নিম্নমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম”। ২০% বা তার বেশি হলে সেটিকে “উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম” বলা হয়। আর ৯০% বা তার বেশি হলে সেটি অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা পারমাণবিক বোমায় ব্যবহৃত হয়।
ক্রেডিট: Fastfission/Wikimedia Commons
এই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম দ্রুত, নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক বিক্রিয়াতে লিপ্ত হয় এবং তা তুলমূলক বেশি সময় টিকিয়ে রাখতে পারে, যার ফলে হঠাৎ প্রচুর শক্তি নির্গত হয়, যা মূলত পারমাণবিক বিস্ফোরণের মূল কারণ।
ইউরেনিয়ামের বহুমুখী ক্ষমতা
বেশিরভাগ খবর ইউরেনিয়ামের সামরিক দিক নিয়ে কথা বললেও, এই মৌলটি আধুনিক জীবনে নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অল্পমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আজ বিশ্বজুড়ে উৎপন্ন মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০% যোগান দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ তৈরি করে। এছাড়াও, ক্যান্সার চিকিৎসা ও বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত ইমেজিং প্রযুক্তিতেও ইউরেনিয়ামের ব্যবহার রয়েছে।
ক্রেডিট: Jusujon1980/Wikimedia Commons
নৌবাহিনীতে, ইউরেনিয়াম-চালিত সাবমেরিন ও বিমানবাহী জাহাজগুলো ইউরেনিয়ামের শক্তির ওপর নির্ভর করে বহু বছর ধরে নীরবে ও দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারে।
ইউরেনিয়াম এক দ্বৈততার প্রতীক – এটি এমন এক খনিজ যা প্রাচীন শিলা থেকে উত্তোলন করে শহরকে আলোকিত করতে পারে, আবার ইচ্ছা করলে শহর ধ্বংসও করতে পারে। এটি শুধু কোল্ড ওয়ারের অতীত স্মৃতি বা সায়েন্স ফিকশনের কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাস্তব, এটি শক্তিশালী, এবং এটি আজকের পৃথিবীকে নানা দিক থেকে প্রভাবিত করছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে কূটনীতি পর্যন্ত।
সবশেষে, প্রকৃত শক্তি ইউরেনিয়ামে নয় – বরং মানুষ এটিকে কীভাবে ব্যবহার করে, সেখানেই মূল প্রশ্ন।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।




