বিজ্ঞানী গুস্টাফ কিরশফ ১৮৬০ সালে এক ঐতিহাসিক সূত্র প্রস্তাব করেছিলেন। তার সুত্র বলে, একটি পদার্থ যতটা তাপ শোষণ করে, ঠিক ততটাই নির্গত করে। এই সূত্র (যেটিকে আমরা কিরশফের তাপ বিকিরণ সূত্র হিসেবে জানি) বিগত দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাপগতিবিদ্যার একটি ভিত্তিরূপে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি এমন এক প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, যা এই সূত্রের মূলে আঘাত হেনেছে এবং সেটাও অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে।
ক্রেডিট: Caleb Craig/Penn State
এই যুগান্তকারী গবেষণার একজন গবেষক হলেন বাংলাদেশের প্রমিত ঘোষ, যিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে বর্তমানে পেন স্টেটে পিএইচডি করছেন।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বিশেষভাবে তৈরি পাতলা পদার্থ চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে এমনভাবে তাপ বিকিরণ করতে পারে যাতে তার নির্গত এবং শোষিত তাপের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এটি কিরশফের সূত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম যা আগের সব গবেষণাকে ছাপিয়ে গেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক পদার্থবিজ্ঞান জার্নাল Physical Review Letters-এ।
গবেষকরা একটি “গ্রেডিয়েন্ট-ডোপড” ইনডিয়াম গ্যালিয়াম আর্সেনাইড (InGaAs) নামক আধা-পরিবাহী পদার্থের পাঁচটি স্তর নিয়ে গঠিত এক বিশেষ পাতলা ফিল্ম তৈরি করেন। প্রতিটি স্তরের বৈদ্যুতিক ধর্ম ভিন্নভাবে সাজানো হয় যাতে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে তাপ বিকিরণের অনুরণন সৃষ্টি হয়। এই ফিল্মটি একটি স্বর্ণপাতের ওপর স্থাপন করা হয় এবং এর পুরুত্ব ছিল মাত্র দুই মাইক্রোমিটার—একটি মানুষের চুল থেকেও পাতলা।
গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষভাবে তৈরি করা একটি যন্ত্র: Angle-Resolved Magnetic Thermal Emission Spectrophotometer (ARMTES)। এই যন্ত্রের মাধ্যমে গবেষকরা একটি নির্দিষ্ট কোণে এবং ±৫ টেসলা পর্যন্ত চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে বিভিন্ন কোণ ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পদার্থের তাপ নির্গমন এবং শোষণের পার্থক্য নিরূপণ করেন।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। গবেষকরা প্রমাণ করেন যে, নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও কোণে, পদার্থটির নির্গমনের ক্ষমতা শোষণের ক্ষমতার চেয়ে ৪৩% বেশি হতে পারে। এত বড় মাত্রার “nonreciprocity” বা অ-প্রতিসমতা এর আগে কখনোই পরিলক্ষিত হয়নি। পূর্ববর্তী রেকর্ডগুলো ছিল মাত্র ১২ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যে এবং অনেক কম তরঙ্গব্যাপ্তিতে সীমাবদ্ধ।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার প্রযুক্তিগতভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারে অনেক ক্ষেত্রে। যেমন:
- সৌর কোষ (Solar Cells): প্রচলিত সৌর কোষ থেকে কিছু তাপ ফেরত চলে যায় সূর্যের দিকে, যেটি একধরনের শক্তির অপচয়। কিন্তু এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্গমনকে ভিন্ন দিকে চালিত করা সম্ভব, ফলে সেই শক্তিও ধরা যাবে।
- তাপীয় সেন্সর ও ইনফ্রারেড ক্যামোফ্লাজ: সেন্সরের সংবেদনশীলতা এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়বে।
- নির্বাহী তাপ প্রবাহ (Heat Flux Control): ভবিষ্যতের তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
থার্মোফোটোভোল্টাইক ও রেডিয়েটিভ কুলিং-এও এই প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
এই গবেষণায় প্রমিত ঘোষ-এর অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়। বৈশ্বিক গবেষণায় বাঙালি তরুণদের এমন অংশগ্রহণ দেশের বিজ্ঞানমনস্ক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।
১৬৫ বছরের পুরনো একটি বৈজ্ঞানিক সূত্রকে শক্তভাবে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে গবেষকরা একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, যা ভবিষ্যতের শক্তি প্রযুক্তি ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মুখ বদলে দিতে পারে।
———
Observation of Strong Nonreciprocal Thermal Emission, Phys. Rev. Lett. (2025).
DOI: 10.1103/PhysRevLett.135.016901
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



