যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া আটটি শিশু এখন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। এদের জন্মের নেপথ্যে রয়েছে একটি যুগান্তকারী এবং কিছুটা বিতর্কিত চিকিৎসা পদ্ধতি, মাইটোকন্ড্রিয়াল ডোনেশন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এমন এক প্রজনন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন, যার ফলে মারাত্মক জেনেটিক রোগ নবজাতকের দেহে যাওয়া রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এই শিশুদের মা ও বাবার পাশাপাশি একটি তৃতীয় নারীর ডিম্বাণুর মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে এসেছে তাদের জীবনরক্ষা করা ডিএনএ অংশ। এই পদ্ধতিকে “থ্রি পার্সন ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF)” বলেও অভিহিত করা হয়।
নিউ ইয়র্ক সিটির কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেম-সেল বিজ্ঞানী ডিয়েট্রিচ এগলি বলেছেন, “এটি মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী গবেষণা”
মাইটোকন্ড্রিয়া হলো কোষের শক্তিঘর, যা শুধুমাত্র মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে। যদি মায়ের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-তে ক্ষতিকর মিউটেশন থাকে, তবে তার সন্তানের হার্ট, মস্তিষ্ক বা পেশিতে গুরুতর বংশগত রোগ দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি এড়াতে গবেষকেরা ‘প্রনিউক্লিয়ার ট্রান্সফার’ নামে একটি প্রক্রিয়া বেছে নেন। এতে প্রথমে মায়ের নিষিক্ত ডিম্বাণুর নিউক্লিয়ার ডিএনএ মাইটোকন্ড্রিয়া সুস্থ এমন অন্য একটি নারীর ডোনার ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর এই নতুন ডিম্বাণুটি গর্ভস্থ করা হয়।
২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য এই পদ্ধতির আইনগত অনুমোদন দেয়, এবং নিউক্যাসলের একটি ফার্টিলিটি সেন্টারে সীমিতভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়। এমনকি ২০২৩ সালে গার্ডিয়ান সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডোনেশনের মাধ্যমে সে সময় যুক্তরাজ্যে পাঁচটি পর্যন্ত শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু শিশুদের স্বাস্থ্য এবং এই কৌশলের কার্যকারিতা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রশ্ন সম্পর্কে খুব কম তথ্যই ছিল।
কিন্তু সদ্যপ্রকাশিত দুটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা যায়, মোট ২২ জন নারী এই চিকিৎসা গ্রহণ করেন, যাদের মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনে মারাত্মক ভুল ছিল। এদের মধ্যে আটজন সুস্থ শিশুর জন্ম দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় শিশু এখন দুই বছরের বেশি বয়সী, আর সবচেয়ে ছোটটির বয়স পাঁচ মাসের কম।
এই আট শিশুর মধ্যে পাঁচজনের শরীরে ক্ষতিকর মিউটেশন একেবারেই পাওয়া যায়নি। বাকি তিনজনের শরীরে ৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত ‘প্যাথোজেনিক মাইটোকন্ড্রিয়া’ পাওয়া গেছে। এই মাত্রা এখনো রোগ সৃষ্টি করার মতো পর্যায়ে নয়, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এসব মাত্রা বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা দরকার। এই তিনজনের মধ্যে দুজন মেয়ে, যারা ভবিষ্যতে তাদের সন্তানদের মধ্যে এই মিউটেশন ছড়িয়ে দিতে পারে, যদি না সতর্কভাবে গর্ভকালীন জিন-পরীক্ষা করা হয়।
সন্তানদের স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি নিয়ে গবেষকেরা আশাবাদী হলেও কিছু সাময়িক সমস্যা দেখা গেছে। এক শিশু অল্প সময়ের জন্য শিশুকালীন মায়োক্লোনিক এপিলেপসিতে ভুগেছিল, যা নিজে থেকেই সেরে গেছে। আরেক শিশুর মধ্যে জন্মের পর হালকা হৃদরোগ এবং উচ্চ চর্বির মাত্রা ধরা পড়ে, যা চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক হয়ে গেছে। এই শিশুর মা গর্ভকালেই উচ্চ মাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড সমস্যায় ভুগছিলেন।
এই গবেষণাগুলো এটাও প্রমাণ করে যে ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ডোনেশন’ ও ‘প্রি-ইমপ্ল্যান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং’ একত্রে ব্যবহার করলে জিনগত রোগ সৃষ্টিকারী ডিএনএ-এর বংশগতি উল্লেখযোগ্যভাবে রোধ করা সম্ভব। তবে এই পদ্ধতিগুলো পুরোপুরি রোগ প্রতিরোধ করে কি না, সেটি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি জিনগত রোগ প্রতিরোধে এক নতুন দিগন্ত খুলেছে, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা মারাত্মক মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগে আক্রান্ত সন্তান জন্মদানের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে সতর্কতা ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ছাড়া এটি নিশ্চিত চিকিৎসা নয়।
তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিজ্ঞান আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তিনজন মানুষের ডিএনএ দিয়ে একটি শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনা একাধারে বিস্ময়কর এবং আশার আলো জাগানো এক অধ্যায়।
———
Mitochondrial Donation and Preimplantation Genetic Testing for mtDNA Disease, The New England Journal of Medicine (2025).
DOI: 10.1056/NEJMoa2415539
Mitochondrial Donation in a Reproductive Care Pathway for mtDNA Disease, The New England Journal of Medicine (2025).
DOI: 10.1056/NEJMoa2503658
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


