ঘুম ভাঙার মুহূর্তে আমরা অনেকেই ক্লান্তি, বিভ্রান্তি বা অস্বচ্ছতার অনুভব করি, যাকে বলা হয় sleep inertia বা ঘুম জড়তা। কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে ঘুম থেকে জেগে ওঠে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি একটি বিস্তৃত গবেষণা চালিয়েছেন ইউরোপের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী। গত ১৬ জুলাই, ২০২৫ Current Biology জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা আমাদের জানায়, ঘুম থেকে জেগে ওঠা কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, যার মাঝে সময় ও স্থানের এক অভূতপূর্ব অনুপ্রবাহ রয়েছে।
গবেষকরা ২০ জন মানুষের ওপর ১,০৭৩টি ঘুম ভাঙার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন এক বিশেষ ইইজি (EEG) প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ অত্যন্ত সূক্ষ্ম সময়মানের ভেতরে মাপতে সক্ষম। তারা দেখতে পান, ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময় মস্তিষ্কে একটি অভিন্ন, সামনের দিক থেকে পিছনের দিকে বিস্তৃত “জাগরণ তরঙ্গ” ছড়িয়ে পড়ে।
এই তরঙ্গ শুরু হয় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বা নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে থাকা অঞ্চলে, তারপর ধীরে ধীরে পিছনের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স পর্যন্ত পৌঁছায়। NREM ঘুমে (non-rapid eye movement sleep), এই পরিবর্তন শুরু হয় একটি লো-ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ দিয়ে, অর্থাৎ ধীরগতির। গভীর ঘুমের সাথে সম্পর্কিত এও তরঙ্গ কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গা করে দেয় উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গকে, যা সচেতনতার ইঙ্গিত বহন করে।
REM ঘুম (rapid eye movement sleep) থেকে জেগে ওঠার সময় হাই-ফ্রিকোয়েন্সি (উচ্চ গতি) তরঙ্গ সক্রিয় হয়, কোনো পূর্ববর্তী ধীর তরঙ্গ ছাড়াই। অপরদিকে, NREM ঘুমে জাগরণ হয় বেশ ‘জটিল’ প্রক্রিয়ায়। প্রথমে ধীর, বড় অ্যামপ্লিচিউডের ঢেউ (যেমন K-complex) দেখা যায়, যা ধীরে ধীরে দ্রুত গতি ও সচেতনতায় রূপ নেয়।
গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়: ঘুম থেকে উঠে কেন আমরা মাঝে মাঝে বোধগম্যতা হারাই, আবার কখনও ফ্রেশ অনুভব করি? গবেষকরা আবিষ্কার করেন, যেসব মানুষ NREM ঘুম থেকে জাগে এবং তাদের মস্তিষ্কে জাগরণ-পূর্ব ধীর তরঙ্গ বেশি থাকে, তারা সাধারণত জেগে উঠে কম ক্লান্তি অনুভব করে। এই ঢেউগুলো মূলত ‘type I slow waves’, যার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী, তীক্ষ্ণ K-complex গুলি, যেগুলো জাগরণ ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করে। বিপরীতে, যদি ঘুমের পরে আরও ধীর তরঙ্গ সক্রিয় থাকে (যেমন ‘type II’ slow waves), তবে মানুষ আরও বেশি ঘুমজড়তা অনুভব করে।
এই আবিষ্কার ঘুমজনিত নানা সমস্যার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে, বিশেষ করে ইনসমনিয়া (ঘুমের অসুবিধা), প্যারাসমনিয়া (ঘুমের মধ্যে আচরণগত ব্যাঘাত), বা স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমে শ্বাসকষ্ট)। এমনকি, ঘুম থেকে দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে ওঠার কৌশল বা প্রযুক্তি (যেমন অ্যালার্ম ডিজাইন) উন্নত করতেও এটি কার্যকর হতে পারে।
———
Cortical activity upon awakening from sleep reveals consistent spatio-temporal gradients across sleep stages in human EEG, Current Biology (2025).
DOI: 10.1016/j.cub.2025.06.064
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


