প্লাস্টিক বর্জ্যে পৃথিবী যখন পরিবেশগত সংকটে জর্জরিত, তখন পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপকরণের সন্ধানেই নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের সহকারী অধ্যাপক ড. মাকসুদ রহমান। বাংলাদেশের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করা এই বিজ্ঞানী ও তাঁর গবেষণা দল এমন এক নতুন ধরণের জৈববস্তু তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
এই গবেষণায় তাঁরা ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি সেলুলোজকে (bacterial cellulose) বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে রূপান্তর করে এমন এক ধরনের পাতলা এবং শক্তিশালী শীটে পরিণত করেছেন, যেটি পানির বোতল, খাদ্য প্যাকেটিং, এমনকি ক্ষতস্থানে ব্যবহৃত ড্রেসিং হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। ব্যাকটেরিয়াল সেলুলোজ এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান, পচনশীল (biodegradable) এবং পরিবেশবান্ধব। গবেষকেরা একে আরও কার্যকর করতে এতে বোরন নাইট্রাইড নামক একধরনের ন্যানোশীট সংযুক্ত করেছেন, যার ফলে এটি অধিকতর শক্তিশালী ও তাপ পরিবাহী হয়ে উঠেছে।
১ জুলাই, ২০২৫ তারিখে Nature Communications-এ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. মাকসুদ রহমান। গবেষণাপত্রের প্রথম লেখক হিসেবে কাজ করেছেন রাইস ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক এম.এ.এস.আর. সাদী। গবেষণার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিলেন শ্যাম ভক্তা, সাকিব হাসানসহ আরও অনেকে।
গবেষকদল একটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা আবর্তনশীল (rotational) কালচার ডিভাইস তৈরি করেছেন, যেখানে ব্যাকটেরিয়া একটি ঘূর্ণায়মান তরল মাধ্যমে চলাচল করে। এই ধারাবাহিক এবং নিয়ন্ত্রিত গতি ব্যাকটেরিয়াগুলোর দ্বারা উৎপাদিত সেলুলোজ ফাইবারগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে সারিবদ্ধভাবে সাজাতে সাহায্য করে। ফলে উৎপন্ন সেলুলোজ শীটগুলো খুবই শক্তিশালী, নমনীয় এবং স্বচ্ছ হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিশেষভাবে তৈরি ব্যাকটেরিয়াল সেলুলোজ শীটের টেনসাইল স্ট্রেংথ ৫৫৩ মেগা প্যাসকেল পর্যন্ত হতে পারে, যা সাধারণ প্লাস্টিক বা কাঁচের তুলনাতেও অনেক বেশি শক্তিশালী। সেই সাথে এটি গরমের তাপও তুলনামূলক দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, যা তাপ ব্যবস্থাপনায় এর নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
এই নতুন প্রযুক্তি শুধু প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবেই নয়, বরং পরিবেশবান্ধব টেক্সটাইল, গ্রীন ইলেকট্রনিক্স, প্যাকেজিং, এমনকি শক্তি সংরক্ষণ (energy storage) উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এতে কোনো অতিরিক্ত স্ট্রেচিং বা পোস্ট-প্রসেসিংয়ের প্রয়োজন হয় না, ফলে উৎপাদন খরচও কম হয়।
ক্রেডিট: University of Houston
ড. মাকসুদ রহমান বলেন, “আমরা ব্যাকটেরিয়াদের কাজকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচালিত করছি। ফলে তারা সেলুলোজ এমনভাবে তৈরি করছে, যা কাঠামোগতভাবে সঠিক ও শক্তিশালী। এটি ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব উপকরণ তৈরিতে বিপ্লব আনবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
এই গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ড. মাকসুদ রহমান বাংলাদেশের গর্ব। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে তাঁর প্রাথমিক উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনে মেকানিক্যাল এবং অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
এই আবিষ্কার যেমন পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি হতে পারে একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্রযুক্তি। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যেখানে প্লাস্টিক দূষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার একদিন বাস্তবে পরিণত হতে পারে, যদি আমরা সময়মতো এ উদ্ভাবনকে গ্রহণ ও প্রয়োগে সচেষ্ট হই।
———
Flow-induced 2D nanomaterials intercalated aligned bacterial cellulose. Nat Commun (2025).
DOI: 10.1038/s41467-025-60242-1
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



