বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়েছে বিরল প্রজাতির ‘প্যানথার ড্যানিও’ (Danio aesculapii) মাছ। এটি এই প্রজাতির প্রথম জীবন্ত আলোকচিত্র রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের শেষদিকে এই মাছটি আবিষ্কার করেন ফুয়াদ রহমান ও তার সহযাত্রীরা। বিষয়টি যাচাই করেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞানবার্তা।
ক্রেডিট: Fuad Rahaman
এই মাছটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই প্রজাতিটি এখনও বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়নি, ফলে এই আবিষ্কার দেশের মৎস্য বৈচিত্র্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
প্যানথার ড্যানিও কী?
Danio aesculapii বা প্যানথার ড্যানিও হলো সাইপ্রিনিডি পরিবারের একটি ছোট আকারের মাছ। ২০০৯ সালে মায়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন ইয়োমা পাহাড়ের পশ্চিম ঢালে প্রথমবারের মতো এই প্রজাতিটি আবিষ্কৃত হয়। সুইডেনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গবেষক স্ভেন ও. কুল্যান্ডার ও ফ্যাং ফ্যাং এটি বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করেন।
এই মাছের দেহে সামনের দিকে ৬-৭টি বাদামী উল্লম্ব দাগ এবং পেছনের দিকে দুটি সারিতে ছোট বাদামী দাগ থাকে, যা সাপের চামড়ার মতো দেখতে। এ কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘প্যানথার ড্যানিও’। প্রাচীন গ্রিক দেবতা অ্যাসক্লেপিয়াসের নামানুসারে এর বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে, যার হাতে সাপ মোড়ানো একটি লাঠি ছিল।
বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য
প্যানথার ড্যানিও অন্যান্য ড্যানিও প্রজাতি থেকে কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে আলাদা:
- এর পৃষ্ঠীয় পাখনায় ছয়টি শাখাযুক্ত রশ্মি থাকে, যেখানে অন্যান্য ড্যানিও প্রজাতিতে সাত বা তার বেশি থাকে।
- এর লেজের কাছে ১২টি সার্কামপেডাঙ্কুলার স্কেল সারি রয়েছে, যা শুধুমাত্র Danio erythromicron ও Danio kerri প্রজাতিতে দেখা যায়।
- এর দেহের রঙের বিন্যাস অনন্য – সামনের দিকে উল্লম্ব দাগ এবং পেছনের দিকে দুটি সারিতে ছোট ছোট দাগ।
গড় আকারে এই মাছ ২০-২৩ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এরা ছোট পাহাড়ি ঝর্ণায় বাস করে, যেখানে পানি স্বচ্ছ এবং স্রোত মৃদু থাকে।
আবিষ্কারের গুরুত্ব
বাংলাদেশে এই মাছের আবিষ্কার দেশের মৎস্য বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এখনও অনেক অজানা প্রজাতি রয়েছে যা আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।
মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংযোগের কারণে এই অঞ্চলে একই প্রজাতির মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু এটি প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হলো। এই আবিষ্কার আঞ্চলিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগে মাছটি হস্তান্তর করায় এটি নিয়ে আরও গবেষণা সম্ভব হবে। এর আচরণ, প্রজনন ব্যবস্থা এবং বাস্তুতন্ত্রে ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই আবিষ্কারের পর বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে আরও জরিপ চালানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ছোট ছোট ঝর্ণায় আরও কী কী বিরল প্রজাতি রয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে।
একই সাথে এই প্রজাতির সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো দূষণ ও মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে। এই মাছের আবাসস্থল রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের বৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। প্যানথার ড্যানিওর আবিষ্কার তা আরও একবার মনে করিয়ে দিলো যে আমাদের চারপাশে এখনও অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে, যা আবিষ্কারের অপেক্ষায়।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



