নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর থেকে নির্গত নিউট্রিনো কণাকে মাত্র কয়েক কেজি ওজনের একটি যন্ত্র ব্যবহার করে শনাক্ত করেছেন পদার্থবিদরা। প্রচলিত নিউট্রিনো ডিটেক্টর যেখানে হাজার হাজার টন ওজনের হয়, সেখানে এত হালকা যন্ত্রে এমন সাফল্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে পদার্থবিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো নিয়ে এবং পথ খুলে দিচ্ছে মহাকর্ষপীড়িত নক্ষত্রের কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন বিপুল সংখ্যক নিউট্রিনো শনাক্ত করার। CONUS+ নামের এই এক্সপেরিমেন্ট ৩০ জুলাই, ২০২৫ তারিখে Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষনাপত্রে বর্ণনা করা হয়েছে।
ভুতুড়ে কণা নিউট্রিনো
নিউট্রিনো এমন এক ধরনের মৌলিক কণা যাদের কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই, এবং তারা সাধারণত অন্যান্য কণার সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। যার ফলে তাদের সনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত নিউট্রিনো শনাক্ত করার জন্য নিউট্রিনো ডিটেক্টর ব্যবহার করা হয়, যেগুলো ইলেকট্রন, প্রোটন বা নিউট্রনের সঙ্গে নিউট্রিনোর সংঘর্ষে সৃষ্ট হালকা ঝলক পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু এই সংঘর্ষ এতই বিরল যে, যথেষ্ট সংখ্যক সংঘর্ষ ধরতে ডিটেক্টরগুলোর আকার টনের পর টন হতে হয়।
২০১৭ সালে স্কলবার্গ এবং তার দল প্রথম ‘মিনি-ডিটেক্টর’ পদ্ধতি চালু করেন, যা টেনেসির ওক রিজ জাতীয় ল্যাবরেটরির পার্টিকল অ্যাক্সেলারেটর থেকে উৎপন্ন নিউট্রিনো শনাক্ত করেছিল। তবে, পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর থেকে আসা নিউট্রিনোর শক্তি কিছুটা কম হওয়ায়, তা শনাক্ত করা আরও কঠিন ছিল বলে জানান স্কলবার্গ। তবে এই নিম্ন-শক্তির নিউট্রিনো ব্যবহার করেই পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের আরও সূক্ষ্ম পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘কোহেরেন্ট স্ক্যাটারিং’ এর রহস্য
স্কলবার্গের COHERENT ডিটেক্টর প্রথম ব্যবহার করে এক অভিনব পদ্ধতি, যাকে বলা হয় কোহেরেন্ট স্ক্যাটারিং। এখানে নিউট্রিনো একটি সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের সঙ্গে একত্রে মিথস্ক্রিয়া করে।
CONUS প্রকল্পের একজন ক্রিশ্চিয়ান বাক বলেন, কণা পদার্থ ও তরঙ্গের মতো আচরণ করতে পারে, এবং শক্তি যত কম হয়, তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত বেশি হয়। যখন নিউট্রিনোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিউক্লিয়াসের আকারের কাছাকাছি হয়, তখন “নিউট্রিনো পুরো নিউক্লিয়াসকে একটি একক সত্তা হিসেবে দেখে, তার অভ্যন্তরীণ গঠনকে আলাদা করে দেখে না।” ফলে কোনো উপ-পরমাণবিক কণার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ না হলেও নিউক্লিয়াস সামান্য কাঁপে। এই ক্ষুদ্রতর কম্পনই ডিটেক্টরে শনাক্তযোগ্য।
ক্রেডিট: Max-Planck-Institut fur Kernphysik (MPIK)
এই পদ্ধতি প্রচলিত ডিটেকশন পদ্ধতির চেয়ে ১০০ গুণ বেশি কার্যকর, কারণ এখানে সংঘর্ষের হার অনেক বেশি। তাই ছোট আকারের ডিটেক্টর দিয়েই নিউট্রিনোর সঠিক পরিমাণ শনাক্ত করা সম্ভব।
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর থেকে সংগ্রহ
CONUS ডিটেক্টরটি তৈরি হয়েছে বিশুদ্ধ জার্মেনিয়ামের চারটি মডিউল নিয়ে, প্রতিটির ওজন ১ কেজি। এটি ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জার্মানির একটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরে চালিত ছিল। পরে রিঅ্যাক্টরটি বন্ধ হয়ে গেলে এটি CONUS+ নামে আপগ্রেড করে সুইজারল্যান্ডের লাইবস্টাড্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। নতুন স্থানে ১১৯ দিনের পর্যবেক্ষণে প্রায় ৩৯৫টি সংঘর্ষের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে, যা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
২০১৭ সালের ঐতিহাসিক ফলাফলের পর স্কলবার্গের দল বিভিন্ন উপকরণ, সিজিয়াম আয়োডাইড, আর্গন, এবং জার্মেনিয়াম ব্যবহার করে পুনরায় পরীক্ষা চালায়। আলাদাভাবে, গত বছর দুটি ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান প্রকল্প সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনোর ক্ষীণ কোহেরেন্ট স্ক্যাটারিং শনাক্ত করার আভাস পায়। স্কলবার্গ বলেন, স্ট্যান্ডার্ড মডেল এই স্ক্যাটারিংয়ের হার এবং তা কিভাবে নিউক্লিয়াসের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, তা স্পষ্টভাবে পূর্বাভাস দেয়। তাই যত বেশি উপাদান দিয়ে পরীক্ষা চালানো যায়, ততই ভালো।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
গবেষকরা মনে করেন কোহেরেন্ট স্ক্যাটারিং বর্তমান নিউট্রিনো শনাক্তকারী প্রযুক্তিগুলোর পুরোপুরি বিকল্প হবে না, তবে তা এক শক্তিশালী সহায়ক হবে। কারণ, এটি নিউট্রিনোর সব তিনটি পরিচিত ধরন (এবং তাদের প্রতিকণা) কম শক্তিতেও শনাক্ত করতে পারে, যা অন্য অনেক ডিটেক্টরের পক্ষে সম্ভব নয়।
এ কারণে এটি জাপানে নির্মাণাধীন Hyper-Kamiokande-এর মতো বিশাল ডিটেক্টরগুলোর উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণের কাজকে দারুণভাবে সম্পূরক করতে পারে।
———
Direct observation of coherent elastic antineutrino–nucleus scattering. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09322-2
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



