এমআরএনএ (mRNA) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা দুটি টিকা ক্যান্ডিডেট (vaccine candidates) এইচআইভির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে বলে দেখা গেছে একটি প্রাথমিক পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে।
এইচআইভির বিরুদ্ধে mRNA টিকার এটি মাত্র তৃতীয় পরীক্ষা। “এই গবেষণাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো প্রথম দিককার কাজ,” বলেন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ শ্যারন লিউইন, যিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে পিটার ডোহার্টি ইনস্টিটিউট ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির প্রধান।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪১ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত, যার কোনো কার্যকর টিকা এখনো নেই।
লিউইনের মতে, কোনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা তৈরি করতে হলে আগে দেখতে হয় শরীর কীভাবে সেই ভাইরাসকে দমন করে। কিন্তু এইচআইভি এমন এক ভাইরাস, যা সরাসরি রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা আক্রমণ করে এবং খুব কম মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে পারে। তাই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরি করতে গেলে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার হয়।
এই জটিলতাই mRNA প্রযুক্তিকে HIV টিকার জন্য উপযোগী করে তোলে। প্রথম mRNA টিকার অনুমোদন দেয়া হয় ২০২০ সালে, কোভিড-১৯-এর জন্য। অন্যান্য টিকা প্রযুক্তির তুলনায় mRNA টিকাকে দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে কম খরচে বদলানো যায় ফলে গবেষকরা বিভিন্ন কৌশল পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এই টিকাগুলো কাজ করে শরীরের কোষে একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা পাঠিয়ে, যা ভাইরাসের গায়ে থাকে। এই প্রোটিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সক্রিয় করে, ফলে শরীর সত্যিকারের ভাইরাস এলে তাকে চিনে নিতে পারে।
বাঁধা বা মুক্ত?
এইচআইভি ভাইরাস তার বাইরের আবরণে থাকা একটি ‘এনভেলপ প্রোটিন’-এর মাধ্যমে কোষে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। Science Translational Medicine জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় দেখা যায়, সান ডিয়েগোর স্ক্রিপস রিসার্চের প্রোটিন ডিজাইন বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম শিফের নেতৃত্বে একদল গবেষক দুটি ভিন্ন টিকা কৌশল পরীক্ষা করেছেন।
একটি কৌশলে, যা HIV টিকার প্রচলিত পদ্ধতি, কোষকে নির্দেশনা দেওয়া হয় যেন তারা ভাইরাসের সেই এনভেলপ প্রোটিন বানায় যেগুলো কোষ থেকে আলাদা হয়ে ভেসে বেড়ায়। অপর কৌশলে, mRNA কোষকে নির্দেশ দেয় যেন তারা এমন এনভেলপ প্রোটিন তৈরি করে যা কোষের গায়ে আটকে থাকে, যেমনটা ভাইরাসে প্রকৃতভাবে দেখা যায়। এই দ্বিতীয় কৌশলের অ্যানিমেল টেস্টের ফলাফল একটি সেকেন্ডারি গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে।
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি স্থানে ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ১০৮ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণ করেন। সেখানে দুই ধরনের মেমব্রেন-বাউন্ড (কোষের সঙ্গে যুক্ত) টিকা এবং একটি আনবাউন্ড (মুক্ত ভেসে বেড়ানো) টিকা পরীক্ষা করা হয়।
প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে কয়েক সপ্তাহ অন্তর তিনটি ডোজ দেওয়া হয়; কখনো কম মাত্রার, কখনো বেশি মাত্রার। কারা কোন টিকা পাবেন তা এলোমেলোভাবে নির্ধারণ করা হয়। এই টিকাগুলো সরবরাহ করেছে মার্কিন সংস্থা মডার্না, যেখানকার প্রোটিন ডিজাইন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম শিফ।
ফলাফলে দেখা যায়, যারা মেমব্রেন-বাউন্ড টিকা পেয়েছেন, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে যা ভাইরাসের এনভেলপ প্রোটিনকে কোষে প্রবেশ করতে বাধা দিতে পারে। অপরদিকে, যারা ফ্রি-ফ্লোটিং প্রোটিন টিকা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশের দেহে একই রকম অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।
“এই পার্থক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ,” বলেন লিউইন। তিনি আশা করছেন এই ফলাফল ভবিষ্যতের টিকা উন্নয়নে দিকনির্দেশনা দেবে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সবগুলো টিকাই বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ভালোভাবে সহনীয় হয়েছে, কম-বেশি, উভয় মাত্রাতেই। তবে, মোট ৭ জনের (প্রায় ৬.৫%) ক্ষেত্রে চুলকানিযুক্ত বড় র্যাশ বা অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা গেছে। এর মধ্যে ৫ জনের ক্ষেত্রে উপসর্গ ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ছিলো, কারো কারো ক্ষেত্রে এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সবগুলো টিকাতেই দেখা গেছে, সব ধরনের মাত্রায়।
একই গবেষক দল গত মে মাসে আরও দুটি পরীক্ষা চালায়, যেখানে একাধিক mRNA টিকার সংমিশ্রণ ব্যবহার করে শরীরে বিস্তৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়, যাতে বিভিন্ন রকম HIV ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাওয়া যায়। সেগুলোতে ভালো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়। ট্রায়ালগুলো যুক্তরাষ্ট্র, রুয়ান্ডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচালিত হয়।
তবে ওই ট্রায়ালের একটিতে ১৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর ত্বকে অ্যালার্জি বা চুলকানিযুক্ত র্যাশের মতো সমস্যা দেখা যায়। ওই সময় শিফ এবং তাঁর সহকর্মীরা বলেছিলেন, এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ সম্ভবত HIV এবং mRNA-এর মিলিত প্রতিক্রিয়া, এককভাবে কোনো একটি নয়। তবে ঠিক কী কারণে এমনটি হচ্ছে, তা তারা শনাক্ত করতে পারেননি। লিউইন বলেন, বিজ্ঞানীদের এখন এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ খুঁজে বের করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে তা এড়ানো যায়। তবে এগুলো টিকা উন্নয়ন বন্ধ করার মতো গুরুতর বিষয় নয়। “এইচআইভি টিকার চাহিদা অত্যন্ত বেশি,” তিনি বলেন।
শিফ এবং তাঁর দল ভবিষ্যতে আরও কম ডোজের mRNA ব্যবহার করে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছেন, যাতে করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমে আসে। তাঁরা মূলত মেমব্রেন-বাউন্ড প্রোটিন কৌশলের দিকেই নজর দিচ্ছেন।
———
Vaccination with mRNA-encoded membrane-anchored HIV envelope trimers elicited tier 2 neutralizing antibodies in a phase 1 clinical trial. Sci. Transl. Med. (2025).
DOI: 10.1126/scitranslmed.ady6831
Vaccination with an mRNA-encoded membrane-bound HIV envelope trimer induces neutralizing antibodies in animal models. Sci. Transl. Med. (2025).
DOI: 10.1126/scitranslmed.adw0721
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


