আজকের দিনে পৃথিবীর সব মানুষই আধুনিক মানব প্রজাতি হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo sapiens)-এর সদস্য যার লাতিন অর্থ হলো “জ্ঞানী মানুষ।” কিন্তু আমরা ইতিহাসে বিদ্যমান একমাত্র মানুষ নই। জীবাশ্ম গবেষণা ক্রমে প্রকাশ করছে আরও অনেক প্রাচীন মানুষের গল্প যার মাধ্যে রয়েছে হোমো ইরেক্টাস (Homo erectus) {লাতিনে অর্থ “সোজা হয়ে দাঁড়ানো মানুষ”}, যারা আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আজ থেকর প্রায় ১৯ লক্ষ বছর আগে থেকে ১ লক্ষ ১০ হাজার বছর আগ পর্যন্ত বসবাস করত।
এখন বিজ্ঞানীরা হোমো (Homo) গণে এক ডজনেরও বেশি প্রজাতিকে শনাক্ত করেছেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রথম মানব প্রজাতি কোনটি ছিল? উত্তরটা অবশ্য বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারেই পরিষ্কার নয়।
মরক্কোতে আবিষ্কৃত ফসিল দেখিয়েছে, শারীরিকভাবে আধুনিক মানুষ অন্তত ৩ লক্ষ বছর আগেই উদ্ভূত হয়েছিল। তবে সবচেয়ে পুরনো যে মানব প্রজাতিকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে চেনেন, তার নাম হোমো হাবিলিস (Homo habilis), যার অর্থ “হাতের কাজে দক্ষ মানুষ।” এরা ছিল এমন এক প্রাইমেট যারা হাতিয়ার ব্যবহার করত, সোজা হয়ে হাঁটত, আর আফ্রিকায় আজ থেকে ২৪ লক্ষ বছর আগে থেকে ১৪ লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত বাস করত।
তবে আরও প্রাচীন কিছু জীবাশ্ম ইঙ্গিত দেয় যে হোমো হাবিলিসের আগেও অন্য হোমো প্রজাতি থাকতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রাচীন মানুষের জীবাশ্ম অত্যন্ত বিরল। এতে বোঝা মুশকিল, কোনো অস্বাভাবিক জীবাশ্ম নতুন কোনো প্রজাতি কিনা, নাকি পরিচিত প্রজাতিরই অদ্ভুত কোনো উদাহরণ। তার ওপর, বিবর্তন অনেক ধীরে ধীরে ঘটে, তাই নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন কখন একেবারে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছে, বিশেষত তখন যখন কোনো জীবাশ্মে একাধিক প্রজাতির বৈশিষ্ট্য একসাথে দেখা যায়।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিজ্ঞানী টিম ডি. হোয়াইট বলেন, “বিবর্তনের প্রক্রিয়া অবিরাম, কিন্তু আমরা সুবিধার জন্য যে নাম বা লেবেল দিই, তা স্থির থাকে।”
প্রাচীনতম হোমো
বেশিরভাগ বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী, হোমো হাবিলিস এসেছে আরও প্রাচীন এক প্রাইমেট গণ থেকে, যার নাম অস্ট্রালোপিথেকাস (Australopithecus)। লাতিন ভাষায় এর অর্থ “দক্ষিণের বনমানুষ,” কারণ এর প্রথম জীবাশ্ম দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত হয়েছিল।
বিভিন্ন প্রজাতির অস্ট্রালোপিথেকাস আজ থেকে প্রায় ৪৪ লক্ষ বছর আগে থেকে ১৪ লক্ষ বছর আগ পর্যন্ত বেঁচে ছিল। সম্ভবত হোমো হাবিলিস সরাসরি এসেছে অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস (Australopithecus afarensis) থেকে যার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো “লুসি”, ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়ার হাদার অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া এক কঙ্কাল।
আমাদের হোমো গণের জীবাশ্ম সাধারণত আলাদা করা যায় ছোট দাঁত ও তুলনামূলকভাবে বড় মস্তিষ্ক দ্বারা। এ কারণেই হোমো প্রজাতি বেশি করে পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করতে পেরেছিল। কিন্তু হোয়াইটের মতে, ছোট দাঁত আর বড় মস্তিষ্কের মতো বৈশিষ্ট্য অস্ট্রালোপিথেকাসের জনসংখ্যার মধ্যেই ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছিল, যেখান থেকে পরবর্তীতে প্রাথমিক হোমো গড়ে ওঠে।
তিনি মজা করে বলেন, “যদি একজন অস্ট্রালোপিথেকাস নারী সন্তান জন্ম দিতেন, সেই শিশুকে সাথে সাথেই ‘হোমো’ বলে নামকরণ করা হতো না।”
ফলে, হোমোর উদ্ভবের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। বরং হোয়াইটের মতে, প্রায় ২০ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ বছর আগে ধীরে ধীরে হোমো গণের আবির্ভাব ঘটে।
আফ্রিকায় বিবর্তন
১৯৭০-এর দশক থেকে আফ্রিকার গবেষকরা হোমো রুডলফেনসিস (Homo rudolfensis) নামে আরেকটি প্রাচীন মানব প্রজাতির জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন, যা “হোমো হাবিলিসই প্রথম হোমো” এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
হোমো রুডলফেনসিস শারীরিকভাবে অনেক বড় ছিল। তাদেরর মস্তিষ্ক বড় এবং মুখের গঠন ছিল সমতল যার ফলে তাদেরকে আধুনিক মানুষের মতো দেখাত।
এই জীবাশ্মগুলোর বয়সও হোমো হাবিলিসের সমসাময়িক অর্থাৎ প্রায় ২৪ লক্ষ বছর। তবে সমস্যা হলো স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টোরি-এর তথ্যমতে, এই প্রজাতির মাত্র একটি ভালো মানের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। তাই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন, এটি আসলেই আলাদা প্রজাতি কিনা, নাকি হোমো হাবিলিসেরই অস্বাভাবিক একটি রূপ, কিংবা বড় মস্তিষ্কওয়ালা কোনো অস্ট্রালোপিথেকাস।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের হিউম্যান অরিজিনস প্রোগ্রামের প্রধান রিক পটস এর মতে, আফ্রিকার আরও পুরনো কিছু জীবাশ্ম হোমো গণের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে হচ্ছে, এবং এগুলো হয়তো হাবিলিস ও রুডলফেনসিসেরও আগে এসেছে।
সবচেয়ে পুরনো জীবাশ্মগুলোর বয়স প্রায় ২৮ লক্ষ বছর। তবে এগুলো কেবল কয়েকটি চোয়ালের হাড় ও দাঁত যা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না এগুলো নতুন কোনো নামহীন হোমো প্রজাতি কিনা। তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের এক গবেষণায় কিছু নতুন দাঁতের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলোর বয়স ২৫.৯ লক্ষ থেকে ২৭.৮ লক্ষ বছর। এগুলোও হয়তো সেই অজানা প্রাচীন হোমো প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত।
তো শেষ পর্যন্ত বলা যায় প্রথম মানব প্রজাতি হয়তো এখনো আবিষ্কৃতই হয়নি। রিক পটস বলেন, “এ নিয়ে প্রচণ্ড উত্তেজনা আছে, তবে একইসাথে প্রচুর অনিশ্চয়তাও রয়েছে। কারণ হোমো গণের উৎপত্তি সম্পর্কে আমরা এখনো অনেক কিছু জানি না।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


