প্রথমবারের মতো একটি জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত শূকরের ফুসফুস মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। চীনের ৩৯ বছর বয়সী এক ব্রেইন-ডেড ব্যক্তির শরীরে এই প্রতিস্থাপন করা হয় এবং ফুসফুসটি নয় দিন পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে অন্তত আধা ডজন মানুষ ইতিমধ্যেই জিনোম-সম্পাদিত শূকরের অঙ্গ পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে হৃদপিণ্ড, কিডনি, লিভার ও থাইমাস। সর্বশেষ এই ফুসফুস প্রতিস্থাপন গবেষকদের মতে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভবিষ্যতে শূকরের প্রায় যেকোনো অঙ্গ মানুষে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে। প্রতি বছর হাজারো মানুষ দাতার অভাবে মৃত্যুবরণ করে; এই প্রযুক্তি একদিন তাদের জীবন বাঁচাতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গবেষকরা।
মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের সার্জন ও গবেষক মুহাম্মদ মোহিউদ্দিন, যিনি ২০২২ সালে প্রথমবার জীবিত মানুষের শরীরে শূকরের হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করেছিলেন, বলেন—ফুসফুস প্রতিস্থাপন সবচেয়ে জটিল কাজ। কারণ, প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গগুলোর মধ্যে ফুসফুসে সবচেয়ে বেশি রক্তনালী থাকে। এতে রোগীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজেই আক্রমণ চালায়, ফলে রক্ত জমাট বাঁধা ও টিস্যু ক্ষতির ঝুঁকি বেশি থাকে। মোহিউদ্দিন বলেন, “তাদের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। এটি ফুসফুস প্রতিস্থাপনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ।” এদিকে এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে শূকরের কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
চীনের চেংদু ক্লোনঅর্গান বায়োটেকনোলজি (Chengdu Clonorgan Biotechnology) নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে পরিবর্তিত একটি শূকরের ফুসফুস সরবরাহ করে। এতে মোট ছয়টি জিনোমিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল—তিনটি শূকরের জিন অপসারণ করা হয় যাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা অঙ্গটিকে ফরেইন হিসেবে না চেনে, আর তিনটি মানব জিন যুক্ত করা হয় অঙ্গকে প্রত্যাখ্যান থেকে রক্ষা করার জন্য।
২০২৪ সালের ১৫ মে চীনের গুয়াংজু মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালে এই ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়। তাদের গবেষণা সাম্প্রতিক Nature Medicine জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রথম তিন দিন প্রতিস্থাপিত ফুসফুসে প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ বা অঙ্গ ব্যর্থতার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে প্রতিস্থাপনের ২৪ ঘণ্টা পর ফুসফুসে ফোলাভাব ও অক্সিজেনবিহীন অবস্থায় ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়। তৃতীয় ও ষষ্ঠ দিনে অ্যান্টিবডি আক্রমণজনিত কিছু ক্ষতি দেখা গেলেও নবম দিনে তা কিছুটা কমে আসে। পরে রোগীর পরিবারের অনুরোধে গবেষণা বন্ধ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন ওয়েইন হথর্ন বলেন, পরবর্তী ধাপ হবে ছোট আকারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। তার মতে, চূড়ান্ত পর্যায়ের ফুসফুস রোগীদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি একমাত্র ভরসা হতে পারে, কারণ এরা প্রায়শই অঙ্গের জন্য অপেক্ষার তালিকায় থাকা অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করে।
গবেষক মোহিউদ্দিনের মতে, অঙ্গ দাতার শরীর থেকে অঙ্গ সরানোর পর বিশেষ সংরক্ষণ দ্রবণ ফুসফুসের রক্তনালীগুলোতে প্রবাহিত করলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। গবেষক দলও স্বীকার করেছে, ভবিষ্যতে অঙ্গ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং আরও জেনেটিক পরিবর্তন (যেমন প্রতিরক্ষামূলক জিন যুক্ত করা) অঙ্গকে রক্ত জমাট বাঁধা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
———
Pig-to-human lung xenotransplantation into a brain-dead recipient. Nat Med (2025).
DOI: 10.1038/s41591-025-03861-x
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


