টাইম ক্রিস্টাল হলো পদার্থের এমন এক অবস্থা, যেখানে কণাগুলো সময়ের সাথে সাথে নির্দিষ্ট বিরতিতে স্পন্দিত হয় এবং নিজেদের মধ্যে পুনরাবৃত্তি করে, ঠিক যেমন একটি সাধারণ ক্রিস্টাল ত্রিমাত্রিক স্থানে পুনরাবৃত্তিশীল গঠন প্রদর্শন করে। এই সিস্টেমে কণাগুলো শক্তি হারাতে পারে না এবং ক্রমাগত একটি পর্যায়ক্রমিক গতিতে থাকে, যা স্বাভাবিক পদার্থের সর্বনিম্ন শক্তির অবস্থার থেকে ভিন্ন। আগে শুধু জটিল কোয়ান্টাম পদার্থেই টাইম ক্রিস্টালের অস্তিত্ব পাওয়া যেত, কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা এমন এক টাইম ক্রিস্টাল তৈরি করেছেন যেটা খালি চোখেও দেখা সম্ভব কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মেনে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের গবেষকরা এই কীর্তি অর্জন করেছেন, যা প্রকাশিত হয়েছে Nature Materials জার্নালে। তারা লিকুইড ক্রিস্টালের (liquid crystal) ওপর আলোকপাত করে বিশেষ তরঙ্গ তৈরি করেন। এই তরঙ্গগুলো ঘন্টার পর ঘন্টা চলতে থাকে এবং নির্দিষ্ট তাল বজায় রাখে, এমনকি গবেষকরা পরিবেশগত শর্ত পরিবর্তন করলেও। এই ছন্দ বাইরের কোনো শক্তির সঙ্গে মিল রাখে না—যা টাইম ক্রিস্টালের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য।
পোহাং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির উপাদান বিজ্ঞানী ইয়ং-কি কিম জানান, লিকুইড ক্রিস্টালের এ ধরনের আচরণ কিছুটা আগে থেকেই জানা ছিল, তবে এগুলোকে টাইম ক্রিস্টাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় তা আগে কেউ ভাবেনি। মিলিমিটার থেকে সেন্টিমিটার আকারের এ টাইম ক্রিস্টাল নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। এর বিশেষ নকশা ভবিষ্যতে জালিয়াতি প্রতিরোধী ব্যাংক নোট সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতেও কাজে লাগতে পারে।
নোবেলজয়ী পদার্থবিদ ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক ২০১২ সালে প্রথম টাইম ক্রিস্টালের ধারণা দেন। তিনি কল্পনা করেছিলেন একধরনের স্থায়ী গতিযন্ত্রের মতো, যা শুরু থেকেও অনন্তকাল ধরে পুনরাবৃত্তি করবে। পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, সেই নির্দিষ্ট ধারণা অসম্ভব হলেও অন্য ধরনের টাইম ক্রিস্টাল তৈরি করা সম্ভব। এরই মধ্যে হীরা, আয়ন এবং গুগলের কোয়ান্টাম কম্পিউটারেও টাইম ক্রিস্টালের ভিন্ন ভিন্ন রূপ তৈরি করা হয়েছে, যদিও সেগুলো ছিল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিসরে।
তবে সাম্প্রতিক এই গবেষণায় সাধারণ এক লাইট বাল্বের আলোই যথেষ্ট ছিল। দুই কাঁচের পাতের মাঝে রাখা তরল ক্রিস্টালে আলো পড়লে সেখানে উপস্থিত রং-সংবেদনশীল অণুগুলো তাদের অবস্থান পাল্টায় এবং অন্যান্য অণুগুলোকে পাক খেতে বাধ্য করে। একবার পাক খাওয়া শুরু হলে তা ডমিনো প্রভাবের মতো ছড়িয়ে পড়ে, ফলে পুরো ক্রিস্টালের ভেতরে তরঙ্গ তৈরি হয়।
এই পাকানো অণুগুলো থেকে কণার মতো স্থিতিশীল গঠন তৈরি হয়, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়া করে স্পষ্ট তরঙ্গ সৃষ্টি করে। গবেষণা দলের নেতৃত্বদানকারী পদার্থবিদ ইভান স্মালিউখ বলেন, সফট ম্যাটার সিস্টেমে এত সহজে টাইম ক্রিস্টালের শৃঙ্খলা দেখা যাবে তা তারা ভাবতেই পারেননি।
টাইম ক্রিস্টালের ভেতরকার এই অণুর নাচ খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষকরা এক বিশেষ মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করেন, যেটি শুধু পোলারাইজড আলো প্রবাহিত করে। অণুগুলোর অবস্থান অনুসারে আলো কমবেশি হয়ে টাইম ক্রিস্টালের তরঙ্গকে অন্ধকার–উজ্জ্বল রেখায় ফুটিয়ে তোলে।
আশ্চর্যজনকভাবে এই ছন্দ ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে স্থায়ী থাকে, এমনকি তাপমাত্রা বা আলোর তীব্রতা পাল্টালেও। আর যেহেতু তৈরি হওয়া প্যাটার্ন সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায়, তাই খালি চোখেও ঝাপসাভাবে হলেও এটি দেখা সম্ভব। যেহেতু নকশা সময় ও স্থান দুই দিকেই বদলায়, গবেষকরা একে ‘স্পেস-টাইম ক্রিস্টাল’ বলছেন।
শুধু গবেষণার কৌতূহল নয়, এর বাস্তব ব্যবহারও হতে পারে। পাতলা টাইম ক্রিস্টালের স্তর নোটে ব্যবহার করলে জালিয়াতি রোধ করা যাবে। বিভিন্ন ধরনের ক্রিস্টালের আলো একত্রে মিলে যে অনন্য নকশা তৈরি করবে, তা হবে চলমান দ্বিমাত্রিক বারকোডের মতো—যা নকল করা অত্যন্ত কঠিন। একইসঙ্গে এগুলোতে তথ্য সংরক্ষণও সম্ভব হতে পারে।
স্মালিউখ বলেন, “আমরা এখনই এর ব্যবহার সীমিত করতে চাই না। এই প্রযুক্তিকে আরও অনেক দিকেই কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।”
———
Space-time crystals from particle-like topological solitons. Nat. Mater. (2025).
DOI: 10.1038/s41563-025-02344-1
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


