চীনা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা জানিয়েছেন, ডিপসিকের শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মডেল R1 (যা এবছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কিন শেয়ারবাজারে ধস নামিয়েছিল) প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোর আউটপুটের ওপর প্রশিক্ষিত ছিল না। সম্প্রতি Nature জার্নালে প্রকাশিত পিয়ার-রিভিউ করা সংস্করণের সঙ্গে প্রকাশিত নথিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।
R1 তৈরি করা হয়েছে ‘রিজনিং’ বা যুক্তিনির্ভর কাজের জন্য যেমন ম্যাথ আর কোডিং। এটি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তৈরি টুলের তুলনায় সস্তা। ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল হওয়ায় এটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং এখন পর্যন্ত AI কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম Hugging Face-এ সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেল, যার ডাউনলোড হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯ লক্ষ বার।
এই গবেষণাপত্র জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রিপ্রিন্ট সংস্করণকে হালনাগাদ করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল কীভাবে ডিপসিক একটি সাধারণ লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)-কে রিজনিং কাজে সক্ষম করেছে। সহায়ক তথ্যসূত্রে প্রথমবার প্রকাশ করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ব্যয় মাত্র ২ লাখ ৯৪ হাজার মার্কিন ডলার। তবে এর আগে সংস্থাটি বেস মডেল তৈরিতে খরচ করেছে প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার। এই ব্যয়ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম, যেখানে অনুমান করা হয় কয়েক কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। কোম্পানির দাবি, R1 মূলত Nvidia-র H800 চিপে প্রশিক্ষিত, যা ২০২৩ সাল থেকে মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনে বিক্রি নিষিদ্ধ।
R1-কে প্রথম বড় LLM হিসেবে মনে করা হচ্ছে যা পূর্ণাঙ্গ পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। হাগিং ফেসের মেশিন-লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার লুইস টানস্টল বলেন, “এটি অত্যান্ত প্রসংশনীয় দৃষ্টান্ত।”
রিভিউ মন্তব্যের জবাবে ডিপসিক টিম তাদের বর্ণনায় মানবসদৃশ রূপক কমিয়েছে এবং প্রশিক্ষণ ডেটা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত তথ্য স্পষ্ট করেছে। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির এআই গবেষক হুয়ান সান বলেন, “এমন কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া মডেলের কার্যকারিতা যাচাই করতে সাহায্য করে। অন্য কোম্পানিগুলোকেও একই কাজ করা উচিত।”
ডিপসিকের বড় উদ্ভাবন হলো Pure Reinforcement Learning যা এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় ট্রাই-এরোর পদ্ধতি। এতে মডেলকে সঠিক উত্তর পেলে পুরস্কৃত করা হয় যেখানো অন্য মডেলে মানুষের উদাহরণ অনুকরণ শেখানো হয়। ফলে R1 নিজেই যুক্তি অনুকরণীয় কৌশল শিখেছে, যেমন নিজস্ব উত্তরের সঠিকতা যাচাই করা। দক্ষতা বাড়াতে মডেল নিজেই তার চেষ্টা-প্রচেষ্টা মূল্যায়ন করেছে, যা আলাদা অ্যালগরিদম ছাড়া সম্ভব হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি Group Relative Policy Optimization নামে পরিচিত।
হুয়ান সানের মতে, এই মডেল এআই গবেষকদের ওপর খুব প্রভাবশালী হয়েছে। ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত LLM-এ রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং নিয়ে যত কাজ হয়েছে, সবই কোনো না কোনোভাবে R1 দ্বারা অনুপ্রাণিত।
জানুয়ারিতে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছিল যে, ওপেনএআই (যারা ChatGPT এবং ‘o’ সিরিজের রিজনিং মডেল তৈরি করেছে) ধারণা করছে যে, R1-কে তাদের মডেলের আউটপুট দিয়ে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। এতে খরচ ও রিসোর্স কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানো যেত।
তবে ডিপসিক জানিয়েছে, R1 ওপেনএআই-এর আউটপুট কপি করে শেখেনি। যদিও, অন্যান্য LLM-এর মতোই এর বেস মডেল ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা ডেটায় প্রশিক্ষিত, যেখানে এআই-সৃষ্ট কিছু কনটেন্ট থাকতে পারে।
হুয়ান সান বলেন, এই ব্যাখ্যা “যতটা বিশ্বাসযোগ্য হওয়া সম্ভব, ততটাই।” টানস্টল যোগ করেন, যদিও শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না, তবে অন্যান্য গবেষণাগারের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে R1-এর পদ্ধতি যথেষ্ট কার্যকর। তার মতে, “প্রমাণ এখন স্পষ্ট—শুধু পিওর রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং দিয়েই খুব উচ্চমানের পারফরম্যান্স পাওয়া সম্ভব।”
হুয়ান সান ও তার সহকর্মীরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও ভিজুয়ালাইজেশন সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জে (ScienceAgentBench) দেখেছেন, R1 যথার্থতায় সেরা না হলেও ব্যয় ও সক্ষমতার ভারসাম্যে অন্যতম সেরা।
অন্য গবেষকেরা এখন R1-এর পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদ্যমান LLM-এর রিজনিং ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং গণিত-প্রোগ্রামিং-এর বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাইছেন। টানস্টলের ভাষায়, R1 “একটি বিপ্লব শুরু করেছে।”
———
DeepSeek-R1 incentivizes reasoning in LLMs through reinforcement learning. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09422-z
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


