একটু আত্মমুগ্ধ বা নার্সিসিস্টদের নিয়ে কথা বলি। আমার এক দূরবর্তী আত্মীয় ছিলো। সে সবসময় সবার চেয়ে সব বিষয়ে বেশি জানার দাবি করত। কখনও নিজেকে বিশ্বমানের শিক্ষক, ডাক্তার, লেখক বা ক্রীড়াবিদ হওয়ার যোগ্য বলে প্রচার করত, আবার একই সঙ্গে নিজের বিনয়ের কথাও গর্ব করে বলত। কেউ দ্বিমত পোষণ করলেই শুরু হয়ে যেত চিৎকার-চেঁচামেচি কিংবা হঠাৎ রাগের বিস্ফোরণ।
তার দিকে তাকালে লক্ষণগুলো ছিল একেবারেই স্পষ্ট: নিয়ন্ত্রণের প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তি, অতিরঞ্জনের রোগগ্রস্ত প্রবণতা আর এক ধরনের হাস্যকর শ্রেষ্ঠত্ববোধ।
পরিবারের বন্ধুদের বিশ্বাসই হতো না যখন আমি এসব বলতাম। তাদের একজন বলেছিল, “আমাদের সঙ্গে দেখা হলে তো ও ভদ্রতার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে।” এগুলো ছিল Narcissistic Personality Disorder (NPD)-র ক্লাসিক বৈশিষ্ট্য। এই মানসিক সমস্যার বৈশিষ্ট্য হলো অন্যের অনুভূতির প্রতি অগ্রাহ্য মনোভাব আর চরম আত্মমর্যাদাবোধ, যা প্রায়ই সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন হিসেবে প্রকাশ পায়। তবে তখন আমি আমার সেই আত্মীয়ের এই আচরণের কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলাম না কারণ তখনও ১০ বছর বয়সী আমার কাছে “নার্সিসিজম” নিয়ে এতটা তথ্যের সহজলভ্যতা ছিলো না।
এছাড়াও ২০১২-১৩ এর দিকে নার্সিসিজম নিয়ে এত আলোচনাও হতো না। আমি যখন “narcissist” শব্দটা শিখি তখন একবার গুগলে ‘narcissistic abuse’ লিখে সার্চ করেছিলাম। মাত্র ৮-১০ টা ফলাফল এসেছিল। Raised by Narcissists ও How to Leave a Narcissist… For Good বইয়ের লেখক সারা ডেভিস নিজেও এমন কথা বলেছেন।
এখন NPD নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ এর সচেতনতা বাড়িয়েছে এবং যারা আত্মমুগ্ধদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন তাদের জন্য নতুন এক ভাষা দিয়েছে বিষয়টি আলোচনা করার। তবে একই সঙ্গে অনেক ভ্রান্ত তথ্যও ছড়িয়ে পড়েছে, যা এই সমস্যায় ভোগা মানুষদের এবং তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে। তাহলে NPD আসলে কী? আর এটি কি চিকিৎসা করা যায়?
নিজের প্রেমে পড়া
মানবজাতির আত্ম-আরাধনার প্রতি আগ্রহ বহু পুরোনো। রোমান কবি ওভিড যখন পৌরাণিক চরিত্র নার্সিসাসকে জনপ্রিয় করেন, তখনই এর ইঙ্গিত মেলে। দেবতাদের অভিশাপে নার্সিসাস নিজের প্রতিবিম্বের প্রেমে পড়েছিল। উনিশ শতকের শেষ দিকে “নার্সিসিস্টিক” শব্দটি প্রথমে অতিরিক্ত হস্তমৈথুনের ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো। ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এটি সাধারণ ব্যক্তিত্বগত ব্যাধিকে বোঝাতে শুরু করে। আর এর ৫০ বছর পর মানসিক ব্যাধির নির্ণায়ক গ্রন্থ DSM (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders)-এ NPD অন্তর্ভুক্ত হয়।
নার্সিসিজমকে “ডার্ক ট্রায়াড”-এর একটি দিক হিসেবে ধরা হয়। ডার্ক ট্রায়াড হলো তিনটি ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি, যা নির্মম এবং নিষ্ঠুর আচরণে প্ররোচিত করতে পারে।
DSM-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, NPD-এর বৈশিষ্ট্য হলো গৌরববোধ, অস্বাভাবিকভাবে প্রশংসা পাওয়ার তৃষ্ণা এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতির অভাব। এই ধরনের মানুষ প্রায়ই নিজেদের ক্ষমতা অতিরঞ্জিত করে আর অর্জনগুলো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলে। তাদের স্ফীত অহংকার আসে বিশেষ অধিকারবোধ, প্রশংসা ও স্থায়ী মনোযোগের প্রয়োজন এবং এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি নিয়ে। তাদের চোখে সাধারণ মানুষ কখনোই এত অসাধারণ হওয়ার সমস্যাগুলো বুঝতে পারবে না। নার্সিসিস্টরা প্রায়ই হিংসায় ভোগে। এরা অন্যদের প্রতি প্রবল হিংসা পোষণ করে কিংবা ভাবে অন্যরা তাদের প্রতি হিংসান্বিত। আর সম্ভবত সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো তারা অনেক সময় অন্যকে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যের ক্ষতির বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে। এর ফলাফল হতে পারে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।
“সব নার্সিসিস্টই যে নির্যাতনমূলক আচরণ করে তা নয়,” বলেন ডেভিস। তবে তিনি আরও বলেন, আত্মমুগ্ধদের দ্বারা নির্যাতন চিনে ওঠা কঠিন হতে পারে কারণ তারা কৌশলে প্রতারণা ও “গ্যাসলাইটিং”-এ পারদর্শী হয়। বাকি দুটি দিক হলো সাইকোপ্যাথি (যার বৈশিষ্ট্য হলো হঠকারী প্রবণতা ও সহানুভূতির অভাব) এবং ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম (যার বৈশিষ্ট্য হলো কৌশলী এবং অনেক সময় নীতিহীন মনোভাব)।
মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মমুগ্ধতার বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করতে Narcissistic Personality Inventory (NPI) নামের একটি স্ব-প্রতিবেদিত প্রশ্নপত্র ব্যবহার করেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে NPD নির্ণয়ের জন্য একজন চিকিৎসকের সঙ্গে গভীর সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যাদের মধ্যে এই সমস্যার বৈশিষ্ট্য থাকে, তারা প্রায়ই মনে করে যে তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনই নেই। “একজন প্রকৃত নার্সিসিস্ট সব সমস্যার দায় অন্য কারও উপর চাপিয়ে দেবে,” বলেন ডেভিস।
ফলে মোট কত মানুষ NPD-তে ভুগছেন তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গবেষণার ফলও ভিন্ন। সবচেয়ে বড় জরিপ হলো National Epidemiologic Survey on Alcohol and Related Conditions। ২০০১-২০০২ সালে এই গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪,৬৫৩ জন বাসিন্দার সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২১৪৮ জনের NPD শনাক্ত করা হয়, যা আনুমানিক ৬.২ শতাংশ প্রাদুর্ভাব নির্দেশ করে। তবে ছোট আকারের অন্য গবেষণাগুলো সাধারণত কম হার দেখিয়েছে, যার গড় প্রায় ১ শতাংশ।
তবে সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বেশিরভাগ মনোবিজ্ঞানী একমত যে NPD আসলে আচরণগত স্পেকট্রামের একদম শেষ প্রান্তে, যার কিছুটা বৈশিষ্ট্য সবার মধ্যেই থাকে। “কিছুটা মাত্রায় এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে সহায়কও হতে পারে,” বলেন ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমি কোস্কিনেন। পরিমিত আত্মবিশ্বাস আমাদের বড় কিছু অর্জনের অনুপ্রেরণা দিতে পারে, আর নিজের চাহিদা ও প্রয়োজন নিয়ে দৃঢ় থাকা ভুল নয়। “কিন্তু যখন [এই বৈশিষ্ট্যগুলো] অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তখন এগুলো সম্পর্কের জটিলতা ও ব্যক্তির পাশাপাশি আশেপাশের মানুষের জন্য নেতিবাচক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়,” বলেন কোস্কিনেন।
আত্মমুগ্ধতা প্রক্রিয়াকরণ
নার্সিসিজম চিহ্নিত করা মনোবিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে “আত্মমুগ্ধরা চারপাশের পৃথিবীকে কিভাবে প্রক্রিয়াজাত করে, আর হয়তো কিভাবে তারা বদলাতে পারে” তা বুঝতে।
DSM-এ NPD-এর সংজ্ঞায় সহানুভূতির অভাবকে মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হলেও গবেষকরা বলছেন, সহানুভূতি ও নার্সিসিজমের সম্পর্ক অনেক জটিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, NPD আক্রান্তদের আবেগগত সহানুভূতি (অন্যের অনুভূতি নিজের ভেতর অনুভব করা) দুর্বল হলেও জ্ঞানগত সহানুভূতি (অন্যের কী অনুভূতি হচ্ছে তা বোঝা) নষ্ট হয় না। এর মানে হলো, আত্মমুগ্ধরা হয়তো অন্যের আবেগ বোঝে কিন্তু সেই জ্ঞান তারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, অথবা একেবারেই পরোয়া করে না।
অন্যদের আবেগ নিয়ে এই উদাসীনতা তাদের নিজের অনুভূতি নিয়ে অতি-আবিষ্ট হওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। আত্মমুগ্ধরা সাধারণত খুব সহজেই অপমানিত বোধ করে। যেমন ২০১৫ সালে উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টোফার ক্যাসিও ও তাঁর সহকর্মীরা এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দিয়ে একটি কম্পিউটার গেম খেলান, যেখানে তিনজন খেলোয়াড় বল একে অপরকে পাস করে। তবে আসলে অন্য দু’জন খেলোয়াড়কে নিয়ন্ত্রণ করছিল কম্পিউটার আর তারা ধীরে ধীরে বাস্তব অংশগ্রহণকারীকে উপেক্ষা করতে শুরু করে অর্থাৎ নিজেরাই নিজেদের মধ্যে বল পাস করা শুরু করে। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই সামাজিক বর্জনের অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের যেসব অংশ কষ্ট প্রক্রিয়াজাত করে (যেমন anterior insula) সেখানে কার্যকলাপ বাড়িয়ে দেয়। আর এই কার্যকলাপের মাত্রা অংশগ্রহণকারীদের NPI স্কোরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। যত বেশি আত্মমুগ্ধ বৈশিষ্ট্য, তত বেশি মানসিক কষ্ট।
এই ফলাফল থেকে গবেষকরা অনুমান করছেন, নার্সিসিজম আসলে সামাজিক মূল্যায়ন নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে তৈরি হতে পারে, যেখানে আত্মপ্রচারমূলক আচরণটা নিজের ইগো রক্ষার এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এই ধারণা পরীক্ষা করতে কোস্কিনেন ও তাঁর সহকর্মীরা অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে NPI পূরণ করতে বলেন, তারপর তাদের জোড়ায় ভাগ করে জীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে কথা বলতে বলেন, যেমন কখন তারা প্রশংসিত বা লজ্জিত বোধ করেছেন। এদিকে আঙুলে সংযুক্ত ইলেক্ট্রোডে ঘামের মাত্রা মাপা হচ্ছিল, যা মানসিক চাপের ইঙ্গিত দেয়। দেখা গেল, যার NPI স্কোর যত বেশি, ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতার সময় তিনি তত বেশি ঘামছিলেন। অন্যকে প্রভাবিত করার তীব্র ইচ্ছা তাদেরকে প্রবল মানসিক চাপে ফেলছিল।
এ বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত একাধিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, আত্মমুগ্ধরা সামাজিক বর্জনকে কিভাবে উপলব্ধি করে। উদাহরণস্বরূপ, সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টিয়ানে বিউটনার অনলাইন অংশগ্রহণকারীদের একাধিক কল্পিত পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে বলেন, যেগুলো সামাজিক বর্জনের অনুভূতি বোঝায়। যারা প্রশ্নপত্রে বেশি নার্সিসিজম স্কোর করেছিল, তারা কম স্কোরধারীদের তুলনায় পরিস্থিতিগুলোকে ইচ্ছাকৃত বর্জন হিসেবে দেখার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
“তাদের মর্যাদা বা স্বীকৃতির যেকোনো হুমকি ভীষণ অস্বস্তিকর,” বলেন বিউটনার। এই পক্ষপাত স্পষ্ট হয় মানুষের জীবনযাপনের প্রতিফলনে, যখন দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার হিসাব রাখতে বলা হয়েছিল। বেশি নার্সিসিস্ট অংশগ্রহণকারীরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে বেশি সামাজিক বর্জনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল, যখন গত ১৪ দিনে কতবার তারা বর্জিত হয়েছিল তা মনে করতে বলা হলো, তারা আসল রেকর্ডের তুলনায় ঘটনাগুলো অতিরঞ্জিত করে জানাল। এর মানে তাদের স্মৃতি বর্জনের অনুভূতির দিকে পক্ষপাতদুষ্ট।
আপনি ভাবতে পারেন, বারবার বর্জিত হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়তো তাদের ভ্রান্ত শ্রেষ্ঠত্ববোধ কমিয়ে আনবে। কিন্তু আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, আসলে এর বিপরীতটাই ঘটে। ১৪ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিউটনার দেখেছেন, সামাজিক বর্জনের অনুভূতি থাকলে পরবর্তী ১২ মাসে মানুষের নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য আরও বেড়ে যেতে পারে। তাঁর ধারণা, বর্জিত হওয়ার বেদনা থেকে বাঁচতে এই অনুভূতি আত্মরক্ষামূলক আচরণ তৈরি করে।
সমস্যা হলো, যারা শুরু থেকেই আত্মমুগ্ধ বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে, তাদেরই আবার বেশি বর্জনের শিকার হতে হয় তাদের সমাজবিরোধী আচরণের কারণে। ফলে এক ধরনের স্ব-চালিত চক্র তৈরি হয়। “যদি বারবার বা দীর্ঘমেয়াদি বর্জন ঘটে, মানুষ হয়তো ক্ষতিপূরণ করতে শুরু করে। সেক্ষেত্রে নিজের আত্ম-ভাবমূর্তি ফুলিয়ে তোলে, নিজের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়, বা অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ ও বিরোধপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ে,” বলেন বিউটনার।
আত্মমুগ্ধতায় লিঙ্গভেদ কমে আসছে
DSM আলাদা করে নার্সিসিজমের ধরন নির্ধারণ না করলেও অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, এর অন্তত দুটি উপধরন আছে, প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে। Grandiose বা overt নার্সিসিস্টরা বাইরে থেকে বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হয় এবং প্রকাশ্যে দম্ভোক্তি বা বড়াই করে। অন্যদিকে vulnerable বা covert নার্সিসিস্টরা বেশি অন্তর্মুখী। তারা মনে করে নিজেকে বিশেষ কিছু, কিন্তু প্রকাশ্যে তা দেখায় না; বরং অন্যদের কাছ থেকে আশ্বাস খোঁজে।
“ভালনারেবল নার্সিসিস্টরা সাধারণত নরম স্বভাবের, লাজুক, ভঙ্গুর এবং তাদের আত্মসম্মানও কম বলে মনে হয় তাই প্রথমে তাদের খুব একটা আত্মমুগ্ধ মনে হয় না,” বলেন লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী আভা গ্রিন। “কিন্তু তাদের ভালোভাবে জানলে বোঝা যায়, ভঙ্গুরতার মুখোশের নিচে লুকিয়ে আছে কিছু বৈশিষ্ট্য: বিশেষ সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা, নিজের সম্পর্কে আত্মপ্রচারমূলক কল্পনা, আর অন্যকে শোষণের প্রবণতা।”
একইভাবে, গ্র্যান্ডিওস নার্সিসিস্টরা বাইরে থেকে বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হয়, বলেন গ্রিন। “কিন্তু তারা ক্রমাগত অন্যের মনোযোগের খোঁজ করে, যাতে নিজের আত্মসম্মান টিকিয়ে রাখতে পারে। তাই ভেতরে সবসময় এক ধরনের ভঙ্গুরতা লুকিয়ে থাকে।” তাঁর মতে, ভেতরে ভেতরে তারা আসলে একই রকম। তিনি বলেন, “ভালনারেবল নার্সিসিস্টরা আগে হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে, কিন্তু “তাদের দ্বারা অন্যদের যে ক্ষতি হতে পারে” সে ব্যাপারে আমাদের হেলাফেলা করা উচিত নয়।”
“গ্র্যান্ডিওস ও ভালনারেবল—দুই ধরনের নার্সিসিস্টের নির্যাতনের ধরন আলাদা নয়, কেবল পরিস্থিতি ভেদে তা প্রকাশ পায়,” বলেন গ্রিন। তবে DSM মূল্যায়নে গ্র্যান্ডিওস নার্সিসিজমের আচরণকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, ভালনারেবল নার্সিসিজমের তুলনায়। আর এটিই হতে পারে একটি বড় অন্ধকার জায়গা: কারণ গ্র্যান্ডিওস ধরনের প্রকাশ সাধারণত পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, আর মহিলারা বেশি প্রদর্শন করেন ভালনারেবল বৈশিষ্ট্য। এজন্যই হয়তো NPD-তে আক্রান্তদের প্রায় ৭৫ শতাংশই পুরুষ। কিন্তু উপধরন অনুযায়ী বিচার করলে দেখা যায়, নারীরা ভালনারেবল নার্সিসিজমে পুরুষদের তুলনায় বেশি স্কোর করেন।
“এর মানে এই নয় যে নার্সিসিজম কোনো লিঙ্গনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য,” বলেন গ্রিন। “নারীরাও এই বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে, তবে এমনভাবে, যা গ্র্যান্ডিওস মূল্যায়নে ধরা পড়ে না।” তিনি বলেন, বিভিন্ন উপধরন আসলে পুরুষ ও নারীর সাংস্কৃতিক লিঙ্গভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন একজন পুরুষ প্রকাশ্যে নিজের দক্ষতা নিয়ে দম্ভোক্তি করলে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে, কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে সমাজ বেশি প্রত্যাশা করে নম্র বা সংযত আচরণ।
সেলফির যুগে সামাজিক মাধ্যমের আত্মমুগ্ধরা
নার্সিসিজম নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার বড় অংশই হচ্ছে অনলাইনে যা বেশ মানানসই, কারণ আজকাল এই বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। বড় আকারের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের নার্সিসিজম স্কোর অনুমান করতে পারে তারা কতবার অন্যদের সঙ্গে কনটেন্ট শেয়ার করবে, যদিও এটি কেবল গ্র্যান্ডিওস ধরনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়।
কিছু বিশেষজ্ঞ এমনকি দাবি করেছেন, সামাজিক মাধ্যম নার্সিসিজম বাড়িয়ে তুলছে তবে এর প্রমাণ এখনো দুর্বল। “আমি বলছি না যে এটা অসম্ভব, কিন্তু ভালো মানের তথ্য এখনো আমাদের কাছে নেই,” বলেন যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যক্তিত্ববিষয়ক গবেষক রেনে মট্টুস।
সোশ্যাল মিডিয়া হয়তো NPD-এর প্রকোপ পরিবর্তন করছে না, কিন্তু এটি অবশ্যই সচেতনতা বাড়িয়েছে এবং দেখিয়েছে এই বৈশিষ্ট্য আমাদের সম্পর্কগুলোতে কতটা ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। যেমন থেরাপিস্ট রামানি দূরবাসুলা জনপ্রিয় Navigating Narcissism পডকাস্ট চালান; ইনস্টাগ্রামে তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা সাড়ে সাত লাখের বেশি। অন্যদিকে লি হ্যামক, একজন recovering narcissist, যিনি বহু বছরের থেরাপি নিয়েছেন নিজের আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য, তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। এই লেখা প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইনস্টাগ্রামে #narcissism ট্যাগে এক মিলিয়নেরও বেশি পোস্ট হয়েছে।
তবে অনলাইন আলোচনার মান অনেক সময় মিশ্রিত হয়। “সচেতনতা বৃদ্ধি ও আলোচনা খুব উপকারী, কিন্তু তথ্যগুলো সবসময় ক্লিনিক্যালভাবে নির্ভরযোগ্য নয়,” বলেন ডেভিস। এখন ‘নার্সিসিজম’ শব্দটি প্রায় যেকোনো অপরিণত আবেগগত আচরণ বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মানুষের নিজেদের সমস্যাগুলো ভুলভাবে নির্ণয় করতে বাধ্য করছে। “আমাদের এই ধরনের অতিরিক্ত জেনারেলাইজেশনের ব্যাপারে আরও সতর্ক হতে হবে।”
ডেভিস বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যোগ্যতাহীন ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়ে, যারা পরামর্শ দিচ্ছেন। “সব রকম মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছে এবং আরও ভয়ের ব্যাপার হলো অনেকে আবার অন্যদের ‘নার্সিসিস্টিক নির্যাতন’ থেকে নিরাময়ের সেবা দিচ্ছে, অথচ তারা কখনো এর প্রশিক্ষণই নেয়নি,” তিনি বলেন। “বড় আইরনি হলো, এ কাজটাই আসলে বেশ নার্সিসিস্টিক।”
যদি আপনি কখনো আত্মমুগ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন, ডেভিসের পরামর্শ হলো প্রামাণ্য সূত্রে ভরসা করা (যেমন যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা See Through NPD) এবং প্রশিক্ষিত পেশাদারের সহায়তা নেওয়া। “থেরাপি সত্যিই সাহায্য করতে পারে, যাতে আপনি বোঝেন আসলে কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন,” তিনি বলেন। (বাংলাদেশে হলে Citizens’ Initiative Against Domestic Violence (CIDV) এর সহায়তা নিতে পারেন।)
বদলানো কি সম্ভব?
আত্মমুগ্ধদের সাধারণত পরিবর্তন-অযোগ্য ও চিকিৎসা করা কঠিন হিসেবে দেখা হলেও কিছু কেস স্টাডি বলছে, তারা কাউন্সেলিং বা থেরাপিতে সাড়া দিতে পারে। যেমন ২০২৪ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ইগর ওয়েইনবার্গের নেতৃত্বে এক গবেষণায় আটজন রোগীর তথ্য প্রকাশিত হয়। তারা Psychodynamic therapy (যেখানে শৈশবের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়) কিংবা Dialectical Behavior Therapy – DBT (যেখানে জটিল আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা হয়) নিয়েছিল। পাঁচ বছর পর্যন্ত চিকিৎসার পর দেখা গেল, তারা আর NPD-এর ক্লিনিক্যাল মানদণ্ডে পড়ে না, বরং অনেকের জীবন ইতিবাচকভাবে বদলেছে যেমন চাকরি পাওয়া বা বিয়ে করা।
অর্থাৎ, কিছু “চিতাবাঘ” তাদের দাগ বদলাতে পারে তবে এটি কতটা সাধারণভাবে ঘটে, তা এখনো দেখা বাকি। শেষ পর্যন্ত রোগীকে নিজের দোষ স্বীকার করতে হবে যা এমন কারও জন্য সহজ নয়, যে বিশ্বাসই করে না তার কোনো সমস্যা আছে। দশকের পর দশক পারিবারিক এক আত্মীয়ের সঙ্গে থেকে আমি নিজের অভিজ্ঞতায়ও দেখেছি যে একজন নার্সিসিস্টের সঙ্গে যুক্তি করা প্রায় অসম্ভব। তাদের চোখে তারা কখনো ভুল করে না, আর আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হলো তাদের জীবন থেকে দূরে রাখা।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


